বুধবার   ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪   ফাল্গুন ৮ ১৪৩০

দ্বারপ্রান্তে বইমেলা-২০২৩

করীম রেজা

প্রকাশিত: ২৮ জানুয়ারি ২০২৩  


মাত্র আর কয়েকদিন পরেই ১লা ফেব্রুয়ারি । করোনাভাইরাস পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় এই বছর ২০২৩ সনের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিনেই অমর একুশে বইমেলা শুরু হতে যাচ্ছে। এবারের বইমেলার প্রতিপাদ্য-‘পড় বই গড় দেশ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’।

 

 

আগামী ১ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৩টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সশরীরে উপস্থিত থেকে মেলা উদ্বোধন করবেন বলে পত্রিকার খবরে জানা গেছে।  উদ্বোধনের পরই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে মাসব্যাপী লেখক, প্রকাশক ও পুস্তক ব্যবসায়ীদের আকাঙ্খিত অমর একুশে গ্রন্থমেলা।

 

 

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে বিগত দুই বৎসর মেলার আয়োজন বিলম্বিত হয়েছে। তাছাড়া আশানুরূপ সাড়া মেলেনি সংশ্লিষ্ট কোনও পক্ষ থেকেই। প্রধানমন্ত্রীও সশরীওে না এসে ভার্চুয়ালি অনলাইনে মেলা উদ্বোধন করেন। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এ উপলক্ষে চলছে ব্যস্ত সময়।

 

 

ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ প্রস্ততির কাজ শেষ হয়েছে। একাডেমি সূত্র আশা প্রকাশ করে যে, নির্ধারিত সময়ের আগে সব কাজ সম্পন্ন হবে। বাংলা ভাষার অস্তিত্ব রক্ষা ও বিকাশে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর বাংলা একাডেমির মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার দরকার অনুভূত হয়।

 

 

তৎকালীন পাকিস্তানের যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এসে ১৯৫৫ সালে  বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করে। প্রতিষ্ঠার দুই বছর পর এই প্রতিষ্ঠান স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা পায়।

 

 

এবার মেলা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মুহম্মদ নূরুল হুদার নেতৃত্বে ৩১ সদস্যের কমিটি গঠিত হয়েছে কাজের সুবিধার্থে। বাংলা একাডেমির পরিচালক (প্রশাসন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও পরিকল্পনা বিভাগ) কে এম মুজাহিদুল ইসলাম সদস্য-সচিব হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন।

 

 

এছাড়া সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, গবেষক মফিদুল হকসহ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এবং বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিরা রয়েছেন পরিচালনা কমিটির সদস্যপদে।

 

 

গত সোমবার বইমেলার প্রস্তুতি কাজের অগ্রগতি সরেজমিনে দেখতে বাংলা একাডেমিতে গিয়েছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ ও সচিব আবুল মনসুর। বইমেলার আমন্ত্রণপত্রে আয়োজক হিসেবে শুধু বাংলা একাডেমির লোগো কেন, সে প্রশ্ন করেন সচিব আবুল মনসুর।

 

 

বাংলা একাডেমি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি প্রতিষ্ঠান, তাই সেখানে মন্ত্রণালয়ের লোগো নেই কেন, এই প্রসঙ্গ তুলে তিনি উষ্মা প্রকাশ করেন বলে উপস্থিত বাংলা একাডেমির কর্মকর্তারা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমকে জানান। জানা যায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন, “বাংলা একাডেমির কর্মকর্তারা তাকে (সচিব) বলেছিলেন, মেলার আয়োজক বাংলা একাডেমি এবং মন্ত্রণালয় এই আয়োজনে সহযোগিতা করছে।

 

 

তখন সচিব ক্ষেপে গিয়ে বাংলা একাডেমির কর্মকর্তাদের ধমক দেন এবং নতুন করে আমন্ত্রণপত্র ছাপাতে বলেন।” বাংলা একাডেমির কোনো কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তারা বলছেন, ইতোমধ্যে সব আমন্ত্রণপত্র ও ব্যানার ছাপা হয়ে গেছে।

 

 

কিন্তু সচিবের মৌখিক নির্দেশের কারণে এখন সমস্ত আমন্ত্রণপত্র ও ব্যানার বাতিল করতে হবে এবং নতুন করে তা ছাপতে হবে; যদিও মেলা শুরু হতে আর কয়েকদিন মাত্র বাকি। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় লেখক কুলদা রায় ফেইসবুকে লিখেছেন, “হুমকির মুখে একুশে বইমেলা। বইমেলাটি ছিনতাই করে নিতে চাইছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।

