রোববার   ৩১ মে ২০২০   জ্যৈষ্ঠ ১৭ ১৪২৭   ০৮ শাওয়াল ১৪৪১

ভার্চ্যুয়াল কোর্ট নিয়ে না’গঞ্জ আইনজীবীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

ইমতিয়াজ আহমেদ 

প্রকাশিত: ১৪ মে ২০২০  

দু’দিন চলতে পারলোনা ভার্চ্যুয়াল কোর্ট। নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি ভার্চ্যুয়াল কোর্টে মামলা পরিচালনা না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ফলে প্রশ্নটি সামনে এসেই গেলো, ভার্চ্যুয়াল কোর্ট চলবে কতদিন ? নাকি বন্ধ হয়ে যাবে এর কার্যক্রম। বারের সিদ্ধান্তের বাইরে অনেক আইনজীবী ভার্চ্যুয়াল কোর্ট চালু থাকার সপক্ষে কথা বলছেন।

 

সদস্যদের ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী না থাকা এবং ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী বিশেষ করে কম্পিউটার অপারেট করার অভিজ্ঞতা না থাকার কথা উল্লেখ করে সমিতি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে আইনজীবীদের মধ্যে।

 

বারের অনেক সিনিয়র সদস্য ও জনপ্রিয় আইনজীবীরা এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। সবমিলিয়ে ভার্চ্যুয়াল কোর্ট নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে তৈরী হয়েছে মতদ্বৈততা। নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এড. মুহাম্মদ মোহসীন মিয়া বলেন, আমাদের অধিকাংশ সিনিয়র ও বিজ্ঞ আইনজীবীর ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী নেই।

 

তাছাড়া তাঁরা এই ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী অপারেট করতেও জানেন না। তাহলে কিভাবে ভার্চ্যুয়াল কোর্টে মামলা চালাবেন। দেখা যাবে কোন কম্পিউটারের দোকানে বসে অনেক আইনজীবী একসাথে বসে কাজ করবেন। সেক্ষেত্রে কম্পিউটার অপারেটরের হাতেই থাকবে মূল চাবিকাঠি। বড় ধরনের অনিয়মের আশংকা থাকে।

 

কাজেই গতকাল আইনজীবী সমিতির কার্যকরী পরিষদের জরুরী সভায় ভার্চ্যুয়াল কোর্ট পরিচালনার বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় সর্ব সম্মতিক্রমে ভার্চ্যুয়াল কোর্টে মামলা পরিচালনা না করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

 

জানাগেছে, গতকাল নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এড. মুহাম্মদ  মোহসীন মিয়া  ও সাধারণ সম্পাদক এড. মোঃ মাহবুবুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠি দেয়া হয় বিজ্ঞ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, জজ কোর্ট, নারায়ণগঞ্জ বরাবর।

 

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির কার্যকরী পরিষদের জরুরী সভায় ভার্চ্যুয়াল কোর্ট পরিচালনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সভায় সমিতির সভাপতি সহ উপস্থিত সকল সদস্যগণ জানান যে, সমিতির বিজ্ঞ সিনিয়রগণ সহ প্রায় সকল সদস্যগণই ভার্চ্যুয়াল কোর্ট পরিচালনা করার ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী না থাকা এবং উক্ত ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা না থাকায় তাদের পক্ষে ভার্চ্যুয়াল কোর্টে মামলা পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।

 

এরই প্রেক্ষিতে কার্যকরী কমিটির সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় যে, নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্যগণের ভার্চ্যুয়াল কোর্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ইলেক্ট্রনিক্স সরঞ্জামাদী সম্পর্কে যথেষ্ঠ অভিজ্ঞতা না থাকায় আমাদের পক্ষে ভার্চ্যুয়াল কোর্টে মামলা পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। অর্থাৎ নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি ভার্চ্যুয়াল কোর্টে মামলা পরিচালনা না করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।   


এ বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এড. আনিসুর রহমান দিপু যুগের চিন্তাকে বলেন, এটা ভাল জিনিস। আইনজীবী সমিতি নি:সন্দেহে ভাল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেননা আমাদের এখানে ২০ শতাংস আইনজীবীরও ব্যক্তিগত ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ কম্পিউটার নেই। ফলে আপাতত ভার্চ্যুয়াল আদালতে প্রাক্টিস করতে পারবেনা অনেক বিজ্ঞ আইনজীবী।

