সোমবার   ০৪ মার্চ ২০২৪   ফাল্গুন ২১ ১৪৩০

বেতিয়ারাযুদ্ধে নয় সহযোদ্ধাকে হারানোর বেদনা ৫২ বছরপরও ভুলতে পারিনা

বীর মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান

প্রকাশিত: ৮ ডিসেম্বর ২০২২  

 

একাত্তরে ডিসেম্বর মাসে আমরা মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানীদের পরাজিত করে বিজয় অর্জন করেছিলাম। নতুন প্রজন্মকে মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা তুলে ধরার জন্য এই বিজয়ের মাসে ‘দৈনিক যুগের চিন্তা’য় একাত্তরে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশনের কাহিনী তুলে ধরা হচ্ছে। আজ ছাপা হলো বীর মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমানের লেখা কুমিল্লার বেতিয়ারা যুদ্ধে ৯ সহযোদ্ধাকে হারানোর কাহিনী। 

 

 

বীর মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান : মুক্তিযুদ্ধকালে একটি বড় যুদ্ধ হয়েছিল কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বেতিয়ারা গ্রামে। সেই যুদ্ধে আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিলাম, এটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ ঘটনা। একই সঙ্গে সেই যুদ্ধে আমার সবচেয়ে কষ্টের ঘটনাও ঘটেছিল। তা হল যুদ্ধ করতে করতে আমরা আমাদের নয় জন মুক্তিযোদ্ধাকে হারিয়েছি। যুদ্ধে তারা পাকিস্তান বাহিনীর গুলিতে জীবন দিয়েছেন। যুদ্ধের মাঠে আমরা পাশাপাশি অবস্থানে ছিলাম। এটা আমার জীবনের একটি করুন অধ্যায়। কিন্তু তারপরও মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আমরা পাকিস্তানীদের পরাজিত করে এই দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছি সেটাই আমাদের জীবনের সাফল্য।

 

 

মুক্তিযুদ্ধকালে আমি গোদনাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীতে অধ্যয়ন করতাম। একই সাথে আমি ঢাকেশ্বরী কটন মিলে চাকরিও করতাম। ১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক রেসকোর্স মাঠে যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন তাই আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধ ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করেছিল।

 

 

২৫ শে মার্চ পাকিস্তানের সৈন্যরা বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষনা করেন। এরপরই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। আমরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানীর আগরতলায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। আমি ও ঢাকেশ্বরী মিলের শ্রমিক নেতা তবারক খন্দকারের ছেলে তাহের খন্দকার এবং আমার সহপাঠী সাত্তারকে নিয়ে  আমরা ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হই।

 

 

আমরা নারায়ণগঞ্জ থেকে লঞ্চে প্রথমে চাঁদপুর যাই। চাঁদপুর থেকে বাসে হাজীগঞ্জে। হাজিগঞ্জ থেকে নৌকায় সোনাপুর গ্রামে যাই। সেখানে থেকে পায়ে হেঁটে প্রথমে রামগঞ্জ, তারপর সোনাইমুড়ি পৌঁছি। সোনাইমুড়ির পাশেই ভারতীয় সীমান্ত। আমরা খুব ভোরে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যাই। আমরা বিলোনিয়া ক্যাম্পে গিয়ে যোগদান করি। সেখান থেকে আগরতলা শহরে গিয়ে জয় বাংলা অফিসে যোগাযোগ করি। জয় বাংলা অফিসেও আমরা আমাদের গোদনাইল ও নারায়ণগঞ্জের অনেক লোকের দেখা পাই। তারা আমাদেরকে দেখে খুশি হন। আমাদের প্রশিক্ষণের জন্য বদদোয়ালি ক্যাম্পে পাঠানো হয়। বদদোয়ালি ক্যাম্পে গিয়ে আমরা আমাদের এলাকার অনেকের দেখা পাই। তারপর তাদের মধ্যে ছিলেন আশেক আলী মাস্টার, মীর মোশাররফ হোসেন আব্দুস সোবহান, আব্দুল আজিজ, শুকুর মাহমুদ, শহীদুল্লাহ সাউদ, আওলাদ হোসেন প্রমুখ।

