রোববার   ২৬ জানুয়ারি ২০২০   মাঘ ১৩ ১৪২৬   ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১

রেস্তোরায় খাবার খাওয়া নিয়ে মহানগর বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলের ঝগড়া

প্রকাশিত: ৯ ডিসেম্বর ২০১৯  

যুগের চিন্তা রিপোর্ট : আংশিক কমিটি থাকা অবস্থাতেই দ্বন্দ্ব ও বিরোধে জর্জরিত মহানগর বিএনপির নেতারা। পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর এই বিরোধ মাত্রা ছাড়িয়েছে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় এক অর্থে বেকার সময় পার করছেন মহানগর বিএনপির নেতারা। তবে এসবের মধ্যেও একে অন্যের দিকে কাঁদাছোঁড়াছুরি থেকে নেই বিএনপি নেতাদের। মহানগর বিএনপির নেতাদের বলয় ভিত্তিক রাজনীতিতে এখন যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাদের সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যে কোন কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেয়ে বরং বিএনপি নেতারা পরস্পরের মধ্যে দ্বন্দ্ব-আধিপত্য বিস্তার আর পরনিন্দা-সমালোচনায় বিভোর রয়েছেন। 

জানা গেছে, রোববার বিকেলে মহানগর বিএনপির এক সিনিয়র নেতার সাথে ছাত্রদল নেতাদের নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের এক রেস্তোরায় খাবার খেতে দেখা যায়। সূত্র জানিয়েছে, রোববার একটি মামলায় মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি শাহেদ আহমেদ এবং সেক্রেটারি মমিনুর রহমান বাবুসহ কয়েক নেতা হাজিরা দেন। এসময় তাদের আইনজীবী হিসেবে ছিলেন মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এড.সাখাওয়াত হোসেন খান। তিনি বিএনপির তৃণমূল কর্মীদের বিনামূল্যে আইনীসেবা দেন। ছাত্রদলের নেতাদের হাজিরা শেষে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের অংশ হিসেবে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের রেস্তোরায় তাদের খাবারের আমন্ত্রণ জানান সাখাওয়াত। বেশ উৎসাহ নিয়ে আলাপচারিতার মাধ্যমেই খাবার খান বিএনপি নেতারা। সেলফিসহ নানা ছবি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেন নেতারা। ব্যস, এটুকুই।

 

সম্প্রতি নানাভাবে সাখাওয়াতকে চাপে ফেলতে একাট্টা মহানগর বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটির একাংশ এবং এড.তৈমূর আলম খানের সমর্থকরা। সেটির বিস্ফোরনই যেন ঘটলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। প্রথমে এই ঘটনাকে ইঙ্গিত করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবু আল ইউসুফ খান টিপু। 

 

তিনি তার ওয়ালে ছাত্রদল নেতাদের ইঙ্গিত করে লেখেন, ‘ খাওয়ালে ও দিলে নেতা ভাল,আর নয় ভাল না, এটা রাজনীতির সূত্র হতে পারে না।’ তাঁর এই স্ট্যাটাসে মন্তব্য করেন মহানগর যুবদলের সভাপতি ও নাসিক ১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খোরশেদ। তিনি লিখেন, ‘ইদানিং বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় দাওয়াত দিয়া খাওয়াইয়া কর্মী যোগাড় চলছে।’ এই দুই কমেন্টের পর পুরোদমে তোলপাড় ফেসবুকে। তর্ক-বিতর্ক, উপদেশ, অনাস্থা, অপরাজনীতি, কূটকৌশল, চোখ রাঙানি, ধমক-পাল্টা ধমকসহ নানারকম মন্তব্যে মহানগর বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল নেতাকর্মীরা জড়িয়ে পড়েন।     
নূর প্রধান নামে একজন যুবদল সভাপতি খোরশেদকে উদ্দেশ্য করে বলেন,  আমি আপনার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি,অন্তত আপনার মত দায়িত্বশীল একজন জনপ্রিয় নেতার কাছে, এমন নোংরা বক্তব্য আশা করেনি নারায়ণগঞ্জ বিএনপি তৃণমূল নেতাকর্মীরা। খোরশেদ উত্তর দিয়েছেন, এগুলা সত্য কথা। এরসাথে যুক্ত হন মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি সাহেদ আহমেদ। তিনি মন্তব্যে বলেন, ‘স্ট্যাটাসতে ইঙ্গিত ছিলো।’ নূর প্রধান আবার মন্তব্য করেন, ‘দাওয়াত দিয়ে খাওয়ায়,আর কে খাওয়ায় না সেটা বড় কথা না, কর্মীরা কারও বাড়ির দারোয়ান বা কাজের লোক না, কর্মীরা যেখানে সম্মান ও মূল্যায়ন পাবে সেখানেই যাবে,এটাই বাস্তব, কর্মীরা কোন নেতার কেনা গোলাম ও না, যে  কেউ দাওয়াত করলে যেতে পারবে না, কেন্দ্র যাদের নেতা বানিয়েছেন, তার অবশ্যই আমাদের তৃণমূলের নেতা।’

