সোমবার   ০৪ মার্চ ২০২৪   ফাল্গুন ২১ ১৪৩০

লাশ গুম করতে না পেরে পাঁচ লাখে দরকষাকষি

ইফতি মাহমুদ

প্রকাশিত: ২ আগস্ট ২০২২  


# হত্যার ঘটনা ধামাচাপা দিতে রওশন মেম্বারের ইট ভাটায় বৈঠক
# লাশ দ্রুত দাফনের জন্য নিহতের পরিবারকে চাপ দেয়া হয়
# হত্যা করে কুলখানি করে অভিযুক্ত আফজাল গং

 

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকেরচর এলাকার দিদার হোসেন নামের এক ব্যক্তির (৩৩) দাফনের ১৫ দিন পর লাশ উত্তোলন করেছে সদর থানা পুলিশ। ভুক্তভোগী নিহতের স্ত্রী সুবর্ণা আক্তারের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালতের নিদের্শে এই হত্যা মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য সোমবার ১ আগস্ট দুপুরে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রে কে.এম. ইশমামের উপস্থিতিতে পুলিশ দিদারের লাশ উত্তোলন করে ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে প্রেরণ করেন। 

 

অভিযোগ রয়েছে দিদারকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আর এই হত্যার ঘটনা ধামা চাপা দেয়ার জন্য একটি শ্রেনী শুরু থেকে উঠে পড়ে লেগেছে। একই সাথে এই ঘটনায় যেন মামলা না হয় তার জন্য ভুক্তভোগী পরিবারকে ভয় দেখানো হয়। এমনকি নিহতের পিতা জালাল বেপারীকে ৫ লাখ টাকা দেয়ার কথা বলে আলীরটেক ইউনিয়নের কুড়েরপাড় এলাকার রওশন মেম্বার, সাবেক মেম্বার রুহুল আমিন সহ স্থানীয় কিছু ব্যক্তিবর্গ। 

 

একটা পর্যায়ে তারা তাদের মিশন সফলও করে ফেলেন। তবে রওশন মেম্বারের বক্তব্য নিহত দিদারের পিতা জালাল বেপারি আরও বেশি টাকা চায়। আর এ নিয়ে তাদের মাঝে দর কষাকষি পর্যন্ত হয়। কিন্তু সব কিছু মিলিয়ে এই হত্যা মামলায় আসামীদের নাম না রেখে মামলা রুজু হওয়ায় তারা কিছুটা সফল হয়েছে। তবে নিহত দিদারের পরিবারের এবং এলাকাবাসীর দাবী দিদারকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তার জন্য পুলিশ প্রশাসন সঠিক ভাবে তদন্ত করলেই আসল সত্যটা বের হয়ে আসবে।

 

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গতকাল সোমবার দুপুরে দিদারের লাশ ময়নাতদন্ত করার জন্য উত্তোলন করা হয়। এসময় তার অর্ধগলিত লাশ তোলা হয়। কিন্তু এলাকাবাসীর অভিযোগ দিদারকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার পর তার লাশ গুম করার জন্য নিহতের মামা আফজাল মিস্ত্রির বাড়ীর টিনশেড ঘরের কাড়ে লাশ রেখে দেয়া হয়। এই লাশ যেন গুম করতে কোন অসুবিধা না হয় তার জন্য নিহতের লাশের পাশে ড্রাম রাখা হয়। যাতে করে রাতের আধারে ড্রামে করে লাশ নিয়ে ফেলে রাখতে পারে। 

 

কিন্তু সৃষ্টিকর্তার বিচার বলে একটি কথা আছে। তার আগেই তারা ধরা পড়ে যায়। ১৭ জুলাই ক্রোকেরচর আফজাল মিস্ত্রির বাড়ীর ঘর থেকে দিদারের লাশ উদ্ধার করে ক্রোকেরচর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এই ঘটনায় দাফনের ৬ দিন পর ২৩ জুলায় নিহতের স্ত্রী সুবর্ণা খাতুন বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় অজ্ঞাত নামা আসামী করে ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় পেনাল কোডে মামলা করেন, যার মামলা নম্বর ১৯।  


 
এদিকে এলাকাবাসী জানান, আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকেরচর এলাকার জালাল বেপারীর পুত্র মো. দিদার হোসেনের সাথে একই গ্রামের আফজল মিস্ত্রির কন্যা তুলির সাথে নিহত দিদার হোসেনের পরকীয়া প্রেম ছিল। আর এই সম্পর্ক দিদারকে হত্যাকারী তুলির পিতা জেনে যায়। দিদার এবং তুলি সম্পর্কে মামাতো বোন হয়। আফজাল নিহতের মামা হন। আর এই সম্পর্ক নিয়ে তাদের মাঝে প্রায়ই ঝগড়া হত। এক পার্যায় এই পরকীয়া সম্পর্কের জের ধরে আফজাল মিস্ত্রি, তার স্ত্রী রোজিনা, নিহত দিদার হোসেনের পরকীয়া প্রেমিকা তুলির স্বামী উজ্জল ও তুলি মিলে দিদারকে কৌশলে বাসায় ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করে। দিদারের লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে আফজালের টিনশেড বিল্ডিং এর কাড়ের উপর দিদারের লাশ লুকিয়ে রাখা হয়। পরে নিহত দিদারের লাশ আফজলের টিনশেড বিল্ডিং এর কাড় থেকে এলাকাবাসী উদ্ধার করে । যার ভিডিও সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