 

 

বদদোয়ালি ক্যাম্প থেকে আমাদেরকে আরো উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য মেঘালয়ের কাছে বালিপাড়া নামক স্থানে পাহাড় ঘেরা একটি সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই ক্যাম্পে আমাদেরকে এসএলআর, এল এম জি,স্টেনগান সহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এবং কিভাবে বোমা হামলা করে বিভিন্ন স্থাপনা উড়িয়ে দিতে হবে তারও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

 

 

প্রশিক্ষণ শেষে আমাদেরকে বলা হয় এবার তোমরা বাংলাদেশে গিয়ে পাকিস্তানি বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত হও। এরপর আমাদের পাঠানো হয় ত্রিপুরার বাইখোড়া ক্যাম্পে। সেখানে গিয়ে আমরা ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও রায়পুরার ৭৫ জনের মত গেরিলা বাহিনীর সদস্য অস্ত্র গোলাবাড়ি নিয়ে সজ্জিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি।  সেখান থেকে আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় ত্রিপুরার দক্ষিণ দিকে ভৈরব টিলা নামক একটি স্থানে।  

 

 

সেখানে একটি স্কুলের পাশে একটি বটগাছের নিচে অমরা সবাই অবস্থান নেই। সেখান থেকেই আমাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে হবে বলে আমাদের জানানো হয়। সেখানে গিয়ে আমরা দেখা পাই আমার চাচাতো বড় ভাই এম এ খালেক ও  আদমজীর শহীদুল ইসলাম নামে আরেকজনকে। আমরা ভৈরব টিলায় অবস্থান অবস্থান নেই ১১ই নভেম্বর সন্ধ্যা সাতটায়। আমাদেরকে বলা হয় এখান থেকেই আজ রাতেই আমাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে হবে এবং কিভাবে প্রবেশ করতে হবে তার একটি পরিকল্পনা আমাদেরকে জানিয়ে দেয়া হয়। বলা হয় কোন কারণে যদি আমরা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারি তাহলে আবার এই ভৈরব টিলার এই স্কুলে আমরা ফিরে আসব। বলা হলো  গ্রামের ভিতর দিয়ে আমাদের দলটিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পেরিয়ে নোয়াখালীতে প্রবেশ করবে, সেখান থেকে কুমিল্লা হয়ে আমাদের ঢাকায় যেতে হবে।

 

 

পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাদের পুরো গ্রুপে ৭৫ জনের মধ্যে ২৫ জন করে এক একটি গ্রুপ করা হয়। সেই গ্রুপগুলো ছিল নারায়ণগঞ্জ গ্রুপ, ঢাকা গ্রুপ এবং রায়পুরা গ্রুপ।  এর মধ্যে ঢাকা গ্রুপের গ্রুপ লিডার ছিলেন নিজামুদ্দিন আজাদ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। আমাদের নারায়নগঞ্জ গ্রুপের লিডার ছিলেন আমাদের এলাকার মীর মোশাররফ হোসেন। রায়পুরা গ্রুপের গ্রুপ লিডার কে ছিলেন এই মুহূর্তে ঠিক মনে করতে পারছিনা। আর পুরো ৭৫জনের গ্রওপের নেতা ছিলেন ইয়াফেস ওসমান (বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্র)। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রত্যেক গ্রুপ লিডারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। প্রথম গ্রুপ প্রবেশ করার পর দ্বিতীয় গ্রুপ, দ্বিতীয় গ্রুপের পর তৃতীয় গ্রুপ। এভাবেই সবাই বাংলাদেশে প্রবেশ করার পরিকল্পনা করা হয়।

 

 