আক্রমন, পাল্টা আক্রমনের সাথে আবারো যুক্ত হোন স্ট্যাটাস দিয়ে শুরু করা মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবু আল ইউসুফ খান টিপু। তিনি মন্তব্য করেন, ‘রাজনীতির ব্যাপারে মতামত বড় ছোট সবাই দিতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে কেউই গায়ে না মাখালেই চলে। আর শিষ্টাচার মেনে চলা উচিত। নারায়ণগঞ্জে সবাই সবার চরিত্র সম্পর্কে জানে। মনে হয় ব্যক্তিগত আঘাত না করা ভাল, না হয় থলের বেড়াল বের হয়ে যাবে । কথা বলা হয়েছে বর্তমান রাজনীতি ধারাবাহিকতা সম্পর্কে । কেউ যদি সেটা গায়ে মাখে, তাতে বুঝা যায়- ‘ঠাকুর ঘরে কেরে, আমি কলা খাই নার মত’ ! 

 

টিপুকে উত্তর দিয়েছে ছাত্রদলের সাহেদও। তিনি মন্তব্য করেন, ‘ভাই প্লিজ আমরা আপনার ছাত্রদল এর ছেলেরা। এটলিস্ট আপনাদের ব্যক্তিগত রেশারেশি থেকে আমাদের দূরে রাখেন। প্লিজ ভাই আপনি আমাদের সাবেক সোনালী অতীত। আমাদের সাথে যে ব্যক্তিগত নোংরামি করছে আমরাতো তাকেই আঘাত দেই না কারণ চেষ্টা করি শিষ্টাচারের মাঝে নিজেদের রাখতে।এখন আপনারা যা শিখাবেন আমরা তাই শিখবো,আর বাধ্য হবো তাই করতে। আমরা বিএনপির অপরাজনীতি থেকে দূরে রাখতে চাই নিজেদের, আর আপনারা সিনিয়ররা কেউ স্বচ্ছ ও সততার সাথে ছাত্রদলকে কাজে লাগাননি। উল্টো কারো এজেন্ডা মাফিক আমাদের অপমান করেছেন।আপনি আমাদের বড় ভাই এবং আপনাকে সম্মান করি। দয়াকরে আমাদের বিষয়ে আপনি ব্যবহৃত হইয়েন না।’ কিন্তু থামেননি টিপু। উত্তর দিতে দেরী করেননি সাহেদও। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ছাত্রদলের নেতারা। একপর্যায়ে নানা গালিগালাজেও মন্তব্য গড়িয়েছে। একসময় চটে যান টিপু। তিনি মন্তব্য করেন, ‘সাহেদ কথা গুলো কাকে বলছো স্পষ্ট করে বল, না হয় আমরা কিন্তু এই পর্যন্ত ভেসে আসি নাই ।ছাত্রদল আমরা জম্ম দিয়েছি। তুমি একাই ছাত্রদল করো না ।’ ছাড়েননি সাহেদও। তিনি মন্তব্য করেন, আমি নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির যারা দায়িত্বে আছেন তাদের সবাইকে বলছি ভাই। কেউই ভাইস্যা আসে নাই আর আপনি আমাদের ছাত্রদলের সব থেকে সিনিয়র একজন সোনালী অতীত আপনি ভাইস্যা আসিবেন কেনো ভাই। কিন্তু আমরাও ভাইস্যা আসি নাই সেটা বুঝা উচিৎ। আর ভাই আমাদের কারো আপনাকে নিয়া কোন অভিযোগ নাই তবে অনুরোধ যেহেতু আপনি সেখানে থাকতেও মহানগর বিএনপি অকৃতজ্ঞ আর ছোট মনের পরিচয় দিছে, দয়াকরে আমাদের পাশে না দাঁড়াতে পারলেও আমাদের নিয়া কটু-কথা আর কুট রাজনীতি যেনো না হয়। এভাবে বলতে চাইনি কিন্তু সাধারণ একটা বিষয় নিয়া আপনাদের এরকম আচরণে আমরা হতাশ এবং দুঃখজনক। বড় ভাই আপনার এটলিস্ট বুঝা উচিৎ, সেখানে আপনি শুধু ব্যবহারই হচ্ছেন।আপনি বলছেন আর আমি কিন্তু ছেলেদেও লেখালেখি বন্ধ করায় দিয়েছি।’ কথার বানে একে অন্যকে ঘায়েল, সাথে তৃণমূল কর্মীদের মন্তব্যে জর্জরিত মহানগর বিএনপি। আশিকুর রহমান অনি নামে একজন মন্তব্য করেছেন, ‘আমাদের রাজনীতি আমাদের করতে দেন দয়া করে, আপনাদের রাজনীতির বিষে আমাদের রাজনীতিটাকে বিষাক্ত করবেন না দয়া করে। এখানে কেউ ভেসে আসে নাই সত্য, কিন্তু  কেউ যে ভেসে যাবে না সেটার কোন গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না ভাই।’

