শনিবার   ২৪ আগস্ট ২০১৯   ভাদ্র ৯ ১৪২৬   ২২ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ওলটপালট

প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০১৯  

স্টাফ রিপোর্টার (যুগের চিন্তা ২৪) : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে ক্রমশ নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিগত কয়েকবছর ধরে ধারাবাহিকভাবে শহরের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ওসমান পরিবারের প্রভাব ক্ষয়িষ্ণু বলে মত বিশ্লেষকদের। আর জেলা শহরের রাজনীতিতে প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমান ও নাসিক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর সাথে সাথে রূপগঞ্জ আসনের এমপি (বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী) গোলাম দস্তগীর গাজী (বীর প্রতীক), আড়াইহাজার আসনের এমপি নজরুল ইসলাম বাবরু (কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবে সাধারণ সম্পাদক) এবং জাতীয় শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক কাউসার আহমেদ পলাশের প্রভাব বাড়ছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।  

 

তাদের মতে, জেলা শহরের রাজনীতিতে প্রভাব পুরো জেলাতেই বিচরণ করে। এসূত্র ধরে এবার বিভিন্ন উপজেলার প্রভাবশালী নেতা, এমপি ও বিশিষ্টজনেরা জেলা শহরের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। বিগত প্রায় ৮ বছর ধরে নারায়ণগঞ্জ শহরের রাজনীতিতে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেছেন মেয়র আইভী এবং এমপি শামীম ওসমান। তাদের বাইরে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন একটি শক্তিশালী অবস্থান ছিলো। আব্দুল হাই জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ার পর নগর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তারও একটি প্রভাব তৈরি হয়েছিলো। তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়াকে কেন্দ্র করে হেভীওয়েট প্রার্থীরা জেলা শহরের রাজনীতির প্রভাবের বিষয়টি অনুধাবন করেন। নির্বাচনের পর থেকেই এমপি এবং প্রভাবশালী আওয়ামী নেতারা জেলা শহরের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হচ্ছেন।  

 

বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের ঘরোয়া রাজনীতিতে বেশ কয়েকবছর ধরেই কোনঠাসা শামীম ওসমান। তবে জেলার বাইরে রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার এবং সোনারগাঁ এবং বন্দর আওয়ামী লীগের বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি। এটিকে মোটেও ভালোভাবে যে নেয়নি নিজ দলের বিভিন্ন আসনের প্রার্থীরা তা টের পাওয়া যাচ্ছে নির্বাচনের পর। আর তাই তো এমপি গোলাম দস্তগীর গাজী জেলার প্রথম মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েই মনোযোগী হয়েছেন জেলা শহরের রাজনীতিতে। মনোনিবেশ ছিলো উপজেলায়ও মেরামত করা। ১৬ জুলাই সর্বসম্মতিক্রমে তাকে রূপগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছে।

 

তবে গাজী মন্ত্রী হবার পর বেশ কয়েকবার জেলা শহরের রাজনীতির বিষয়ে কথা বলেছেন। মেয়র আইভীকে সমর্থন দিয়ে বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাত থেকে হকার সরানোর ব্যাপারেও দৃঢ় বক্তব্য রেখেছেন। তাছাড়া জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। এব্যাপারগুলোকে বিশ্লেষকরা জেলা শহর রাজনীতিতে প্রভাব তৈরি করার প্রক্রিয়া হিসেবেও দেখছেন। জেলা শহরের রাজনীতিতে মন্ত্রী গাজীকে শক্ত অবস্থান তৈরি করে দিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এড.আনিসুর রহমান দিপু উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একই সাথে মেয়র আইভীর সমর্থন তো সবসময় গাজী পেয়েই আসছিলেন। 

 

