সোমবার   ০৪ মার্চ ২০২৪   ফাল্গুন ২১ ১৪৩০

মেট্রোরেল : নারায়ণগঞ্জ

করীম রেজা

প্রকাশিত: ২ জানুয়ারি ২০২৩  


উপমহাদেশের প্রাচীন বাণিজ্য নগরী নারায়ণগঞ্জ। রাজধানী শহর ঢাকার অতি সন্নিকটে অবস্থিত। ভূ-অঞ্চলের গুরুত্ব বিবেচনায়ও সারাদেশে নারায়ণগঞ্জ অনন্য। আর্থিক মানদন্ড জরিপের ফলাফল এই শহরকে ধনী জেলার মর্যাদা দিয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে, এই জেলা জাতীয় পর্যায়ে অত্যন্ত সাফল্য প্রমাণ করেছে।

 

 

বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জ শিল্প নগরীর আছে উল্লেখ্যযোগ্য অবদান। তৈরি পোশাক শিল্পের আগেও নারায়ণগঞ্জ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পাটশিল্পের বিকাশ ও ব্যবসার জন্য ছিল বিখ্যাত। প্রাচীনতম পৌর শহরের মধ্যেও নারায়ণগঞ্জ শহরের নাম প্রথম সারিতে।

 


কালে কালে শীতলক্ষ্যায় জল গড়িয়েছে অনেক। অনন্য বিশুদ্ধ জলবাহী শীতলক্ষ্যার প্রবাহ দূষিত হয়েছে। শিল্প বিকাশের লাগামহীন অপরিকল্পিত দৌরাত্মে। পৌরসভা থেকে নারায়ণগঞ্জ আজ সিটি কর্পোরেশন পরিচয় সেঁটেছে নিজের বুকে।

 

 

এক কালের বানিজ্য নগরী হয়েছে শিল্প নগরী। উন্নীত হয়েছে পরিবেশ উপযোগী সবুজ শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত পর্যায়ে। তবে এখনও নারায়নগঞ্জ প্রথম শ্রেণির সিটি কর্পোরেশনের মর্যাদা লাভ করতে পারেনি।

 


যোগাযোগ ব্যবস্থায় তেমন দর্শনীয় উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন বা পরিবর্তন করতে পারেনি। শীতলক্ষ্যার পূর্ব পাড়ে খানাখন্দ ভরাট করে প্রশস্ত সড়ক তৈরি হয়েছে। পশ্চিম পাড়ে তুলনা মূলক রাস্তা চওড়া করার কাজ তেমন করা সম্ভব হয়নি। পূর্বের স্থাপনা অপসারন অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব, তাছাড়া আছে পর্যাপ্ত জায়গার অভাব।

 

 

পয়: নিস্কাশন ব্যবস্থা পরিকল্পনার মাধ্যমে করা হলেও, সমস্ত বর্জ্য শীতলক্ষ্যায় পড়ছে। শিল্পবর্জ্যরে সঙ্গে মিলেমিশে নদীদূষণ ত্বরান্বিত করেছে। পয়নালার নিঃসরন মুখ নদীর এমন জায়গায় রাখা হয়েছে, যে সমস্ত স্থান দিয়ে লক্ষ লক্ষ যাত্রী এপার ওপার হয়। খেয়াঘাট, লঞ্চঘাট, নৌকাঘাটে সরাসরি শহরের নাগরিক দূষিত বর্জ্য দুর্গন্ধ ছড়িয়ে নদীর পানিতে মিশছে লাখ লাখ টন লিটার পরিমাণ।

 

 

কদমতলী পোস্তগোলা যাত্রাবাড়ি হয়ে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ সরাসরি স্থানান্তরিত হয়েছে কথিত লিংকরোড স্থাপনের দ্বারা।  ঢাকা-চট্রগ্রাম মহা-সড়কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাইনবোর্ড নামক সংযোগ স্থানে।লিংকরোড প্রশস্ত করে ৮ লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রবেশ মুখে সেই ৮ লেন যুক্ত হচ্ছে পূর্বের ২ লেনের সঙ্গেই । তাতে ফলাফল  কি হবে।

 

 

তা অবিজ্ঞানী ব্যক্তিও সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারেন। শহরের অভ্যন্তরে সাংবাদিক পুলিশ এবং রাজনীতি সমাজনীতি সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় চলছে বিদ্যুৎ চালিত অটোরিক্শা। চলছে অবাধে ফুটপাত বানিজ্য।

 

 

সাধারন মানুষ পায়ে হেটে চলতে হিমশিম খায় প্রতিনিয়ত। দেখা যায় ঘন্টায় ঘন্টায় যানজট, জট নিয়ন্ত্রনও অনেক সময় নতুন জটের জন্ম দেয় । ঢাকা নারায়ণগঞ্জের বাস পরিবহনে যাত্রীর বিড়ম্বনা নৈমিত্তিক কারনে বলা যায়, এখন প্রায় সহনীয়। এতদিন রেলওয়ে পরিবহন বিবিধ প্রতিকূলতার মাঝেও নাই  মামার কানা মামা হয়ে চলছিল। কিন্তু বিশেষ কারনে তাও কয়েক মাসের জন্য বন্ধ।

 