 

তাই আপাতত এর কার্যক্রম বন্ধ রাখাই ভাল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল পদ্ধতী প্রয়োগ করলে আরো ভাল হবে।  কোর্টের মামলা জট দূর হবে। তবে এ জন্য আইনজীবী  ও কোর্টের স্টাফদের উপযুক্ত করে তুলতে হবে। বিচার প্রার্থীদেরও ডিজিটাল বিয়য়টি অবগত করতে হবে। এ জন্য সময় দরকার।  বিচার প্রার্থীদের বিষয়টি ভালভাবে জানাতে হবে। নইলে বিচার প্রার্থী ও আইনজীবীদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারে। অথচ ভার্চ্যুয়াল পদ্ধতিটা একটা ভাল ব্যবস্থা।

 
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেছেন, ভার্চ্যুয়াল কোর্টে রিমান্ড শুনানি করা যাবে না। রিমান্ড শুনানি না হলে জামিনও ঝুলে থাকবে। হয়তো সে দুদিন পরেই মুক্তি পেয়ে যেত কিন্তু এখন তো জামিন চাইতেই পারছেন না। এর মাধ্যমে ন্যায়বিচার আরও ব্যাহত হচ্ছে।

 

আমরা চেয়েছিলাম যেহেতু প্রায় সব কিছুই খুলে দেওয়া হয়েছে সেহেতু আমরাও নিরাপদ শারীরিক দূরত্ব মেনে প্রতিটি মামলার শুনানির একটি নির্ধারিত সময় নিয়ে তখন শুধু একজন পিপি ও মামলার উভয়পক্ষের একজন আইনজীবী দূরত্ব বজায় রেখে কোর্টে প্রবেশ করে শুনানি করবেন। যেহেতু বিচারকের আসন উপরে ও নিরাপদ দূরত্বে সেহেতু সেখানে ঝুঁকি কম। এই তথ্য প্রযুক্তির প্রক্রিয়াটি একটি শুভঙ্করের ফাঁকি, এতে কারোই সুফল পাওয়ার তেমন কোনো সুযোগ নেই।


অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত আরো জানান, এখন আইনজীবী সমিতির কার্যকরী কমিটির সিদ্ধান্ত হয়েছে, আর তাই নারায়ণগঞ্জের সব আইনজীবী এ আদালতের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকছি। এখানে তথ্যপ্রযুক্তির গ্যাঁড়াকলে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থী জনগণকে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই শুভঙ্করের ফাঁকিতে কারোই সুফল পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।


সিনিয়র আইনজীবী এড. খোকন সাহা বলেন,  কোর্টটা চালানো কঠিন ব্যাপার। প্রশিক্ষণ ছাড়া ভার্চ্যুয়াল কোর্টের কার্যক্রম চালানো সম্ভব নয়। আমাদের অনেক বিজ্ঞ আইনজীবীরই ল্যাপটপ বা কম্পিউটার নেই। ফলে ভার্চ্যুয়াল কোর্ট চালানো মুশকিল। এক্ষেত্রে জেলা আইনজীবী সমিতি ভাল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি এই সিদ্ধান্তের সাথে একমত। 


সিনিয়র ও বিজ্ঞ আইনজীবী এড. মাহাবুবুর রহমান মাসুম বলেন, এটা সময়োচিত সিদ্ধান্ত। আইনজীবী সমিতি সঠিক কাজ করেছে। তবে আমাদের আইন মন্ত্রণালয় ঠিক করে নাই। এমনিতেই চলছে করোনা সংকট। যেখানে সারাবিশ্ব করোনায় স্তব্ধ হয়ে আছে। সবকিছু বন্ধ। সেখানে বিচার-আচার কি দরকার। জরুরী প্রয়োজনে স্পেশাল কোর্টতো আছেই। 


অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম গণমাধ্যমকে বলেন, হঠাৎ করেই ভার্চ্যুয়াল কোর্ট চালু করা যাবে না। আমাদের সে ধরনের রিকোয়ারমেন্টস নাই। তা ছাড়া অন্যান্য দেশের বিচারকরা  নিজেরাই মামলার রায় টাইপ করতে পারেন। আইনজীবীরাও মামলা টাইপ করতে পারেন। কিন্তু আমাদের দেশে অধিকাংশ বিচারক রায় টাইপ করতে পারেন না।

 

