রোববার   ০৫ এপ্রিল ২০২০   চৈত্র ২১ ১৪২৬   ১১ শা'বান ১৪৪১

বিনম্র শ্রদ্ধায় ভাষা শহীদদের স্মরণ

প্রকাশিত: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

ইমতিয়াজ আহমেদ : রাত ১২টা ১মিনিট। একুশের প্রহরে বিনম্র শ্রদ্ধায় মহান ভাষা শহীদদের স্মরণ করলো নারায়ণগঞ্জবাসী। জেলার আপামর জনতার পক্ষ থেকে শহীদ মিনারে প্রথমে শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. জসিমউদ্দিন ও পুলিশ সুপার মো. জাহিদুল আলম। 

 

এরপর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। 

 

সকালে প্রভাত ফেরি। জেলার রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি ও সুধীমহলসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন শহীদ মিনারে জড়ো হয়ে ভাষা শহিদদের শ্রদ্ধা জানাবে। সকলের মুখে থাকবে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি। ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু ঝরায়ে ফেব্রুয়ারি।’ ফুল হাতে ছোট শিশুরা যাবে স্কুলের মাঠে। শহীদ মিনারে। ছোট শিশু দিয়ার প্রশ্ন ‘আব্বা ভাষার জন্য কি কেউ রক্ত দেয়। পুলিশ নাকি ছাত্রগো গুলি কইরা মারছে।’ 

 

পিতার উত্তর হ্যা ভাষার জন্য আমরা বাঙালী জাতি রক্ত দিয়েছি। বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন করায় তৎকালীন পাকিস্তানী পুলিশ নিরীহ ছাত্রদের উপর গুলি চালিয়েছিল। সে দিন ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি। পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছেন আমাদের সালাম, বরকত, রফিক ও জব্বার ও সফিউদ্দিনসহ অনেকে। সেদিনের ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগে আমরা ফিরে পেয়েছি আমাদের মায়ের ভাষা বাংলা ভাষা। 

 

পশ্চিম পাকিস্তানী সামরিক জান্তা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছিল। কিন্তু বাঙালী জাতি তা রুখে দিয়েছে। ছোট শিশু দিয়া এতসব না বুঝলেও এতটুকু বুঝতে পেরেছে ২১ ফেব্রুয়ারিতে ভাষা আন্দোলনে ছাত্ররা প্রাণ দিয়েছিল। সে কারণে শ্রদ্ধার সাথে এই দিনটিতে ভাষা শহিদদের স্মরণ করা হয়। সকালে খালি পায়ে প্রভাত ফেরি করে সবাই শহীদ মিনারে গিয়ে ফুল দেয়। কিন্তু ছোট শিশু দিয়া প্রভাত ফেরি দেখেনি। কেননা ওদের মহল্লায় প্রভাত ফেরি হয়না। 

 

স্কুলের শহীদ মিনারে সকলেই জুতা স্যান্ডেল পায়ে দিয়েই ফুল দিতে যায়। আজকাল ঘনবসতির কারণে বাড়ি বাড়ি ফুল বাগান নেই। তাই ফুল কিনে নিতে হয়। ছোট শিশু দিয়া বায়না ধরে পিতার কাছে। ফুল কিনে দেয়ার জন্য। সে সহপাঠীদের সাথে স্কুলের শহিদ মিনারে ফুল দিতে যাবে। স্কুলে ক্লাসে ও দুরন্ত টিভি চ্যানেল দেখে সে মহান একুশ কি-এ বিষয়ে কৌতুহলি হয়ে উঠেছে। তার আরেকটি প্রশ্ন ছিল-আব্বা বাংরেজি আবার কি ভাষা। তাকে বুঝিয়ে বলতে হল বাংলা ভাষাকে ইংরেজির মত বিকৃত উচ্চারণ করাকেই অনেকে বিদ্রুপ করে বাংরেজি বলে।  


আজ সবার সব পথ এসে মিলে যাবে এক অভিন্ন গন্তব্য শহীদ মিনারে। হাতে হাতে বসন্তে ফোটা ফুলের স্তবক, কণ্ঠে নিয়ে চির অম্লান সেই গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি...’ ধীর পায়ে এগিয়ে যাবে আবাল-বৃদ্ধ বনিতা। ভাষা শহীদদের প্রতি নিবেদিত  শ্রদ্ধার  ফুলে ফুলে ঢেকে যাবে শহীদ মিনারের বেদি। আজ একুশে ফেব্রুয়ারি, মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক  মাতৃভাষা দিবস।

 

বাংলা মায়ের বীর সন্তানেরা মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার্থে আজ থেকে ৬৮ বছর আগে ১৯৫২ সালের এই দিনে বুকের রক্তে রঞ্জিত করেছিলেন ঢাকার রাজপথ। পৃথিবীর ইতিহাসে সৃষ্টি হয়েছিল মাতৃভাষার জন্য আত্মদানের অভূতপূর্ব নজির। মাতৃভাষার জন্য বাঙালির আত্মদানের এই অনন্য ঘটনা স্বীকৃত হয়েছে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে। ১৯৯৯ সালে ইউনেসকো একুশে  ফেব্রুয়ারিকে ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে।

 

আজ বাঙালির সঙ্গে সারা বিশ্বেই দিনটি পালিত হচ্ছে। বরাবরের মতোই এবারও মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের প্রস্তুতি শুরু হয় গতকাল শুক্রবার বিকেল থেকেই। দোয়েল চত্বর, চানখাঁরপুল, টিএসসি, পলাশী মোড় থেকে শহিদ মিনারগামী পথগুলো যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এসব পথে ঐতিহ্যবাহী আলপনা আঁকতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন নবীন আঁকিয়েরা।

 

দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্বের সব ভাষাভাষীর প্রেরণার উৎস। পৃথক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব ভেদাভেদ ভুলে একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাঁর বাণীতে বলেছেন, ‘আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি এখনো বিজাতীয় আগ্রাসন  থেকে মুক্ত হয়নি।’

 

আজ সরকারি ছুটির দিন। দেশের সর্বত্রই আজ প্রভাতফেরি করে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হবে শহীদদের স্মৃতির প্রতি। সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে।

এই বিভাগের আরো খবর