রোববার   ১৭ নভেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ৩ ১৪২৬   ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

পেঁয়াজের ঝাঁজ বেড়েই চলছে, সবজিতে স্বস্তি

প্রকাশিত: ৬ নভেম্বর ২০১৯  

স্টাফ রিপোর্টার (যুগের চিন্তা ২৪) : পেঁয়াজ নেই, এমন কোন রান্না ঘর হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ কোন রান্না শুরু করার আগে, কড়াইতে তেল দেয়ার পরপরই সাধারণত যে উপাদানটি ব্যবহার করা হয় সেটি পেঁয়াজ। শুধু অন্য রান্নার অনুষঙ্গ নয়, কাঁচা খেতেও পোঁজ বেশ সুস্বাদু। এছাড়া সরাসরি কাঁচা পেঁয়াজ, ভর্তা, আচার এবং সালাদ হিসেবেও পেঁয়াজের কদর কম নয়।

 

পেঁয়াজের রয়েছে বেশ কিছু স্বাস্থ্যগুণও। সব কিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ তো বটেই বিশ্বের প্রায় সব দেশেই চাহিদা রয়েছে পেঁয়াজের। তবে, বেশ কিছু দিন ধরেই দেশে পেঁয়াজের বাজারে ঝাঁজ কমেনি বরং বেড়েই চলছে। কেজি প্রতি দাম গত সপ্তাহের চেয়ে ১০-২০ টাকা দাম বেড়েছে।

 

বাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১২০-১৪০ টাকা দরে। অন্যদিকে ভারত থেকে পেঁয়াজ রপ্তানী বন্ধ হওয়ার পরে বাজারে এখন ভারতের পেঁয়াজ দেখা যায়না। মায়ানমার (বার্মা), মিশর, তুরস্ক ও আন্যান্য দেশের পেঁয়াজ কিছুটা দেখা গেলেওে এর দাম দেশি পেঁয়াজের সমান এবং ক্ষেত্র বিশেষ কিছুটা বেশি।

 

পেঁয়াজের দাম না কমার ব্যাপারে একজন বিক্রেতা সাথে কথা বললে তিনি জানালেন, বাজারে চাহিদা বেশি, কিন্তু সে তুলনায় বেশি পেঁয়াজ বাজারে নেই। মায়ানমার ও তুরস্কসহ কয়েকটি দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করার পরও দাম না কমার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের দেশের আমদানি করা পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন চট্টগ্রামের কয়েকজন ব্যবসায়ীর একটি সিন্ডিকেট। তারা যেভাবে পেয়াজের দাম নির্ধারণ করেন সে অনুযায়ী এ দাম ওঠা-নামা করে।

 

“গরুর মতো পেঁয়াজ-রোশনেও আমাদেরকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে, পেঁয়াজ এখন হালি দরে বিক্রি হচ্ছে, আপেলের কেজি এবং পেঁয়াজের কেজি একই-এসব কথা শুনতে শুনতে কিংবা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে দেখতে দেখতে এখন বিরক্তি লাগে” ঠিক এমনটাই জানালেন শহরের মিশনপাড়া থেকে দ্বিগুবাবুর বাজারে আসা মাহফুজুর রহমান নামের একজন ক্রেতা। তিনি যখন বাজার পেঁয়াজের বাজার নিয়ে এমনটা বিরক্তি প্রকাশ করছিলেন ঠিক তখনই তার সাথে আসা জামান নামের একজন ডিম কিনে নিয়ে আসেন।

 

ডিমের হালি কত করে কিনেছেন জানতে চাইলে তিনি জানান, হালি হিসেবে কিনিনি-তবে এক কুড়ি ১৬০ টাকা। তখন হিসেব করে দেখা গেলো প্রতি হালি ডিমের দাম ৩২ টাকা করে। যা গত সপ্তাহে ছিল ৩৪-৩৬ টাকা করে। মিজান নামের একজন মুদি ব্যবসায়ীর দোকানের সামনে বসে যখন এমন কথা চলছিল তখন হঠাৎ করেই তিনি বলেন, তাহলে ডিম ওজন করে দেখি। পেঁয়াজের দামের সাথে সমান হয় কি-না। দেখা গেলো ১৪-১৬ টি ডিমে প্রায় ১ কেজি হয়েছে যা ১ কেজি পেঁয়াজের দামের সমান। তখন তিনিই আবার রসিকতা বলে বললেন, ডিম এবং পেঁয়জের কেজি একই দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে খুচরা বাজারে ডিম বিক্রি হচ্ছে ৩৪-৩৬ টাকা হালি দরে।

 


মিজানের ডিম মাপা নিয়ে রসিকতা দেখে আমরা আর হাসি ধরে রাখতে পারিনি। কিছুটা হলেও তখন মাহফুজুর রহমানের হাসি এবং সাময়িক সময়ের জন্য স্বস্তি ফিরে আসে। তবে মাসদাইর থেকে বাজার করতে আসা মাসুদুর রহমান নামে একজন জানালেন তিনি এই বাজারে (দ্বিগুবাবুর বাজারে) আসলে সাধারণত ৫ কেজি পেঁয়াজ কিনেন। কিন্তু এখন কিনেছেন ২.৫ কেজি। বাজারের বাজেট একই রেখে কম পরিমাণ কেনা-কাটা করছি।

 