এ জন্য আগে আদালতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। ভার্চ্যুয়াল কোর্ট সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। তিনি বলেন, ভার্চ্যুয়াল কোর্টে একজন বিচারক থাকবেন, তারসঙ্গে অন্যান্য স্টাফরাও থাকবেন। তাই এটা চালু করা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার বলে তিনি মনে করেন।


এদিকে, এ বিষয়ে ভিন্ন প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেছেন অনেক আইনজীবী। তাদের বক্তব্য হচ্ছে এমনিতেই দীর্ঘদিন কোর্ট বন্ধ ছিল। আইনজীবীরা ছিল বেকার। তাদের জন্য কোন প্রণোদনা নেই। ভার্চ্যুয়াল কোর্ট চললে অন্তত তাদের হাতে কাজ থাকবে। এখন সবাই ডিজিটাল পদ্ধতী সম্পর্কে অবগত। কিছু লোকের ল্যাপটপ বা কম্পিটার না থাকতেই পারে-তাই বলে অধিকাংশ আইনজীবীতো বেকার বসে থাকতে পারেনা। 


একই সুরে কথা বললেন বারের সাবেক সভাপতি ও বিজ্ঞ আইনজীবী এড. আব্দুল বারী ভূইয়া। তিনি বলেন, মানুষ মরলে চিকিৎসা দরকার নাকি মরার আগে চিকিৎসা দরকার। মহামান্য হাইকোর্টের ফুল বেঞ্চ ডিসিশন নিল। তখন বার নেতৃবৃন্দ বিরোধীতা করেন নাই।

 

রাষ্ট্রপতি প্রজ্ঞাপন জারী করার পর গেজেট হয়ে আসলো। আইনটি হওয়ার আগে এর বিরোধীতা করে আন্দোলন হওয়া উচিৎ ছিল। তখন কিছুই হয় নাই। বার নেতারা বলছেন তথ্য প্রযুক্তির ইনস্ট্রুমেন্টের অভাব। আমি দেখছি আছে। প্রায় সবাই তথ্য প্রযুক্তি বোঝেন। তথ্য প্রযুক্তি অনেক ডেভেলাপ। তথ্য প্রযুক্তির অজুহাতে কোর্ট বন্ধ থাকলে ছোটখাটো মিথ্যা মামলায়  জেলে বন্দি বাড়বে।

 

আমাদের জেলখানার ধারণ ক্ষমতা কম। বন্দি বাড়লে জেলখানায় মহামারি ঘটবে। কোর্টের কার্যক্রম বন্ধ থাকার চেয়ে ভার্চ্যুয়াল পদ্ধতীতে চলমান থাকাই শ্রেয়। এ বছর অনেক নতুন আইনজীবী বেরিয়ে এসেছেন। তাঁরা কি করবেন। না খেয়ে মরবেন নাকি। খোদা না করুক করোনা যদি ৬ মাস বা একবছর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হয় তাহলে আইনজীবীদের কি হবে। 


কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবী বলেন, করোনাভাইরাসের এ পরিস্থিতিতে ভার্চ্যুয়াল কোর্ট গঠনের সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে সাধারণ আইনজীবীদেরকে  যেন এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় এবং তারা যেন এটা ব্যবহার করতে পারেন, তাহলে বিচারপ্রার্থীরা লাভবান হবেন। সুপ্রিমকোর্টের উভয় বিভাগের পাশাপাশি নিম্ন আদালতও এই অনলাইন বিচার ব্যবস্থার আওতায় আসবে।


ফৌজদারি বিশেষজ্ঞ দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, ভার্চ্যুয়াল কোর্ট গঠনের উদ্যোগ অত্যন্ত পজেটিভ। তবে এটা চালু করা আমাদের জন্য দুরহ ব্যাপার। রাতারাতি চালু করা যাবে না। কারণ, আইটি বিশেষজ্ঞসহ সহায়ক অন্যান্য দক্ষ জনবল দরকার।

 

তিনি বলেন, স্বল্প পরিসরে ভারতবর্ষে ও সিঙ্গাপুরে এটা রয়েছে।  বর্তমান পরিস্থিতিতে এটা চালু করার ক্ষেত্রে মানুষের জীবনে ঝুকিও রয়েছে। সেক্ষেত্রে স্বল্প পরিসরে  কিছু কিছু জায়গায় আদালত খোলা রাখা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
 

এই বিভাগের আরো খবর