বৃহস্পতিবার   ১৪ নভেম্বর ২০১৯   কার্তিক ৩০ ১৪২৬   ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

র‌্যাগিং-এর শিকার আমি আর আমার প্রজন্ম

প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর ২০১৯  

বাংলাদেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলছে নিপীড়নতন্ত্র। বড় ভাই ও বোনেরা শাসনের নামে অত্যাচার করে। চড় থাপ্পর মারে, স্ট্যাম নিয়ে পেটায় গণরুমে নিয়ে অত্যাচার করে, গেস্টারুমে নিয়ে অত্যাচার করে, খাবার ছিনিয়ে নেয়, অশ্লীল কাজে লিপ্ত করে, বিনা কারণে শাস্তি দিয়ে আনন্দ লাভ করে। এ যেন স্বৈর শাসকের হাতে শাসিত অসহায় আত্মা! সপÍম শ্রেণি থেকে বা কোথাও কোথাও তারও আগে, মাদ্রাসা, ক্যাডেট কলেজগুলো শিক্ষা জীবনের শেষ অবধি চলে এই অত্যাচার। যে প্রতিষ্ঠানগুলোয় রাজনীতি আছে,  যেখানে রাজনীতি নেই, সেখানে অত্যাচার করে সিনিয়রা।


দুর্ভাগ্যজনকভাবে র‌্যাগিং সংস্কৃতিটা দেশের সবচেয়ে মেধাবীরাই অনুশীলন করে। এটাকে তারা ‘‘মজা’’,  আদবকায়দা শোখানো, বাস্তব পৃথিবীর জন্য তৈরি করা ও সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক উন্নয়ন ইত্যাদি নামে প্রচার করে। এসবের নামে, নবীন শিক্ষার্থীদের নামে জোরপূর্বক সব রাজনৈতিক বড় ভাইয়ের পরিচয় মুখস্ত রাখা, পিতা-মাতা ও পরিবারের অন্যদের জড়িয়ে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার, সবার সামনে পুরোপুরি নগ্ন করে নাচানো, সবার সামনে চরম অশ্লীল বই পড়তে বাধ্য করা, সবার সামনে যৌন অভিনয় বাধ্য করা, টুথপেস্ট খেতে বাধ্য করা, সবার সামনে পর্নদৃশ্য দেখতে বাধ্য করা, রাতে মশার কামড় খাওয়ানোর জন্য বাহিরে দাঁড় করিয়ে রাখা, কান ধরে উঠ বস, বুকডন, মুরগি হয়ে বসিয়ে রাখা, প্রকাশ্যে কোনো মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দিতে বাধ্য করা, শীতের রাতে সিনিয়রদের কাজে বাইরে পাঠানো, সিগারেট, গাজাঁ, মদ্যপানে বাধ্য করা, ম্যাচের কাঠি দিয়ে রুম আর মাঠ এর মাপ নেওয়া, কোন আদেশ না মানলে গায়ে হাত তোলা, কথার মারপ্যাঁচে বিব্রত করা হয়। বড়রা অশ্লীল কথা খাতায় লিখে ছোটদের শাস্তি দেয়া, বেল্ট দিয়ে মারা, জোর করে জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়া, জুনিয়রদের অজান্তে ড্রয়ারের তালা ভাঙ্গা, জোর করে মিছিলে নেয়া। আবাসিক হল বা মাদ্রাসায় এমন হয়। এমন কি ক্যাডেট কলেজ গুলোতে সপ্তম শ্রেণি থেকে এই সংস্কৃতি চলে। 


ভাবতে অবাক লাগে, বুয়েট এর মতো উচ্চমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তিনটি হলে সাতটা টর্চার সেল কী করে হতে পারে? রাত ভর সেখানে র‌্যাগিং এর নামে কন্সেটেন্ট্রশন ক্যাম্পের বন্দীর মতো নির্যাতন চলে। বছরের পর বছর, প্রতিবছর চলছে এসব। এসব পেরিয়ে যার প্রাণ শক্ত যে বেঁচে থাকে। আবার কেউ কেউ টর্চারের শিকার হয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়াশুনার অমনোযোগী হয়ে পরে।