 

 

বাংলা একাডেমি বিধিবদ্ধ একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এখানে মন্ত্রণালয়ের কোনো খবরদারি বা হস্তক্ষেপ অতীতে হয়নি। এরশাদ সরকারও একাডেমির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কখনও হস্তক্ষেপ করেনি। কিন্তু এখন হচ্ছে।

 

 

“কার্যত এই ধরনের হস্তক্ষেপ সচিব বা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় করতে পারে না বিধি মোতাবেক। শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলা একাডেমি আইন পাস হয়। এই আইন অনুযায়ী এই ধরণের হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণ অবৈধ।”

 

 

এই প্রসঙ্গে সচিব আবুল মনসুর বলেন, “বাংলা একাডেমির বাজেট কোথা থেকে আসে? টাকা তো মন্ত্রণালয় থেকেই যায়। তাহলে মন্ত্রণালয়ের নাম দিতে এত সমস্যা কেন?

 

 

“এলোকেশন অব বিজনেস’ অনুযায়ী বাংলা একাডেমি আইনের রক্ষক তো মন্ত্রণালয়। তাহলে মন্ত্রণালয়ের সংস্থা বা দপ্তরের কার্যক্রম তো মন্ত্রণালয়ের অধীনেই।”

 

 

‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৩’ এর নীতিমালায় উল্লেখ আছে, “বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে উদযাপনের অংশ হিসেবে ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৩’ অনুষ্ঠিত হবে এবং বাংলা একাডেমির নির্বাহী পরিষদ কর্তৃক গঠিত ‘অমর একুশে বইমেলা পরিচালনা কমিটি ২০২৩’ বইমেলা পরিচালনা করবে(বিডিনিউজ২৪ডটকম)।

 

 

স্মরণ করা যেতে পাওে যে, ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমির প্রধান ফটকের পাশে চট বিছিয়ে বই বিক্রি শুরু করেছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা। পরে তার সঙ্গে আরও অনেকে যুক্ত হন ১৯৭৭ সালে, ফলে বই বিক্রি অনেকটাই মেলার আকার পেতে শুরু করে।

 

 

১৯৭৮ সালে ড. আশরাফ সিদ্দিকী, তৎকালীন মহাপরিচালক বাংলা একাডেমিকে বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। পরবর্তী বছর বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি মেলার সঙ্গে যুক্ত হলে পর্যায়ক্রমে গ্রন্থমেলা আজকের একুশের বইমেলার রূপ এবং আকার পায়।

 

 

এই পরিস্থিতিতে বইমেলার আয়োজক হিসেবে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম যুক্ত হচ্ছে কি না- জানতে চাইলে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গত মঙ্গলবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, কোনো পরিবর্তন আসছে না।

 

 

“সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় তো আয়োজকই, মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় তো বইমেলা হয়। আগে যেভাবে ছিল, সেভাবেই সবকিছু হবে। বাংলা একাডেমিই সব দায়িত্ব পালন করবে। নতুন করে কিছু হচ্ছে না।”

 

 

এবার বইমেলায় কিছু আঙ্গিকগত পরিবর্তন হয়েছে উল্লেখ করে সদস্যসচিব বলেন,  মেলার পুরো বিন্যাসই পরিবর্তন করা হয়েছে। মেলায় মূল মঞ্চ থাকবে বাংলা একাডেমি অংশে। আর গ্রন্থ উন্মোচন ও লেখক বলছি মঞ্চ থাকবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অংশে। বেশি স্টল ও প্যাভেলিয়ন থাকছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে।

 

 

অন্যদিকে মেট্রারেলের কারণে বিগত সময়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনিস্টিটিউট সংলগ্ন যে ১৮২টি স্টল ও ১১টা প্যাভেলিয়ন ছিল তা এবার সরিয়ে এনে সোহরাওয়ার্দীর মূল কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছে। আর সেই স্থান ফুডকোর্ট সহ নানা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মেলার প্রধান প্রবেশ পথ পরিবর্তন করা হয়েছে।

 

 

আগেকার সেই প্রবেশ  ফটক এবার প্রস্থানের  জন্য রাখা হয়েছে। মূল প্রবেশদ্বার রাখা হয়েছে বাংলা একাডেমির উল্টো দিকে। মন্দিরের প্রবেশদ্বার দিয়ে আগতরা  মেলায় প্রবেশ করবে। এবার মেলায় আগতদের জন্য নির্দিষ্ট স্টল খুঁজে পেতে ডিজিটাল বোর্ডসহ প্ল্যাকার্ড এর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

