সোমবার   ০৪ মার্চ ২০২৪   ফাল্গুন ২১ ১৪৩০

না.গঞ্জে গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন প্রায় বন্ধ!

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ২১ জানুয়ারি ২০২৪  

 


গ্যাসের অভাবে নারায়ণগঞ্জের ৬ শতাধিক গ্যাস নির্ভর শিল্পকারখানার উৎপাদন প্রায় বন্ধ। সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছে রফতানিমুখী পোশাকখাত। বাতিল হচ্ছে বিদেশি অর্ডার। শিল্প মালিকরা বলছেন, কোটি কোটি টাকা লোকসান দিয়ে প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। এ অবস্থায় পোশাক রফতানি খাতে অচল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

 


ফতুল্লার বিসিক শিল্প নগরীর রফতানিমুখী কয়েকটি ডাইং কারখানা ঘুরে দেখা যায়, বিদেশি বায়ারদের অর্ডার পূরণ করতে উৎপাদনের চাপে শ্রমিকরা যেখানে দম ফেলার সময় পেতেন না, গ্যাসের অভাবে মেশিন বন্ধ থাকায় এখন তারা অলস সময় কাটাচ্ছেন। নষ্ট হচ্ছে গুদামে মজুতকৃত কোটি কোটি টাকার কাপড়।

 


নারায়ণগঞ্জে গ্যাসনির্ভর অধিকাংশ শিল্প কারখানায় একই অবস্থা। গত দশ-বারোদিন ধরে নারায়ণগঞ্জের ডাইংসহ অন্য শিল্প কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। যে কারখানায় প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মেট্রিক টন উৎপাদন হতো, এখন সেখানে এক টনও উৎপাদন হচ্ছে না। কবে গ্যাস আসবে এনিয়ে নানা দুশ্চিন্তায় শ্রমিক কর্মচারীরা।

 


ক্রোনি গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ‘অবন্তি কালার’ কারখানার ব্যবস্থাপক আহসান হাবীব বলেন, ‘আমাদের দুইটি ফ্যাক্টরিতে বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত আছেন ১২ হাজার শ্রমিক। গ্যাসের প্রেসার মিনিমাম পাঁচ পিএসআই (চাপের একক) হলে আমাদের প্রোডাকশন স্মুথলি হয়। তবে গত দুই মাস ধরে আমরা পাচ্ছি এক থেকে দুই পিএসআই।

 

 

এর মধ্যে গত দশ-বারোদিন ধরে গ্যাসের প্রেসার শূন্য পিএসআই নেমে এসেছে। ফলে দিনে রাতে কোনোভাবেই মেশিন চলছে না। সব সেক্টরে প্রোডাকশন বন্ধ রয়েছে। আমাদের পুরো উৎপাদন কাজই বন্ধ রয়েছে। শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বসে অলস সময় কাটাচ্ছেন।’

 


তিনি বলেন, ‘আমাদের পুরো টেক্সটাইলে প্রতিদিন কমপক্ষে চল্লিশ টন প্রোডাকশন লস হচ্ছে। ফেব্রিক্স ডাইংয়ে প্রতিদিন বিশ টন, ইয়ার্ন ডাইংয়ে ডেইলি দশ টন, অল ওভার প্রিন্টিংয়ে ডেইলি দশ টন প্রোডাকশন ড্যামেজ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে ডেইলি কোটি টাকা লস হলে আমাদের মালিক বেতন দেবে কোথা থেকে? এই নিয়ে সবাই খুব হতাশায় রয়েছে।

 

 

বায়ারদের সঙ্গে আমাদের কাজ শিফট করতে পারছি না। শিপমেন্ট ডিলে হচ্ছে। কোনো কোনো বায়ারের শিপমেন্ট বাতিলও হয়েছে। আর ডাইং বন্ধ থাকায় বিরাট প্রভাব পড়েছে রফতানিমুখী পোশাকখাতে।

 

 

সময়মতো শিপমেন্ট দিতে না পারায় অনেক কারখানায় বিদেশি বায়ারদের অর্ডারও বাতিল হচ্ছে। পোশাক রফতানিকারক শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকদের অভিযোগ, সরকার গ্যাসের দাম তিন গুণ বাড়ালেও শর্ত অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দিতে পারছে না।’

 


ক্রোনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এইচ আসলাম সানি বলেন, ‘আমার দুইটা ফ্যাক্টরি টোটালি বন্ধ। একটা ফ্যাক্টরিতে কয়েক গুণ খরচ দিয়ে তেল ও এলএনজি কিনে এনে চালাচ্ছি। আরেকটা ফ্যাক্টরি চালাতে পারছি না।

 

 

আমাদের কথা হলো ভেরি নরমাল। সরকার যখন এলএনজির দাম, গ্যাসের দাম তিনগুণ বৃদ্ধি করলো, তখন একটা কমিটমেন্ট ছিল আমাদের নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দেবে। আমরা ব্যবসায়ীরা বলেছিলাম দাম দিতে রাজি আছি, কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দিতে হবে। আজকে দাম বৃদ্ধির পরেও আমরা গ্যাস পাচ্ছি না।’

 


তিনি বলেন, ‘আমাদের ফ্যাক্টরিগুলো রুগ্ন হয়ে যাচ্ছে। বায়ারদের সঙ্গে কমিটমেন্টগুলো রাখতে পারছি না। আমাদের শিপমেন্টের মারাত্মকভাবে ক্ষতি হচ্ছে। এখন আমরা টোয়েন্টি ফাইভ পার্সেন্টও ফ্যাক্টরি চালাতে পারছি না।

 

 

শিপমেন্টের বাকি মালগুলো ক্যানসেল হচ্ছে। ব্যাংকের পেমেন্ট দিতে পারব না। এয়ার শিপমেন্ট হচ্ছে না। যে পরিমাণ অর্থ লোকসান আমরা করছি, আমরা সাত বছরেও এ ক্ষতি পোষাতে পারব না।’

 


এই শিল্প মালিক আরও বলেন, ‘আমরা মারাত্মকভাবে লসের সম্মুখীন হচ্ছি। শ্রমিকদের কাজ নাই। মাস শেষে তাদের বেতন দিতে হবে। গ্যাস না পেয়েও আমাকে গ্যাস বিল দিতে হবে। বাতাসের গ্যাস বিলও দিতে হবে।

 

 

থ্রি হান্ড্রেড পার্সেন্ট বৃদ্ধি রেটে বিল দিতে হবে। এটা অমানবিক। এ ব্যাপারে আমরা সরকারকে বার বার বলছি। বিকেএমইএ কথা বলছে। কেউ শুনছে না বা আমাদের প্রবেলেমটা কারও দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। ওভার অল এই লস বেয়ার করার ক্ষমতা আমাদের নাই। এ পরিস্থিতিতে ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নাই।’

 


জেলা কলকারখানা অধিদফতর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে গ্যাসনির্ভর ছয় শতাধিক শিল্প কারখানার মধ্যে চার শতাধিক ডাইং কারখানা, অর্ধশতাধিক রি-রোলিং ও স্টিল মিল, ৩৫টি চুন কারখানা, ৮টি সিমেন্ট কারখানা এবং ১০টি অটো সল্ট মিল রয়েছে।

এই বিভাগের আরো খবর