সম্প্রতি এক সংবাদ মাধ্যমে জানতে পারলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১জন ছেলেদের হলে নবীনদের নিয়ে এই রকমের র‌্যাগিং চলে।


প্রিয়ডটকমে ২০১৩ সালের ৩০ জানুয়ারির একটা লেখা : জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে আমার এক বোন (কাজিন) আজ প্রথম ক্লাস করতে গেছে, আইটি ডিপার্টমেন্টে, ফার্স্ট ইয়ার। ভাই ! বোনটা আমার সারা দিন কাঁদল, কাঁদল আমার খালা.......কিছুই করতে পারলাম না ভাই! ও জাহানারা হলে থাকে। ওর ডিপার্টমেন্টের বড় আপুরা ওকে ডেকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করে আধমরা করে দিয়েছে। ‘ক্লাসের বড় ভাইদের কাছে দিয়ে তোমর...মাপ দিয়ে আসো....


কম্পিউটার সায়েন্সে উচ্চশিক্ষা নিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন মিজানুর রহমান। কিন্তু তাঁর কম্পিউটার বিষয়ে প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন প্রথম বর্ষেই ভেঙ্গে গেছে। ফেব্রুয়ারিতে নিজ বিভাগের সিনিয়র শিক্ষার্থীর দ্বারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন তিনি। অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে হাজারো আশা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো রিকশাচালক বাবাকেই চিনতে পারেননি তিনি।

 

শেষে শিক্ষা কার্যক্রম বাদ দিয়ে বাড়িতে ফিরতে হয়েছে মিজানুরকে। (মানবজমিন, ৩ এপ্রিল ২০১৮) এর আগে জানুয়ারিতে র‌্যাগিংয়ের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনিয়রদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক হল ত্যাগ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এক শিক্ষার্থী। ওই মাসেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভর্তি হওয়া এক শিক্ষার্থীকে র‌্যাগ করা নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে বিশ্ববিদ্যাল ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে। এখানেই শেষ নয়।


বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের এক প্রাক্তা ছাত্রী তাঁর ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমার জীবনের প্রথম র‌্যাগিংয়ের অভিজ্ঞতা বুয়েটে। প্রথমে চার ঘন্ট একটা জানালাহীন ঘরে তালা দিয়ে আটকে রাখ। তারপর মেয়েরা কাঠের এবং ছেলেরা লোহার টুল মাথায় নিয়ে একতলা থেকে চারতলা ওঠা আর নামা। চার হাত-পায়ে হামাগুঁড়ি দিয়ে একটি স্টুডিও বা ক্লাসঘরে ঢুকতে বাধ্য হওয়া, হামাগুড়ি দিয়ে ছাড়া যেন ঢোকা না যায়, সে জন্য বড় বড় লোহার টেবিল  দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে দরজার মুখটা। প্রত্যেকে চার পায়ে ঢুকবে, টেবিলের তলা দিয়ে।  টেবিলের ওপর উৎসাহী ভাইয়ারা ময়দা, ডিম, নীলের গুঁড়ো, মুরগি-খাসি-গরুর হাড়, চকের গুঁড়ো নিয়ে অপেক্ষা করছে। যে যে ঢুকবে তার মাথা এবং শরীরে মাখিয়ে দেওয়া হবে। 


কোথায় যাবে এই নতুন প্রজন্ম! গ্রাম থেকে আসা মেধাবী ছাত্রদের আবাসিক ঠিকানা হলো হলগুলো। 