তবে পেঁয়াজের দাম বাড়তে থাকলেও নিত্য প্রয়োজনীয় সবজির তালিকায় বেশি চাহিদা সম্পন্ন আলুর দাম গত সপ্তাহের মতো স্থিতিশীল রয়েছে। প্রতি কেজি আলু এখন বিক্রি হচ্ছে ২৫ টাকা দরে। তবে পাইকারি বাজারে এক পাল্লা (৫ কেজি) এক সাথে কিনলে দাম হয় ১০০ টাকা অর্থাৎ প্রতি কেজি ২০ টাকা দরে।

 


শীতের আগাম সবজির দামেও রয়েছে কিছুটা স্বস্তি। গত সপ্তাহের মতো এর দাম কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে। বাজারে দেখা ফুলকপি ও বাাঁধা কপি বিক্রি হচ্ছে প্রতিপিস ২০-২৫ টাকা, লাউ বিক্রি হচ্ছে প্রতি পিস ৩০-৪০ টাকা দরে, গাজর প্রতি কেজি  বিক্রি হচ্ছে ৭০-৮০ দরে, সিম প্রতি কেজি ৮০-১০০ টাকা, টমেটো প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬০-৮০ টাকা, কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকা। তবে এ সপ্তাহে শশার দাম কিছুটা বেড়েছে। শসা প্রতি কেজি ৬০-৮০ টাকা দরে যা গত সপ্তাহে ছিল ৩০-৪০ টাকা।

 

সবজির দাম কমে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে একজন বিক্রেতা জানান বাজারে শীতের আগাম সবজি আসা শুরু হয়েছে।পাইকারি বাজারে দাম কমে যাওয়ায় এবং আশে-পাশের জেলা থেকে প্রচুর সবজি আসছে, তাই বাজরে এর দাম কমে গেছে।

 

শীতের আগাম সবজির পাশাপাশি কম রয়েছে পেঁপে, কাঁচকলা, কুমরা, লাল শাকসহ কিছু শাক-সবজির দাম। বাজারে প্রতি কেজি পেঁপে বিক্রি হচ্ছে ১০-১৫ টাকা, কাঁচকলা প্রতি হালি ১৫-২০ টাকা, করল্লা ও কাকরোল প্রতি কেজি ৪০-৬০ টাকা, পোটল প্রতি কেজি ৩০-৪০ টাকা, বটবটি প্রতি কেজি ৮০-১০০ টাকা, কুমরা প্রতি পিস আকার ভেদে ৩০-৫০ টাকা যা গত সপ্তাহে ছিল ৪০-৮০ টাকা, লাল শাক ও পালং শাক প্রতি কেজি ২০-৩০ টাকা, ডাট প্রতি আঁটি ২০-৩০ টাকা।

 

মাংসের বাজার পূর্বের মত কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে। শহরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে দেখা গেছে ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১২৫-১৪০ টাকা এবং দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৪৩০-৪৫০ টাকা। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫৫০-৬০০ টাকা এবং খাসির মাংস ৮০০-১০০০ টাকা।

 

শহরের ৫নং মাছ ঘাটের বাজারসহ দিগুবাবুর বাজার, কালির বাজার, বাবুরাইল বউ বাজার এবং খানপুর বউ বাজারসহ বাজারগুলেতে প্রচুর মাছের সরবরাহ রয়েছে। মাছের দামের ক্ষেত্রেও রয়েছে কিছুটা স্থিতিশীলতা। আকার ও বাজারভেদে প্রতি কেজি রুই মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩৫০-৬৫০ টাকা, কাতলা ও মৃগেল মাছ ৩০০-৬০০টাকা, পাঙ্গাস মাছ ১১০-১৪০টাকা, কই মাছ ১৪০-১৮০, তেলাপিয়া মাছ ১৩০-১৭০ টাকা, চিংড়ি মাছ ৬০০-১২০০ টাকা।

 

বর্তমানে বাজারে ইলিশ মাছের সরবরাহ দেখা যাচ্ছে প্রচুর পরিমাণে। তবে এর দাম কম নয় বরং পূর্বের তুলনায় কিছুটা বেশি বলে জানালেন একজন বিক্রেতা। প্রতিটি ১কেজি ওজনের কম-বেশি ইলিশ মাছ বিক্রি হচ্ছে ৬৫০-৮৫০ টাকা কেজি দরে। তবে হালিতেও বিক্রি হচ্ছে ইলিশ মাছ। আকার ভেদে ১হালি ইলিশ মাছ ১ হাজার ৬০০ টাকা থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু বাজারে প্রচুর পরিমাণ ডিমওয়ালা ইলিশ (মা ইলিশ) দেখা যাচ্ছে। একজন ক্রেতা এগুলো দেখে খুব আক্ষেপ করে জানালেন নিষেধাজ্ঞা আরও বাড়ানো উচিত ছিল।


ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে গত ৯ থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত মা ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ ছিল। তাই এই ২২ দিন সারা দেশে ইলিশ শিকার, আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ, ক্রয়, বিক্রয় ও বিনিময় নিষিদ্ধ করেছিল সরকার। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রতিবছরের মতো এবারও ইলিশের প্রজনন নির্বিঘœ করতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। প্রতিদিনও চলে এর বিরুদ্ধে অভিযান।


“এসময়ের মধ্যে কিছু অসাধু জেলে প্রভাবশালীদের সহয়তা নিয়ে প্রশাসনের চোখ ফাাঁকি দিয়ে ইলিশ মাছ ধরা অব্যাহত রেখেছে। এবং সেগুলো লুকিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছে। যেগুলো এখন বাজারে আসছে। তাই কিছু কিছু ডিমওয়ালা মা ইলিশ মাছ বাজারে দেখা যাচ্ছে।” ঠিক এমনটাই জানালেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বিক্রেতা।

এই বিভাগের আরো খবর