সোমবার   ০৪ মার্চ ২০২৪   ফাল্গুন ২১ ১৪৩০

ভাষা আন্দোলনে না.গঞ্জ : প্রাসঙ্গিক ভাবনা

আহমদ তমিজ

প্রকাশিত: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩  

 

আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, আমাদের জাতীয় জীবনে এক অমলিন স্বাধীকারও স্বাধীনতা আন্দোলনের চেতনায় মূলে জরিয়ে আছে ৫২ ভাষা আন্দোলন, আর ভাষার লড়াইকে কেন্দ্র করেই সব আন্দোলনের কেন্দ্র বিন্দু হিসাবে অভ্যুদয় ঘটেছিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।

 

 

১৯৯৯ সালে জাতিসংঘে ইউনেস্কো কর্তৃক ২১ ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি এবং ২০১০ সালে জাতিসংঘের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ২১ ফেব্রুয়ারী মাতৃভাষা উদযাপনের পক্ষে প্রস্তাব পাসের ফলে বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ও ভাষা শহীদদের মর্যাদায় ইতিহাসে একটি উল্লেখ যোগ্য ঘটনা।

 

 

বলা হয় ভাষা আন্দোলনের শহীদের রক্তের ধারাবাহিকতায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। তবে এখনও কেউ কেউ বলে থাকেন ভাষা আন্দোলনে অংশকারীদের ত্যাগ ও তিতীক্ষার সঠিক মূল্যায়ন এবং তাদের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শণে আমরা ব্যর্থ হয়েছি; তাদের সঠিক মূল্যায়ন হওয়া উচিত।

 

 

বিশেষ করে ৫২’র ভাষা আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জের যারা অকুতোভয়ে অংশ নিয়েছিলেন তাদের সঠিকভাবে মূল্যায়নের দাবীটি হীনমন্যতার ঊর্ধ্বে উঠে বিবেচনায় দাবী রাখে। কারন রাজধানী ঢাকার পরেই এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জের ৫২ ভাষা আন্দোলনের এক অনন্য অসাধারণ ইতিহাস রয়েছে।

 

 

১৯৫২ সালে ৪ঠা ফেব্রুয়ারী কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়।  ঐ দিন একটি বিরাট মিছিল রাষ্ট্র ভাষার দাবিতে শহর প্রদক্ষিণ করে ২ নং রেল গেইটস্থ তৎকালীন রহমত উল্লাহ মুসলিম ইনস্টিটিউট এর প্রাঙ্গণে একটি সমাবেশ মিলিত হয়।

 

 

এ কে এম সামসুজ্জোহা (৭০ নির্বাচনে নির্বাচিত এম এন এ) সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন মো বজলুর রহমান, মোস্তফা সারোয়ার, সামছুল হুদা, সুলতান মাহমুদ মল্লিকসহ আরো অনেকে। ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্নস্থানে মিছিল সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিকে আরো উচ্চকিত ও বুলন্দ করা হয়।

 

 

এ সময় দেওভোগ পাক্কা রোডের মফিজ উদ্দিন আহমেদকে আহব্বায়ক ও খানপুরের আজগর হোসেন ভূঁইয়াকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে গঠন করা হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ এর পৃষ্ঠপোষকতায় ছিলেন এ কে এম সামসুজ্জোহা এর পাশাপাশি গঠিত হয় সর্ব দলীয় আহব্বায়ক কমিটি; এর আহব্বায়ক ছিলেন আ. গফুর চৌধুরী আর পৃষ্ঠপোষকতায় ছিলেন ছিলেন তৎকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলমাছ আলী।

 

 

২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ভাষা আন্দোলনের জড়িত রাজনৈতিক নেতা ও ছাত্র নেতৃবৃন্দের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২১ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবীতে ধর্মঘট আহবান করেন। এই ধর্মঘটকে সফল করার জন্য নারায়ণগঞ্জের খান সাহেব ওসমান আলীর চাষাঢ়া রেল গেইট সংলগ্ন বাইতুল আমান বাস ভবনে গোপন সভা হয়।  

 

 