মন্ত্রী গাজীর মতো সরব হয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আড়াইহাজারের এমপি নজরুল ইসলাম বাবু। নির্বাচনের আগে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ইকবাল পারভেজ তাকে বেশ ভুগিয়েছেন। আর এতে মূল রসদ যোগানো হয়েছে জেলা শহর থেকেই। এটি উপলদ্ধি করতে পেরে নজরুল ইসলাম বাবু জেলা শহরের রাজনীতিতেও নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে চাচ্ছেন। আড়াইহাজার ছাত্রলীগ, যুবলীগ থেকে শুরু করে জেলা ও মহানগরের ছাত্রলীগ, যুবলীগ কমিটি নিয়েও তিনি এখন মাথা ঘামাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তার ঘনিষ্টজনেরা। আলী আহাম্মদ চুনকার মেয়ে মেয়র আইভীর সাথেও টুকিটাকি ঝামেলা মিটিয়ে ঐক্যের ডাক দিয়ে জেলা শহরের রাজনীতিতে পাকাপোক্ত অবস্থান তৈরি করতে এমপি বাবু উঠেপড়ে লেগেছেন। 

 

সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রী গাজী ও এমপি বাবুর সরব উপস্থিতিতে নড়েচড়ে বসেছিলো জেলা আওয়ামী লীগ। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই চেয়েছিলেন তার নিজের ব্যক্তিগত সফর শেষে উপজেলাগুলোতে কাউন্সিল হোক। মন্ত্রী গাজী ও এমপি বাবু এবং মেয়র আইভীর কল্যাণে জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভার মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে উপজেলা সম্মেলনের তারিখ দিতে বাধ্য হন হাই। ১৬ জুলাই রূপগঞ্জে ও ১৯ জুলাই আড়াইহাজার থানা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। দুজনই মেয়র আইভীর নাসিকের বাজেট অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। নগরীর বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের প্রশংসা করে মেয়র আইভীকে বাহবা যুগিয়েছেন। একই সাথে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনকেও বাহবা দিয়েছেন। 

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা ও নাসিকের বাজেট অনুষ্ঠান ও সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতি পর্যালোচনা করে বোঝা যাচ্ছে মেয়র আইভী, এমপি শামীম ওসমান এবং আনোয়ার হোসেনের বাইরেও একটি শক্তিশালী আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের জোট গড়ে উঠছে। তাতে সম্পূর্ণভাবে লাভবান হবেন মেয়র আইভী ও আনোয়ার হোসেন। এই শক্তিশালী আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের জোটই আগামীতে পুরো জেলায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দেয়া থেকে শুরু করে নেতৃত্ব তৈরি, কর্তৃত্ব বৃদ্ধি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে মুখ্য ভূমিকা রাখবে।  

 

শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি শুক্কুর মাহমুদ জেলা শহরের রাজনীতিতে তেমন কোন ভূমিকা রাখতে পারছেননা। কিন্তু জাতীয় শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ  বিষয়ক সম্পাদক কাউসার আহমেদ পলাশ জেলা শহরের রাজনীতিতে নির্বাচনের আগে থেকেই সরব। যার দরুন মেয়র আইভী, মন্ত্রী গাজী, জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগেও তার একটি প্রভাব লক্ষণীয়।

 

মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এড.খোকন সাহা, যুগ্ম সম্পাদক শাহনিজাম, জেলা আওয়ামী লীগের  সেক্রেটার ভিপি বাদল, সাংগঠনিক সম্পাদক মীর সোহেলসহ অন্যান্যরা জেলা শহরের রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখছেন। এই সুযোগে মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক জিএম আরমান, সাংগঠনিক জিএম আরাফাত, মাহমুদা মালাসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ মন্ত্রী গাজী, মেয়র আইভী, আনোয়ার হোসেন, নজরুল ইসলাম বাবু, কাউসার আহমেদ পলাশ, আব্দুল্লাহ আল কায়সার হাসনাত, আনিসুর রহমান দিপু, জাহাঙ্গীর আলম, আরজু ভূইয়াসহ জেলা শহরেরর রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো ইতিমধ্যেই তৈরি করে ফেলেছেন। দিন যত গড়াবে তা আরো শক্তিশালী হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তবে পুরো দৃশ্যপটে একেবারেই ব্যাকফুটে শামীম ওসমান ও তার অনুসারী আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ।
 

এই বিভাগের আরো খবর