এবার আমি আমার সন্তান ও নিজের কিছু অভিজ্ঞতা জানাতে চাচ্ছি। অনেক বেশি প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মেধাবী প্রতিযোগীদের সাথে লড়াই করে, আমার ছেলে কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হয়। প্রথম দিন কলেজের আভিজাত্যপূর্ণ পরিবেশ থেকে আমি আর ওর বাবা মুগ্ধ হয়ে ছেলেকে রেখে আসি। আসার ৩ দিন পর থেকে নিয়ম-শৃঙ্খলার শেখানোর নামে বড়দের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে বলা হয় ও নতুন পরিবেশে গিয়ে সময় আর দায়িত্বের সাথে তাল মেলাতে পারছিল না। প্রতিটি মুহূর্তের সাথে কাজ ও নিয়মকে মেনে চলতে হত। তাই শারীরিক ভাবে কিছুটা অসুস্থ হয়ে যায়। কলেজ কর্তৃকপক্ষ ওকে সি.এম.এইচ ভর্তি করায়। এর পরবর্তীতে ওকে কলেজ হসপিটালে রাখা হয়। রাতে ঘুমিয়ে থাকলে বড়রা ওকে ঘুমের মধ্যে বালতি ভরে গাঁয়ে পানি ঢেলে দেয়।


এছাড়া নবম শ্রেণির বাচ্চারা ওর সাথে ঐ হসপিটালে ছিল।ওরা রাতে লুকিয়ে ক্রিকেট খেলা দেখত টিভিতে। আর ওকে দরজায় দাড়িঁয়ে পাহাড়া দিতে বলা হত। একদিন পাহাড়া দেওয়ার সময় রাত ২.০০ টায় দাড়িয়ে থেকেই ঘুমিয়ে যায়। সেজন্য ওকে খাটের নিচে ২ঘন্টা মুরগি বানিয়ে রাখা হয়। আমি পেরেন্টস ডে তে, ওকে দেখতে গিয়ে নিজেই মানসিকভাবে বিপর্যস্থ হয়ে পরি। ভয়ে আমার ছেলে ১ সপ্তাহ ধরে খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে, আরও বেশি অসুস্থ্য হয়ে পড়েছে। আমাকে সে সমস্ত ঘটনা খুলে বলে। আমি হসপিটালে দায়িত্বরত ডাক্তার ও অন্যান্যদের বিষয়টি অবহিত করি। আমার ছেলে এ বিষয়টি জেনে আরো ভীত হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে আমি ছেলেকে ক্যাডেট কলেজ থেকে নিয়ে চলে আসি। 

 

এবার আমি আমার সামান্য কিছু অভিজ্ঞতার কথা বলব। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ে শামসুন্নাহার হলে দ্বিতীয় বর্ষের আবাসিক ছাত্রী। আমার রুমমেট ছিল আমার জুনিয়র এক ছাত্রীনেত্রী। তার সাথে একই বেডে ঘুমাতাম। একবার বাসায় আসি। আমার জিনিসপত্রগুলো আমি লকারে তালা দিয়ে আসি। ৩ দিন পর দিয়ে দেখি ড্রয়ারে কোন জিনিস নেই। রুমের সবাইকে জিজ্ঞেস করলে কেউ কোন কিছু বললনা। পরবর্তীতে আমি রুম পরিবর্তন করি। 


প্রতিকার : র‌্যাগিং এর ক্ষেত্রে এই সস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচেতন হতে হবে। বিভিন্ন রকমের সুস্থ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন ক্লাস গঠন করা যেতে পারে। যেমন- বিতর্ক ক্লাব, সাহিত্য ক্লাব, ক্রিড়া ক্লাব, বিজ্ঞান ক্লাব ইত্যাদি। শিক্ষক ও প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিতদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। লেজুরবৃত্তি রাজনীতি বাদ দিয়ে আদর্শিক রাজনীতি চর্চা করতে হবে। অভিযোগ দেওয়ার মতো সৎ সাহস ও পরিবেশ থাকতে হবে। কেউ কেউ দলে পদ পাবার জন্য বড়দের সাহচার্যে অন্যায় করে, অন্যায় সহ্য করে, আনন্দ পায়, পড়াশুনায় অমযোগী হয়ে পড়ে, পারিবারিক বন্ধন থেকে দূরে সরে যায়, সহপাঠী বন্ধুদের সাথে শিথিল সম্পর্ক রাখে। 


শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে এইসব র‌্যাগিং সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। সুশিক্ষিত নতুন প্রজম্ম গড়ে তুলতে হবে। কারণ, সঠিক ও আদর্শিক রাজনৈতিক বাংলাদেশের প্রধান শক্তি। 


কামরুন্নাহার লিজা