যেখানে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন স্লোগান সম্বলিত আর্কষণীয় পোষ্টার লিখেন মোস্তফা মনোয়ার, (কবি গোলাম মোস্তফার ছেলে ও বিটিভির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা) পরের দিন নারায়ণগঞ্জ শহর রাষ্ট ভাষা বাংলার দাবিতে পোষ্টারে পোষ্টারে ছেয়ে যায়।  এতে ছাত্র জনতা ও বিভিন্ন স্তরের মানুষ রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবীতে উজ্জীবিত হয়ে উঠে।

 

 

২১ শে ফেব্রুয়ারি ছাত্র জনতার একটি বিরাট মিছিল সারা শহর প্রদক্ষিণ শেষে তৎকালীন রহমত উল্লাহ মুসলিম ইনস্টিটিউট চত্বরে একটি বিরাট জনসভায় মিলিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট লেখক চিন্তাবিদ আবুল হাশিম ( বাম বুদ্ধিজীবি বদরুদ্দিন ওমরের পিতা)  এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত সভায় বক্তব্য রাখেন মো আলমাছ আলী, মোস্তফা সারোয়ার, বজলুর রহমান, কাজী মজিবুর রহমানসহ আরো অনেকে।

 

 

এ সভা চলাকালীন সময়ে ঢাকায় ছাত্র জনতার উপর পুলিশের গুলিবর্ষণের খবর প্রচারিত হওয়ার সাথে সাথে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ ও ছাত্র জনতা প্রচণ্ড বিক্ষোভ ফেটে পড়েন। সভা শেষে একটি বিরাট মিছিল রাষ্ট বাংলা চাই ‘নুরুল আমিনের কল্লা চাই’ এই স্লোগানে স্লোগানে নারায়ণগঞ্জ শহর প্রকম্পিত হয়ে উঠে।

 

 

২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের গুলিবর্ষণ ও ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ২২ শে ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমগ্র শহর জুড়ে এসময় ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ২৩ শে ফেব্রুয়ারি কেন্দ্র ঘোষিত হরতালের  কর্মসূচি নারায়ণগঞ্জে পালিত হয়।  

 

 

ঐ দিন বিরাট বিক্ষোভ মিছিলের ছবি তুলতে গিয়ে শিল্পী মোস্তফা মনোয়ার পুলিশের হাতে ক্যামেরাসহ গ্রেফতার হন। বিকালে বর্তমান সরকারি মহিলা কলেজের জায়গায় প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা ও সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদের সভাপতিত্বে একটি বিরাট প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

 

 

এতে বক্তৃতা করেন এ কে এম সামসুজ্জোহা, ন্যাপ নেতা, সফি হোসেন খান, কৃষক শ্রমিক দলের নেতা এ এস এম সোলেমান,  নাজির মুক্তার, সুলতান মাহামুদ মল্লিক ও জানে আলম প্রমূখ। নারায়ণগঞ্জের ভাষা আন্দোলনে যারা অংশ নিয়েছেন নেতৃত্ব দিয়ে বাংলা ভাষার অমলীন অবদান রেখেছেন তাদের অনেকেরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন এ কে এম সামসুজ্জোহা, মোস্তফা সারোয়ার, খাজা মহিউদ্দিন, কবি হাফিজ, (হাফিজ উদ্দিন), সাংবাদিক হানিফ খান, ফুটবলার দুলু আফেন্দি, মুজাফফর আলী কন্ট্রাক্টর, আলমাছ আলী, কালু ভূইয়া,  গোলাম রাব্বানী খানসহ আরো  অনেকে।  

 

 

মহিলাদের মধ্যে বর্তমান এমপি শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের মাতা বেগম নাগিনা জোহা, লায়লা সারোয়ার,  ইলা বকশী, মনি মালা, ড. হালিমা খাতুন, ড. শরিফা খাতুন, আরো অনেকে।

 

 

বিশেষ করে মর্গ্যান গার্লস স্কুলের সে সময়ের প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগম,নারায়নগঞ্জের ভাষা আন্দোলনে ছাত্রীদের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন সভা সমাবেশে তার নেতৃত্বে ছাত্রীরা অংশ গ্রহণ করে আন্দোলন বেগবান করেছিলেন। ফলে তিনি অচিরেই সরকারের রোষানলে পতিত হন।

 

 

