রোববার   ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ৩০ ১৪২৬   ১৭ রবিউস সানি ১৪৪১

বেপরোয়া ডিসবাবু কারাগারে (ভিডিও)

প্রকাশিত: ১৮ এপ্রিল ২০১৯  

স্টাফ রিপোর্টার (যুগের চিন্তা ২৪) : চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার নারায়ণগঞ্জ  সিটি করপোরেশন (নাসিক)  ১৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল করিম বাবু ওরফে ডিশ বাবুকে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত।

কোর্ট ইন্সপেক্টর হাবিবুর রহমান জানান, ডিসবাবুর পক্ষে আদালতে কোন আইনজীবী জামিন আবেদন না করায় আদালত তাকে জেলহাজতে প্রেরণ করেন। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে ডিশবাবুকে আদালতে নিয়ে আসা হয়।  এরআগে চাঁদাবাজির অভিযোগে বৃহস্পতিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুর আড়াইটায় সদর উপজেলার পাইকপাড়া এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।  ডিশবাবু পাইকপাড়া শাহসুজা রোডের  মৃত আ.গফুর মিয়ার ছেলে।

 বন্দরের মদনগঞ্জ উত্তর পাড়ার রেললাইন দক্ষিণ কলাবাগ (বারেক সাহেব এর বাড়ির ভাড়াটিয়া) মো.কাউসার ডিশবাবুর বিরুদ্ধে একটি চাঁদাবাজির মামলা (মামলা নং-৩২) দায়ের করেন । এরভিত্তিতেই ডিশবাবুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

মামলার বাদী এজাহারে উল্লেখ করেন, আসামী আব্দুল করিম বাবু (ডিস বাবু) (৫০), দীর্ঘদিন নারায়ণগঞ্জ শহরে কেবল নেটওয়ার্কের ব্যবসা করে আসছে। বিবাদী জোরপূর্বক বন্দরে তাহার  লোকজন দিয়ে কেবল নেটওয়ার্কের ব্যবসা পরিচালনার চেষ্টা করছিলো। এবং বিভিন্ন জায়গায় কেবল নেটওয়ার্র্কের তার কেটে ফেলে তার নিজেস্ব নেটওয়ার্ক লাইন সংযোগ দেয়ার চেষ্টা করে। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বন্দর কেবল নেটওয়ার্কের সত্ত্বাধিকারী পারভেজ আলম এবং মো.সাইফুল ইসলাম (শ্যামল) এর সাথে ডিশবাবুর দীর্ঘদিন যাবত বিরোধ চলছিলো। নেটওয়ার্কের ব্যবসার জন্য এলাকার দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বন্দর কেবল নেটওয়ার্কের মালিকের নিকট ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে।

এরই জেরে গত ১৭ এপ্রিল বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বন্দরের ফরাজিকান্দা বাজারের রিতুর বাড়ির সামনের নেটওয়ার্কের মেরামত কাজ করা কালে আসামী বাবুর প্ররোচনায় সহযোগিতায় ও নির্দেশে মো.সজিব (৩৫), মো. রিতু (৩২), মো. রনি (৩৪), মো.জুম্মাল (৩৪), নিজুম, রানা (৩৫) সহ আরো অজ্ঞাত নামা ৪/৫ জন বিবাদী লাঠি-সোঠা ও  দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বেআইনী জনতাবন্ধে পথরোধ করে এলোপাথারীভাবে মারপিট করে এবং নগদ ১০ হাজার ৫০০ টাকা, একটি ফাইভার মেশিন যার মূল্য-১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও একটি মই নিয়ে যায়। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।

এছাড়া ডিশবাবু সদর মডেল থানার আরো তিনটি মামলার সিএস ভুক্ত আসামী। এর মধ্যে একটি মামলায় গ্রেফতারকৃত আসামী দেলোয়ার হোসেন ওরফে ছোট দেলু ও ঝন্টু দুজনই ১৬৪ ধারায় বিজ্ঞ আদালতে আব্দুল করিম বাবু (ডিস বাবু) ওই মামলার ঘটনার সাথে জড়িত আছে মর্মে জবানবন্দি প্রদান করেছে।

এদিকে ডিসবাবু গ্রেপ্তারের সংবাদে পাইকপাড়া এলাকায় স্বস্তি নেমে এসেছে বলে মন্তব্য করেন স্থানীয়রা। তারা বলেন, এতোদিন ডিশবাবুর বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলার সাহস করতোনা। কেউ এলাকায় এব্যাপারে মুখ খুললেই তাকে নানাভাবে হয়রানি করতো ডিশবাবু। ডিশবাবুর নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সন্ত্রাসী ক্যাডার বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে বলেও জানান তারা। যেকোন সময় হুটহাট করে এলাকায় মহড়া দিয়ে চারপাশে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতো তারা।