 

নিহতের বাবা জালাল বেপারী কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, আমার নিরীহ ছেলে দিদার দর্জির কাজের পাশাপাশি বাদাম বিক্রি করে সংসার চালাতো। ১৭ জুলাই আফজলের বাসার কাড়ের উপর লাশ দেখে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। এলাকার মেম্বার ও গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ তড়িঘড়ি করে লাশ দাফন করে ফেলে। সেই সাথে আমার যেন থানা পুলিশ প্রশাসেন না জানাই তার জন্য আমাদের হুমকি দেয় পঞ্চায়েতের লোকজন। আমাদের লাশ দেখতে দেয়নি। 

 

আমাকে বলে ভয় দেখায় থানা পুলিশ গেলে ২ লাখ টাকা খরচ হবে। এক পর্যায় তারা আমাদেরকে ৫ লাখ টাকা দিতে চায়। কিন্তু আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই। তাদের থেকে কোন টাকা নেই নাই। তখন তারা আমাকে বলে তুমি এত টাকা কোথায় পাবে। পরে যখন দিদারের মৃত দেহের ছবি ও ভিডিও পাই তখন ছবিতে দেখি রগ কেটে ও নির্মমভাবে নির্যাতন করে দিদার কে হত্যা করা হয়েছে। আমি আমার সন্তান হত্যাকারীদের বিচার চাই। সেই সাথে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানাই। অন্যদিকে থানায় মামলা হলেও এই হত্যার ঘটনায় পুলিশ কাউকে আটক করেনি বলে ভুক্তভোগী নিহতের পরিবার অভিযোগ করেছে।

 

দিদার হোসেন গত ১৬ জুলাই বিকাল ৩ টায় বাসা হতে বের হয়ে ফিরে আসেনি। পরের দিন সন্ধ্যায় করিম মিস্ত্রির পুত্র আফজল মিস্ত্রির বসত বাড়ি হতে দিদারের মৃত দেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত দিদার হোসেনের স্ত্রী সুর্বনা খাতুন বলেন, আমার মামী শাশুড়ী খুনী রোজিনার বাসা হতে দোকানের চাবি ও মোবাইল ফোন নিয়ে আসতে গেলে তখন জানতে পারি তাদের বাড়ির কাড়ে আমার স্বামীর লাশ পাওয়া গেছে। 

 

লাশ পাওয়ার দিন থানায় আসতে চাইলে মেম্বার ও এলাকার শালিসগণ  থানায় আসতে দেয়নি। এলাকার মেম্বার এবং পঞ্চায়েতের ব্যক্তিবর্গগণ আমাদের মামলা না করার জন্য ভয় ভীতি দেখান। তারা এই হত্যার মোড় ঘোরানোর জন্য প্রচার করে জীন ভূতে দিদারকে মারছে। খুনী আফজল, সিদ্দিক মাদবরের পুত্র খুনী উজ্জ্বল, উজ্জ্বলের স্ত্রী তুলি,আফজলের স্ত্রী রোজিনা সহ মামলায় কারো নাম দিতে দেয়নি মেম্বার ও এলাকার শালিসীগণ। যার ফলে হত্যাকারীরা এলাকায় দিব্বি ঘুড়ে বেড়াচ্ছে।

 

নিহত দিদার হোসেনের পরিবারের দাবী আমরা গরীব মানুষ বলে পুলিশ কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করছেনা। অপর দিকে খুনী আফজল ও উজ্জ্বল গংরা হত্যা মামলাটি ভিন্নখাতে নিতে মোটা অংকের টাকা নিয়ে মাঠে নেমেছে। মামলা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। আফজলের ঘরের কাড় (সিলিং) হতে লাশ উদ্ধার হলেও আসামী বিহীন মামলা রুজু করা হয়। এতে করে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।

 

মামলার তদন্তকারী অফিসার এস.আই আজাহারুল ইসলাম জানান, মামলার সঠিক তদন্ত ও মৃত্যুর কারণ জানার জন্য আদালতের নির্দেশে লাশ উত্তোলন করা হয়েছে। ময়না তদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়না তদন্তের রিপোর্ট আসলে বিস্তারিত জানা যাবে। বাদীর কোন আসামী সন্দেহ থাকলে সে ক্ষেত্রে আমরা তা আমলে নিয়ে তদন্ত সাপেক্ষে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবো। সেই সাথে এই ঘটনার সাথে যারা জড়িত আছে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।  জেসি/এন.এইচ
 

এই বিভাগের আরো খবর