এক পর্যায়ে আমাদের যারা স্থানীয় গাইড ছিলেন তারা সংকেত দিলেন যে এখন প্রবেশ করা যায়। বাংলাদেশের প্রবেশের পরিকল্পনা আমাদের সামনে তুলে ধরার সময় বলা হয় আমরা দুইজন গ্রামীণ সরু রাস্তার দুই পাশে এলএমজি নিয়ে অবস্থান করবো এবং আমাদের মাঝ দিয়ে সরু রাস্তা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পার হয়ে দেশে প্রবেশ করবে। আমরা এলএমজি নিয়ে ধানক্ষেতের মধ্যে পজিশন নেই। রাত ঠিক দশটার সময় আমাদের মুক্তিযোদ্ধার প্রথম দলটি রাস্তা দিয়ে ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়।  

 

 

কিন্তু আমরা তখন আমাদের বুঝতে পারিনি আমাদের সামনে কি কঠিন বিপদ অপেক্ষা করছে। আমাদের প্রথম দলটি বাংলাদেশের ঢোকার আগেই পাকিস্তানের সৈন্যরা খবর পেয়ে যায় যে, এই এলাকা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। তারা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে ভারী অস্ত্র নিয়ে অবস্থান করতে থাকে। যেই আমাদের প্রথম গ্রুপটি আমাদের পাশ দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পা রাখে তখনই চতুর্দিক থেকে পাকিস্তানীরা গুলীবর্ষন শুরু করে। পাকিস্তানিদের গুলীর শুরুর সাথে সাথেই আমরাও আমাদের এলএমজি থেকে গুলীবর্ষন শুরু করি।  পাকিস্তানিরা ভাবতেই পারেনি তাদের গুলির জবাব মুক্তিযোদ্ধারা এভাবে দেবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

 

 

আমরা ব্রাসফায়ার করতে করতে পাকিস্তানিদের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসাগর সড়কেই আটকে রাখি। এই ফাঁকে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে আবার ভৈরব টিলায় ফিরে যায়। তখন পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রায় চার পাঁচ ঘন্টা প্রচন্ড গোলাগুলি হয়। একপর্যায়ে আমরা নিশ্চিত হই যে, আমাদের সব মুক্তিযোদ্ধা পিছু হটে ভৈরব টিলায় চলে গেছে। এমন নিশ্চিত হয়ে আমরা আমাদের পজিশন থেকে এলএনজি নিয়ে ক্রলিং করে পিছু হটে বৈরব টিলায় চলে আসি। আমরা ফিরে দেখি অনেক মুক্তিযোদ্ধাই ফিরে আসেনি। পরে জানতে পারি আমাদের নয়জন মুক্তিযোদ্ধা সেই যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন।  

 

 

কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের লাশ আনতে আমরা আর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাছে যেতে পারিনি। কারণ তখনও পাকিস্তানিরা সে এলাকায় টহল দিচ্ছিল। যদিও তারা জানতে পারেনি, জানলে হয়তো তারা মুক্তিযোদ্ধাদের লাশগুলিও নিয়ে যেতো। পরে খবর পাই স্থানীয় কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধাদের লাশগুলো একত্র করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে কবর দিয়েছেন। একদিন পর আমরা হিসাব করে দেখি আমাদের নয় জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন।

 

 

তারা হলেন আমাদের গোদনাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র শহীদুল্লাহ সাউদ, নারায়ণগঞ্জের লক্ষ্মখোলার তরুণ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র) আওলাদ হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সিরাজুম মনির, জহিরুল হক, দুদু মিয়া, আবদুল কাইউম, আবদুল কাদের, মোহাম্মদ সফিউল্লাহ ও বশিরুল হক। এছাড়াও নিজামউদ্দিন আজাদকে পাকিস্তান বাহিনী ধরে নিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ৫২ বছর কেটে গেছে কিন্তু আজও সেই শহীদ সহযোদ্ধাদের কথা ভুলতে পারিনা।

এস.এ/জেসি

এই বিভাগের আরো খবর