এছাড়া ডিশ বাবু ক্যাবল নেটওয়ার্ক ব্যবসা দিয়ে সবাইকে জিম্মি করে রেখেছিলো এমন অভিযোগও রয়েছে। সরকারি কোন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান সম্প্রচারের সময় ডিশবাবুকে পাওয়া যেতনা। নিজের ইচ্ছামত চ্যানেল বরাদ্দ রাখতো সে তার ব্যবসায়। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর একটি অনুষ্ঠান সরকারি টেলিভিশনে লাইভের সময় প্রশাসন থেকে তাকে আগেই বলে রাখা হয়েছিলো। কিন্তু অনুষ্ঠানের দুদিন আগে থেকে লাপাত্তা হয়ে যান ডিশ বাবু। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের জনতার মুখোমুখি অনুষ্ঠানটি ক্যাবল টিভিতে লাইভ করতে বললে তিনি প্রথমে হ্যাসূচক মতামত দেন। কিন্তু পরবর্তীতে সেটি আর সম্প্রচার করেননি তিনি।

এছাড়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মাধ্যমে পোলিও টিকা কর্মসূচিতে জনসচেতনা বৃদ্ধিতে তাকে প্রশাসনের কর্মকর্তারা বারবার তাগাদা দিয়েও সাড়া পাননি। লিগ্যাল এইডের সচেতনতা মূলক বিজ্ঞাপন দিতে গেলেও অনেককে হয়রানি করার অভিযোগ আছে ডিশবাবুর বিরুদ্ধে।
এদিকে ডিশবাবুর গ্রেপ্তারের সংবাদে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরাও। অনেকে বলেন, তার অনেক কুকর্মের কথা ও তথ্য জানা থাকলেও এব্যাপারে ডিশবাবুর বক্তব্য নিতে গেলে তিনি সেই টিভি চ্যানেল না দেখানোর হুমকি দেন। এছাড়া টিভি চ্যানেল সম্প্রচারে নানা তালবাহানা দেখান। এছাড়া নানা সময় সাংবাদিকদের সাথে দুর্ব্যবহার করেন ডিশবাবু।

সম্প্রতি নগর ভবনে দুই কাউন্সিলরের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। সেদিন তৃতীয় পক্ষ হিসেবে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের উদ্দেশ্যে সদলবলে মহড়া দেন ডিশ বাবু। তার উপস্থিতিতে নাসিক নগর ভবন থেকে ডিশবাবুর লোকজন এক সাংবাদিকের মোবাইল কেড়ে নেন। তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
এছাড়া আদর্শ বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজে স্কুল কমিটির ফান্ড নিয়েও নয়ছয় করার অভিযোগ আছে ডিশবাবুর বিরুদ্ধে। স্কুল কমিটির শিক্ষক-শিক্ষিকা ও অভিভাবকদের সাথে দুর্ব্যবহার করেন নিয়মিত ডিশবাবু। স্কুলের হিসাব নিকেশ চাইলে ভয়ংকর হয়ে ওঠে ডিশবাবু।  

এদিকে পাইকপাড়া এলাকার লোকজন জানান, ডিশবাবুর নেতৃত্বে ব্লেড বাহিনী নামে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে এলাকায়। এই ব্লেড বাহিনীর লোকজনের কাজ, কেউ ডিশবাবুর বিরুদ্ধে কথা বললে তাকে পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়া।

এছাড়া এই ব্লেড বাহিনী বাবুর বিরুদ্ধে থাকা লোকজনকে জোর করে ধরে এনে কাউন্সিলর অফিসে নির্যাতন চালাতো এবং গুম করে ফেলার হুমকি দিতো। স্থানীয়রা জানান, এই ব্লেড বাহিনীর ছেলেগুলো অধিকাংশ বস্তির। তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ডিশবাবু। ডিশবাবুর  একটি কেলেঙ্কারির পরপরই এই ব্লেড বাহিনী গড়ে তোলে সে। এই ব্লেড বাহিনীকে দিয়ে নাসিক মেয়রের সমর্থকদেরও হুমকি দিতো ডিশবাবু। তাকে গ্রেপ্তারে গোটা এলাকায় স্বস্তি নেমে এসেছে।
 

এই বিভাগের আরো খবর