২৯ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জের ভাষা আন্দোলনে সুতিকাগার চাষাঢ়াস্থ বাইতুল আমান বাস ভবনে যাওয়ার পথে মমতাজ বেগমকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এই সংবাদ শহরের ছড়িয়ে পড়লে ছাত্র জনতা ও সাধারণ মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। অবস্থা বেগতিক দেখে তৎকালীন সরকার স্কুলের তহবিল তছরুপের দায়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে মিথ্যা প্রচার চালায়।

 

 

এসময় বিক্ষুব্ধ ছাত্র জনতা আদালত ভবন (পুরাতন কোর্ট)  ঘেরাও করে তার শর্তহীন মুক্তির দাবি করেন। এমতাবস্থায় মমতাজ বেগমকে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও ইপিআর ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ফলে চাষাঢ়া খান সাহেব ওসমান আলী বাস ভবনের সামনে রাস্তায় মমতাজ বেগমের মুক্তির দাবিতে ছাত্র জনতা পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।

 

 

এসময় পুলিশ ও ইপিআর বাহিনীর লাঠিচার্জ করতে করতে বাইতুল আমান বাস ভবনে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট চালায়।এমসয় এ কে এম সামসুজ্জোহা ও তার ভাই মোস্তফা সারোয়ারকে বাইতুল আমান থেকে পুলিশ আটক করে চাষাঢ়া ফাঁড়িতে নিয়ে অকথ্য শারীরিক নির্যাতন চালায়। পরে সফি হোসেন খান ও আমলা পাড়ার মোসলেহ উদ্দিনসহ অনেককে গ্রেফতার করে।

 

 

এর পরও পুলিশ ছাত্র জনতার প্রবল বাধা উপেক্ষা করে পুলিশ ও ইপিআর সদস্যরা মমতাজ বেগম কে ঢাকায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়।এর পরের ঘটনা আরো মর্মান্তিক সরকারের কূটচালে মমতাজ বেগমকে মুচলেকা দিয়ে জেল থেকে মুক্তি লাভের জন্য স্বামীর প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় স্বামী তাকে তালাক প্রদান করে।

 

 

রাষ্ট্র ভাষা বাংলার জন্য এই মহীয়সী নারীর জীবনের মূল্যবান স্বামী স্ত্রী সম্পর্ককে মূল্য না দিয়ে এক দৃষ্টান্তমূলক ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। দীর্ঘ কারাভোগের পর সংসার হারা মমতাজ বেগম নিঃস্ব অবস্থায় মুক্তি লাভ করেন। তার শেষ সম্বল গলার স্বর্ণের চেইনটি ঢাকা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার নির্মাণ ব্যয়ে দান করেন এক অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন।

 

 

নারায়ণগঞ্জ ভাষা আন্দোলনের অবদান রাখার জন্য একেএম সামসুজ্জোহা সরকারের একুশে পদকে ভূষিত হয়েছে।  পরে ২০১২ সালে শিক্ষয়ত্রী মমতাজ বেগম কে মরনোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়েছে।

 



কিছুদিন আগে পত্রিকার মাধ্যমে ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক একুশের পদক প্রাপ্ত ভাষা আন্দোলনের ভাবনা কেন্দ্র এবং জাতীয় যাদুঘরের উপদেষ্টা সামছুল হুদা এক প্রবন্ধে ভাষা সৈনিকদের জন্য সাত দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিলেন।

 

 

সেখানে জীবিত বা প্রয়াত ভাষা সৈনিকদের প্রথম সারীর স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসাবে সরকারি স্বীকৃতি, মাসিক ভাতা প্রদান, তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য সরকারি চাকুরী কোটা বরাদ্দ, আর্থিক অনুদান প্রদান, সরকারি আবাসন প্রকল্পে বিনামূল্যে ফ্ল্যাট বরাদ্দ জীবিত ভাষা সৈনিকের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করার কথা রয়েছে। যে কোন ভাবে বিশ্লেষণ করলে বলা যায় ভাষা সংগ্রামীরাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার অগ্রদূত নিঃসন্দেহে।

 



৫২ ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন ৫৪ যুক্ত ফ্রন্টের নির্বাচন, ৬৬ ছয়দফা আন্দোলন, ও ৭০ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় ৭১ মহান স্বাধীনতা যা একুশেরই সুবর্ণ ফসল। লেখক: আইনজীবী ও সাংবাদিক।

এই বিভাগের আরো খবর