 

এছাড়া সাহেদ আহমেদ তাঁর ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘রাজনৈতিক পতিতাদের মুখে নীতির বাক্য মানায় না। রাজনীতিকে পেশা হিসেবে নিবেন আবার বেশ্যার ন্যায় মানুষের বিষয়ে বেহাইয়া-নির্লজ্জের মত আচরণ করবেন এটা সব যায়গায় চলবে না। নারায়ণগঞ্জ বিএনপির কথিত সিনিয়র পদধারী নেতারা একটু বুঝে-শুনে অপরাজনীতি করবেন। অন্যথায় যার যত বয়স তার ততো কাহিনী আছে, যেটা সবার সামনে নিখুঁত আকারে চলে আসবে। বিঃদ্রঃ- কে, কখন, কোথায় গিয়া কার পায়ে মাথা রেখে চলে আর দলের সাথে কে কখন বেঈমানী করেছে এবং নোংরামি করছে, দালালী করছে অথবা দালালদের থেকে টাকা খাইয়া পদায়ন করছে এধরণের অনেক কিছুই ছেলেরা জানে। শুধু একবার অনুমতি দিব তখন আর জবাব দিতে পারবেন না এবং মুখের পাকনা ও বড় কথা হারায় যাবে .... সাধু সাবধান।’

 

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি মহানগর বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন নিয়ে অসন্তোষ তৃণমূলে। নেতাকর্মীদের অভিযোগ, এই কমিটি শুধুমাত্র  ‘পকেট কিট’ (নেতাদের পছন্দের লোক দিয়ে কমিটি করা) করার কারণে মহানগর বিএনপিকে এই অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়েছে। যত ধরণের যুক্তিই দেখানো হোক না কেন সিদ্ধিরগঞ্জের ১০টি ওয়ার্ডের কোন নেতাকে মহানগরের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে না রাখাটা যে কারোরই চোখে পড়বে। বিএনপির গঠনতন্ত্র বিরোধীভাবে কমিটি গঠন করা হয়েছে এমন অভিযোগ যদি ১২ নভেম্বর নাসিক ১০নং ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি গোলজার খান ও একই ওয়ার্ডের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক (সাবেক পৌর এলাকা) বিএনপি নেতা নূরে আলম শিকদার বাদী হয়ে মামলা দায়ের না করতো তাহলে এই অভিযোগটি হয়তো অন্য কেউ তুলতো। কিন্তু অভিযোগ তোলার সুযোগ করে দিলো কারা। মহানগর বিএনপির সভাপতি আবুল কালাম ও সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামালও বা কেন এই অভিযোগের কোন উত্তর নেতাকর্মীদের দেননি। এখন মহানগর বিএনপির কার্যক্রমের ভবিষ্যত কি তাও কারো কাছে উত্তর নেই। 

এই বিভাগের আরো খবর