 

 

সেখানে ম্যাপ থাকবে এবং বিভিন্ন বইয়ের প্রচ্ছদ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হবে। ইতোমধ্যে অমর একুশে বইমেলা সংক্রান্ত নীতিমালা একাডেমির ওয়েবসাইটেও দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

 

 

এবারের মেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মোট ৪৭০ টি প্রতিষ্ঠানের স্টল থাকছে। এরমধে ৩৬৭ টি সাধারণ প্রতিষ্ঠান, শিশু চত্ত্বর ৬৯ টি প্রতিষ্ঠান এবং প্যাভেলিয়ন আছে ৩৪ টি। অন্যদিকে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে সাধারণ প্রতিষ্ঠান ১০৩ টি ও প্যাভেলিয়ন আছে ১৪৭ টি।

 

 

সবমিলিয়ে ৫৭৩ টি প্রতিষ্ঠান এবং সর্বমোট ৭০৪ টি (প্যাভেলিয়ন বাদে) স্টল থাকছে। এছাড়া ফুডকোর্ট, নামাজের জায়গা, ওয়াশরুম পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে।  নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে  বইমেলার চারপাশে সিসি টিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। নিয়োজিত থাকবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বস্তরের নিরাপত্তা বুহ্য।

 

 

মূল গেট দিয়ে ঢুকেই শিশু চত্বর পাওয়া যাবে। সেখানে সিসিমপুরসহ শিশুদের আনন্দ ও বিনোদনের জন্য নানা আয়োজন থাকবে। মাসব্যাপী  অমর একুশে বইমেলা বিকাল ৩টা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত চলবে।  রাত ৯টায় মেলা প্রাঙ্গনের আলো নিভিয়ে দেওয়া হবে।

 

 

উল্লেখ্য, সংক্রমণের বিধিনিষেধের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতাকে গুরুত্ব দিয়ে ২০২১ সালে মেলা শুরু হয় মার্চে। আর পরের বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি বইমেলা শুরু হয়। ২০২০ সালে একদিন পিছিয়ে মেলা শুরু হয়েছিল। প্রতিবছর ১ ফেব্রুয়ারি বইমেলা শুরু হলেও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে ভোট থাকায় তা একদিন পিছিয়ে শুরু হয়েছিল।

 

 

এবারের বইমেলার শেষে ২০২২  সালে প্রকাশিত বিষয় ও গুণগত মানসম্মত সর্বাধিক সংখ্যক গ্রন্থের মধ্য থেকে দেয়া হবে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’। এছাড়া প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে শৈল্পিক বিচারে সেরা গ্রন্থের জন্য দেয়া হবে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’।

 

 

প্রকাশিত শিশুতোষ গ্রন্থের গুণগতমান বিচার করে সর্বাধিক গ্রন্থের জন্য ‘রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার’ দেয়া হবে সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে। এর বাইরে ২০২৩ সালে অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্টলের নান্দনিক অঙ্গসজ্জার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ বিবেচিত প্রতিষ্ঠানকে ‘শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ দেয়া হবে।

 

 

গত বছর নির্ধারিত সময়ের পরে শুরু হয়েছিল বইমেলা। ওই বছর প্রায় সাড়ে ৫২ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে বাংলা একাডেমির বই বিক্রি হয়েছে ১ কোটি ২৭ লাখ টাকার। মোট বই প্রকাশ হয়েছে ৩ হাজার ৪১৬টি। মেলার শেষদিনেও ২১৫টি নতুন বই এসেছে। এর মধ্যে মানসম্পন্ন বই নির্বাচিত হয়েছে ৯০৯টি, যা পুরো বইয়ের২৬ শতাংশ।

 

 

প্রকাশকরা সরকারি প্রণোদনা দাবি করে আসছেন। আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি যাতে স্টল ভাড়া কমিয়ে দেয়, সে দাবিও তোলা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অনেকেই। এমনকি কাগজের দাম কমানোসহ বেশ কয়েকটি দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছে প্রকাশকদের সংগঠন সৃজনশীল প্রকাশক ঐক্য।

 

 

বেশ কিছু প্রকাশক, লেখক পূর্বাহ্নেই বই না প্রকাশ করার সিদ্ধান্তও ঘোষণা করেছেন।  সব মিলিয়ে এবার কাগজের দুর্মূল্যের বাজারে বইমেলা কতটুকু আশানুরূপ হবে তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। এন.এইচ/জেসি