মঙ্গলবার   ২৬ মে ২০২০   জ্যৈষ্ঠ ১১ ১৪২৭   ০৩ শাওয়াল ১৪৪১

মহল্লায় মহল্লায় ব্যারিকেড, দুর্ভোগ বাড়ছেই

প্রকাশিত: ১১ এপ্রিল ২০২০  

শরীফ উদ্দিন সবুজ : জামতলা হায়দার আলী রোড থেকে একজন হকার পরশুদিন আমাকে ফোন দিল। তার বাসায় খাবার নেই। আমি বললাম ইউএনও’র নাম্বারে ফোন দাও।

সে বললো, ‘না ভাই। সরকারের লোকজন এসে আমাকে দিয়ে যাবে। সবাই দেখবে। বাচ্চারা লজ্জায় পড়বে। আপনি কিছু ব্যবস্থা করে দেন।’ আমি তাকে আসতে বললাম। কয়েকদিন আগে তার পা মচকে গেছে। হাঁটতে প্রচন্ড অসুবিধা হয়। 

রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড। রিকশা চলতে পারেনা। তবু সে বাধ্য হয়ে এই মচকানো পা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আল্লামা ইকবাল রোডে (তোলারাম কলেজের পাশে) আমার বাসায় এলো।  প্রেসক্লাব থেকে আমাকে কিছু খাদ্য দ্রব্য দেয়া হয়েছিলো বিতরনের জন্য। 

আমি সেখান থেকে তাকে একটি প্যাকেট দিলাম। সে প্যাকেটের ওজন কম না। আট কেজি চাল, তিন কেজি আলু, এক কেজি ডাল, দুই কেজি আটা, এক লিটার তেল, এক কেজি লবন, একটা সাবান। হকার ছেলেটিকে বললাম, তুমি আজ অর্ধেক নিয়ে যাও, কাল আবার নিও।’ 

প্যাকেটটির দিকে তাকিয়ে সে বললো, ‘না ভাই, আমারো কিছু লাগবে। আমার বোনকেও দিতে হবে। একবারেই নিয়ে যাই।' সে আবার তার মচকানো পায়ে ভরসা করেই রাস্তায় নামলো। মাথায় সেই খাবার বস্তা বয়ে চললো। 

পরে ফোনে জানালো, কিছুক্ষন যাওয়ার পর বিশ্রাম নিয়ে আবার  হেঁটে এভাবে সে এই খাবার নিয়ে গেছে। কিন্তু পা গেছে ফুলে। আজ এ লেখা লেখার সময়ও পায়ের ফুলা কমেনি। চেয়ারে বসেই নামাজ পড়তে হয়।
এই হকার ছেলেটির মতো অনেকের ঘরেই খাবারের সংকট। যারা হয়তো আত্মীয় বা পরিচিতের  বাসা থেকে খাবার নিতো। কিন্তু রিক্সা না চলায় নিতে পারছেনা। এরা কারো কাছ থেকে চাইতেও পারেনা। রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড এই  শ্রেণীর মানুষকে খাদ্য সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। 

পা ভাঙ্গা হলেও এই হকার ছেলেটা আসতে পেরেছে। কিন্তু যার বাসা নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে বেশ দূরে ? যে বাসায় শুধু মেয়েরা আছে ? কিংবা যে বাসায় শুধু বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা রয়েছেন তারা কিভাবে বাজারে যাবে ? ওষুধ কিনতে যাবে ? ব্যারিকেডের কারনে শহরে যে ত্রান বিতরণ হচ্ছে তা শহরের লোকজনই পাচ্ছে। একটু দূরের লোকজন পাচ্ছেনা।

গত ৮ এপ্রিল দিবাগত রাত দুইটায় কমিউনিষ্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা এডভোকেট মন্টু  ঘোষের স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন। গভীর রাতে নগরীর মিন্নত আলী শাহ্ সাহেবের মাজার পর্যন্ত এম্বুলেন্স গেলেও আর যেতে পারছিলোনা।

এরপর তার পরিবারের লোকজন রাস্তায় নেমে বাঁশের দড়ি কেটে, অল্প অল্প করে রাস্তার ইট পাথর সরিয়ে এম্বুলেন্স নেয়ার ব্যবস্থা করেন। 

আল্লাহর রহমত যে মন্টু ঘোষের স্ত্রী ঐ দিন রাতে মারা যাননি। কিন্তু এমন হলে তো ব্যারিকেড সরাতে সরাতে মানুষ মারা যাবে। আর কারো যদি ব্যারিকেড সরানোর মতো লোক না থাকে ? কিংবা বাসার পুরুষ ব্যারিকেড সরিয়ে এম্বুলেন্স আনতে গিয়েছে এ ফাঁকে যদি বাসায় ডাকাতি হয় ? এর দায় দায়িত্ব কে নেবে ?

সবচেয়ে মজার ঘটনা হলো মহল্লার নেশাখোর, ইয়াবা ব্যবসায়ী, ইভটিজার, চাঁদাবাজ  ছেলেগুলি এই ব্যারিকেড দিতে সবচেয়ে উৎসাহি। এর পেছনে কারনও আছে। এলাকায় এলাকায় এখন এসব ছেলেদের অভয়ারণ্য। 


সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ নিয়ম ভাঙ্গতে রাস্তায় নামছে না। রাস্তায় নামছে এই  শ্রেনীটাই। ব্যারিকেড থাকলে কোনো অভিযোগ পেলে পুলিশ র‌্যাব আসতে আসতে তারা দ্রুত পালাতে পারবে- এদের জন্য ভালোই।
 
গলাচিপায় সুগন্ধা বেকারির সামনে আমি দেখি কিছু ছেলে লাঠি, রড হাতে পাহারা দিচ্ছে। রিকশা আটকাচ্ছে। আবার তাদের সেবায় এখানে একটি চায়ের দোকান খোলা থাকে। তারা এখানে আড্ডা দেয়। যেনো ঈদের ছুটি।

শহীদ নগরের আমার এক ছোট ভাই বললো, সেখানে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে একটি ইয়াবা চক্র বেপরোয়া।

প্রতিদিন প্রচুর মানুষকে বাজার থেকে দীর্ঘ পথ হেঁটে জিনিসপত্র আনতে দেখা যায়। এটা জরুরি প্রয়োজন। রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে মানুষের বাজার করতে যাওয়া আটকানো যায়নি। যাবেওনা। বরং লাভের মধ্যে লাভ এটা হয়েছে মানুষকে চৈত্রের রোদে ঘামে ভিজতে ভিজতে বাজার করতে হয়। এতে অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা আরো বাড়ে।

করোনা প্রতিরোধে লকডাউন প্রয়োজন। কিন্তু এমন পরিস্থিতি কারো জন্যই ভালো নয় যে মানুষ  অতি প্রয়োজনীয় চলাচল করতে না পারে, যার অনুমতি সরকার দিয়েছে। তাই আমি দাবী করবো মহল্লার মহল্লার এই ব্যারিকেডগুলি দ্রুত সরানোর ব্যবস্থা করতে হবে।