শুক্রবার   ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০   ফাল্গুন ৮ ১৪২৬   ২৬ জমাদিউস সানি ১৪৪১

নারায়ণগঞ্জে ‘সঞ্চয়পত্র’ বিক্রির হার কমছে

প্রকাশিত: ২২ জানুয়ারি ২০২০  

ইমতিয়াজ আহমেদ (যুগের চিন্তা ২৪) : কমেছে ব্যাংকের সুদের হার। গ্রাহকের কাঁধে চাপানো হয়েছে করের বোঝা। শুধু তাই নয় সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে বাধ্য করা হয়েছে ব্যাংক একাউন্ট এবং ইটিন। ফলে সারাদেশে কমতে শুরু করেছে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ। 

 

তবে নারায়ণগঞ্জে বিক্রির হার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অল্প কম। এমটাই জানিয়েছেন জেলা সঞ্চয় অফিস/ব্যুরো নারায়ণগঞ্জের সহাকারী পরিচালক মামুনুর রহমান মোল্লা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। বরং ডিজিটাল যুগের সুবিধা পাচ্ছেন সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকরা। এক ক্লিকেই ঘরে বসে মুনাফা পেয়ে যাচ্ছেন গ্রাহকরা। প্রতিদিন অন্তত ৭০ জন গ্রাহক মেয়াদান্তে মুনাফা পেয়ে যাচ্ছেন ঘরে বসেই। এ জন্য গ্রাহককে কষ্ট করে সঞ্চয়পত্র অফিসে আসতে হচ্ছেনা। গ্রাহকের ব্যাংক একাউন্টে মুনাফা চলে যাচ্ছে।

 

ডিজিটাল যুগের এই চমৎকার সুবিধা পেয়ে নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ গ্রাহক খুশি। তবে ব্যাংকের সুদের হার কমিয়ে দেয়ায় এবং ইটিন বাধ্যতামূলক করায় অনেক গ্রাহক ভয়ে সঞ্চয়পত্র কেনা কমিয়ে দিয়েছে। যার দরুণ সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কিছুটা কম। 

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাগেছে, নারায়ণগঞ্জ জেলা সঞ্চয় অফিসে ২০১৯ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির টার্গেট ছিল মোট ১৪৬ কোটি টাকা। ডিসেম্বর নাগাদ সঞ্চয় পত্র বিক্রি হয়েছে ৪১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ৬২২ জন। মূল পরিশোধ করা হয়েছে ৪৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। গ্রাহকদের মুনাফা প্রদান করা হয়েছে ২২ কোটি ১১ লাখ টাকা। শতকরা ৫ ভাগ উৎসে কর কর্তন করা হয়েছে ২ কোটি ১১ লাখ টাকা। 

 

সূত্রমতে, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিরক্ষা পরিবার সঞ্চয়পত্র বিক্রির টার্গেট ছিল ৭৪ কোটি টাকা। বিক্রি হয়েছে ১৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ৩ মাস অন্তর স্কিমের বিক্রির টার্গেট ছিল ৪৮ কোটি টাকা বিক্রি হয়েছে ১৭ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। ৫ বৎসর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র বিক্রির টার্গেট ছিল ১২ কোটি টাকা বিক্রি হয়েছে প্রায় ২ কোটি টাকা। পেনশনের সঞ্চয়পত্র বিক্রির টার্গেট ছিল ১২ কোটি টাকা বিক্রি হয়েছে ২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। 

 

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র মতে, গত কয়েক মাসে সারাদেশে সঞ্চয়পত্রের বিক্রির পরিমাণ তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথমে জুন মাসে নারায়ণগঞ্জ জেলা সঞ্চয় অফিসে ২০১৯ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির টার্গেট ছিল মোট ১২৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা  অর্জিত হয়েছে ১৮০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। বিনিয়োগকারীর টার্গেট ধরা হয়েছিল ১৫১ জন, সঞ্চয়পত্রে টাকা লগ্নি করেছেন ৩ হাজার ৫৮ জন বিনিয়োগকারী। মূল পরিশোধ করা হয়েছে ৮২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। গ্রাহকদেরকে মুনাফা প্রদান করা হয়েছে ৫৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। নীট বিনিয়োগ করা হয়েছে ৯৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। উৎসে কর কর্তণ করা হয়েছে ২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। 

 

সূত্রমতে, নারায়ণগঞ্জে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিরক্ষা পরিবার সঞ্চয়পত্র বিক্রির টার্গেট ছিল ৫৭ কোটি টাকা। বিক্রি হয়েছে ৯৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। ৩ মাস অন্তর স্কীমের বিক্রির টার্গেট ছিল ৩৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিক্রি হয়েছে ৬৭কোটি ৫১ লাখ টাকা। ৫ বৎসর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র বিক্রির টার্গেট ছিল ১৬ কোটি টাকা বিক্রি হয়েছে ১১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। পেনসনার সঞ্চয়পত্র বিক্রির টার্গেট ছিল ১২ কোটি ৪০ লাখ টাকা বিক্রি হয়েছে ৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। 

 

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, মূলত সঞ্চয়পত্রের কেনায় কড়াকড়ির কারণে এর বিক্রি কমে  গেছে। আর এখান থেকে বড় একটি অংশ ব্যাংকে আমানত হিসেবে টাকা রাখছেন। এ জন্য হঠাৎ ব্যাংকের আমানতের প্রবৃদ্ধিতে বড় উল্লম্ফন হয়েছে। 

 

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূলত চার কারণে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমছে। কারণগুলো হচ্ছে, এক. সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে কর সনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকা। দুই. ব্যাংক হিসাব খোলা। তিন. অনলাইনে আবেদন করা এবং চার. অর্থের উৎস সম্পর্কে বিবরণ দেওয়া। 

 

উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছরের প্রথম দিন ১ জুলাই  থেকে কেনার ক্ষেত্রে অনলাইন পদ্ধতি চালু হয়েছে। একইদিন থেকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে টিআইএন ও ব্যাংক হিসাব। এছাড়া একক ব্যক্তির ক্ষেত্রে ৬০ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে না পারা এবং ৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ হলেই উৎসে কর ১০ শতাংশ কেটে রাখার নিয়ম করার কারণেও বিনিয়োগকারীরা এখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। 

 

তবে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তা বলছেন, গত ১ জুলাই থেকে অনলাইনে সঞ্চয়পত্র কেনা ও নগদায়নের জন্য অর্থ বিভাগ যে ‘জাতীয় সঞ্চয় স্কিম অনলাইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ নামে একটি কর্মসূচি চালু করেছে, তারই ইতিবাচক ফল হচ্ছে এই বিক্রি কমে যাওয়া এবং এটাই তাঁরা চেয়েছিলেন।

 

সঞ্চয়পত্রের বিক্রিতে যখন এ করুণদশা তখন বাড়ছে ব্যাংকের আমানত।বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালের এপ্রিলে ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এরপর থেকে এ প্রবৃদ্ধি কমতে থাকে। অক্টোবরে এসে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ১৯ শতাংশ যা গত ৩০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। 

 

অন্যদিকে, ব্যাংক খাতে ২০১২-১৩ সালের দিকে যেমন তারল্যসংকট চলছিল, পাঁচ বছর পর আবার সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ জন্য সব ব্যাংকই এখন আমানতের ওপর সুদহার বাড়িয়েছে দিয়েছে। বেশির ভাগ ব্যাংক এখন আমানতে ১০ শতাংশের ওপরে লাভ দিচ্ছে। অনেকের আমানতের সুদহার ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

এই বিভাগের আরো খবর