২০১৬ সালে শুরু হওয়া মেট্রোরেল প্রকল্প আংশিক সচল হল মাত্র চার পাঁচ দিন। ভবিষ্যতে তা পাতাল পর্যন্ত চালু হবে আশা প্রকাশ করা হয়েছে। এর আগে আমরা আকাশে উপগ্রহ পাঠিয়ে অভিজাত ক্লাবে নাম লিখিয়েছি। এবার হলাম মেট্রো মেম্বার। দিয়াবাড়ি স্টেশন থেকে আগারগাও পর্যন্ত সীমিত আকারে মেট্রোরেল চলবে। মাঝখানে কোনও স্টেশনে থামবে না।

 

 

কমপক্ষে ৬ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে মাঝখানের স্টেশন গুলো চালু হতে। দেরিতে হলেও কর্তৃপক্ষের বোধোদয় হয়েছে। খবর পাওয়া গেছে হয়ত অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মাঝের স্টেশনগুলো চালু হবে। বছর নাগাদ মতিঝিল পর্যন্ত চলাচলের আওতায় আসবে বলে কর্তৃপক্ষ মিডিয়াকে জানিয়েছে।

 


ঢাকা শহরের আশেপাশে নানা আকারে প্রকারে জনবসতি বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীবন্দর বানিজ্য নগর হওয়ার কারনে নারায়ণগঞ্জে ঘন জনবসতি বিদ্যমান ছিল। শিল্পবিকাশের ক্রমধারায় আরও ব্যাপক ও বিস্তৃত হয়েছে। অবশ্যই অন্যান্য পার্শ্ববর্তী এলাকার তুলনায় নারায়ণগঞ্জে অধিকাংশ মানুষের বসবাস। নারায়ণগঞ্জ শহর ও আশেপাশের বাসিন্দা প্রতিদিন ঢাকায় যায় চাকুরি,ব্যবসা, চিকিৎসাসহ অনেক রকম দরকারে।

 


ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেল যোগাযোগ দেশের প্রাচীনতম রেল সড়ক। বর্তমানে বন্ধ। কিন্তু কিছুদিন পূর্ব পর্যন্তও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের মধ্যে চলাচলকারী ট্রেনের সংখ্যা ছিল ৩২টি, বর্তমানে তা কমিয়ে ১৬টিতে আনা হয়েছে। এক সময় রেল যোগাযোগ বন্ধ করার মত অপচেষ্টাও হয়।

 

 

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জনচাহিদা বাড়ার প্রেক্ষিতে ট্রেনের সংখ্যা কমানো ষড়যন্ত্রমূলক, জনস্বার্থ বিরোধী। যদিও শেষ পর্যন্ত তা বন্ধ হয়নি কিন্তু কমানো হয়েছে ট্রেনের সংখ্যা, আবার বগির সংখ্যাও আগের চেয়ে অনেক কমিয়ে দেয়া হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে ঢাকা নারায়ণগঞ্জ রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা অযৌক্তিক অবহেলার শিকার।

 


মেট্রারেল পরিকল্পনা থেকেও নারায়ণগঞ্জ বাদ পড়েছে। তুলনামূলক কম জনঘনত্বের এলাকায় মেট্রারেল সংযোগ ঘটলেও নারায়ণগঞ্জের ভাগ্যে তা জোটেনি। বর্তমানে রেলসড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের কাজ চলছে। কমলাপুৃর স্টেশন থেকে বিদ্যমান সড়ক ধরেই মেট্রোরেলের লাইন নির্মাণ সম্ভব। তুলনা করে বলা যায় অন্যান্য অংশের মত ব্যয়বহুলও হবে না।

 

 

আয়ের কথা বিবেচনা করলেও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট স্টেশনের আয় থেকে নিশ্চিত অধিক হবে নারায়ণগঞ্জ স্টেশনের আয়। কিন্তু কোনও অজ্ঞাত কারণে নারায়ণগঞ্জ বিযুক্ত রয়ে গেল। স্থান সংকুলানের প্রশ্নেও দেখা যায় সংকটের সম্ভাবনা শূন্য। নারায়ণগঞ্জ রেল স্টেশনের নিজস্ব অনেক জায়গা অব্যবহৃত ও পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে।

 

 

সম্প্রতি রেলওয়ে স্টেশনের সেইসব অব্যবহৃত জায়গা কোনও স্বার্থান্বেষী মহল ইজারা নিয়ে মার্কেট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন সংগঠন, জনগণ সময়ে সময়ে মার্কেট নির্মানের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া দরকার মেট্রোরেলের দাবী।

 

 

কমলাপুর মতিঝিল থেকে মেট্রোরেল পরিকল্পনা সংশোধন করে যেন নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত সম্প্রসারিত  করা হয়। এর ফলে রাজধানী শহর থেকে বহুমুখী চাপ লাঘব হবে। মানবিক জট,স্থান সংকুলানের অভাব,প্রাতিষ্ঠানিক, পরিবহনজনিত অন্যান্য সব ধরণের চাপ হ্রাস পাবে।

 

 

বিভিন্ন সময়ে পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিয়ে সরকারি বেসরকারি অফিস আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিকেন্দ্রীকরন করা আজও পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। ধারনা করা যায় যে, ঢাকা নারয়ণগঞ্জের মধ্যে মেট্রারেল চালু করে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত, দ্রুত এবং বিস্তৃত করলে সব রকমের বিকেন্দ্রীকরণ স্বাভাবিক নিয়মে প্রয়োজনের তাগিদেই সংগঠিত হবে।

 

 

এখন দরকার সঠিক এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। জনগনের কষ্ট লাঘবে, জীবন যাপন সহজতর করে জাতীয় প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও মেট্রোরেলের ভূমিকা ও অবদানের কথা বিবেচনায় রেখে ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এন.এইচ/জেসি

এই বিভাগের আরো খবর