বৃহস্পতিবার   ০৯ এপ্রিল ২০২০   চৈত্র ২৬ ১৪২৬   ১৫ শা'বান ১৪৪১

ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তদান, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন স্বার্থক হবে কবে?

প্রকাশিত: ৪ জানুয়ারি ২০২০  

জীবনকে এক এক জন, এক এক ভাবে দেখেন। এটাই সত্য। মানুষের মুখ দেখে তার দুঃখ বোঝা যায় না। ছোটবেলায় একটি গান শুনেছিলাম, গানের সে কলিগুলো তেমন মনে নেই। যেটুকু মনে পরে “মুখ দেখে ভুল করো না, মুখ তো নয় মনের আয়না। তবে হ্যাঁ, মা কিন্তু তার নাড়ীর টুকরো সন্তানের মুখ দেখে সন্তানের দুঃখ বুঝতে পারেন। দুঃখির দুঃখ বুঝার মন-মানসিকতা আজ তেমন চোখে পরে না। 

 

তবে দাতা মোহাম্মদ মহসীন, পন্ডিত ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, জমিদার সতীশ সাহা, রাণী ভবানী, রাণী রাসমনি, দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার মতো লোক এখনও যে এ সমাজে নেই তা নয়। যে সমাজে গুণীর আদর নেই, সে সমাজে বা সেদেশে গুণী জন্মায় না। সভ্য দেশের সভ্য মানুষ শিল্প সাহিত্যকে মর্যাদা দেয়। সভ্য দেশের সরকারের কাছেও এর মূল্য অপরিসীম। 

 

যেদেশে শিল্প সাহিত্যের কদর নেই, সেদেশ সভ্য হতে পারে না। শিল্প সাহিত্যের কদর থাকলে শিল্পী-সাহিত্যিককে শ্রদ্ধা করার সংস্কৃতি গড়ে উঠে। হাজার বছরের শিল্প সাহিত্যের ঐতিহ্যে গড়া বাংলাদেশে। সেই সংস্কৃতি কি অদৌ আছে? আমরা আমাদের হীনমন্যতায় আপন হাতে সেই ঐতিহ্যকে কবর দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের শত্রুরা আমাদের হাতে বিষ তুলে দিচ্ছে। চরিত্র হনন করছে মাদকের নেশায়। সন্তান তার মাকে খুন করছে। পিতা তার সন্তানকে আপন হাতে জবাই করছে।সমাজে পুরুষ নারীকে সম্মান দিতে জানে না। সে সমাজের পুরুষরাও নারীর কাছ থেকে সম্মান আশা করতে পারে না। মানুষ মানীকেই মান দিয়ে থাকেন। সরকার অতীত ঐতিহ্যময় স্মৃতিগুলো ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সত্য কিন্তু কোথায় যেন কোন অপদেবতা-শয়তানের ছায়া বিস্তার করে যাচ্ছে।

 

অনেকেই বলেন, “ভাল কাজে শয়তান বাদী” আমরা সবসময় শয়তানের হাত থেকে রক্ষার জন্য দু’হাত তুলে মোনাজাত করি। শয়তান থেকে দূরে থাকার জন্য আমরা আমাদের প্রজন্মকে বারবার অনুরোধ ও উপদেশ দিয়ে যাচ্ছি।বঙ্গবন্ধু এ দেশের ছাত্রদের মাঝে সোনার দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

 

সৌভাগ্যক্রমে আমি প্রায় দীর্ঘ চল্লিশ বছর একই উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি। এখানে কথা হচ্ছে, ঢাকা জেলার ধনাঢ্য এলাকার দরিদ্র শ্রেণির ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠা। ধনাঢ্য পরিবারের ছাত্র-ছাত্রী শহরের সুনামখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করছে। তবে এই দরিদ্র শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের অনেকেই আজ স্ব-স্ব স্থানে যথা যোগ্যতা সহ কাজ করে যাচ্ছেন।


১৯৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়ের ছাত্র ব্যারিস্টার, প্রফেসরসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি পদে চাকরী করছেন। চাকরী করা বড় কথা নয়। জ্ঞান পিপাসার তৃপ্তি মিটানো। আর এই জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীন দেশে যাওয়াও ফরজ। কষ্টের মধ্যে জ্ঞান অর্জন আরও ফরজ। যারা এই ধর্নাঢ্য দরিদ্র জন গোষ্ঠীর জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।তারা আজ অনেকেই পরপারে চলে গেছেন। 

 

প্রতি বছর ৪ঠা জানুয়ারির সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয়। শুনেছি এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ক্ষেতের ইটা ভেঙ্গে, পুকুরের কচুরী পরিষ্কার, এমন কি গৃহস্থের মুষ্ঠি চাউলের অর্থ দিয়ে শিক্ষকদের বেতন দেয়া হতো। ছনের চাল মুলি, বাঁশের বেড়া। আজ বহুতল ভবন নির্মাণ হয়েছে ছাত্র সংখ্যাও প্রায় দেড় হাজার। এক কথা ঢাকার কেরাণীগঞ্জ উপজেলার পুরানো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দ্বিতীয়।

 

আমি গ্রামের ছেলে, তাই গ্রামের সাধারণ মানুষের দুঃখের সাথে ছোটকাল থেকেই পরিচয় ছিল। দুর্ভাগ্যই বলেন, আর সৌভাগ্যই বলেন, আমার গ্রামের বাড়ি থেকে একশত কিলোমিটার দূরে আমি পারজোয়ার ব্রাহ্মণগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকুরী গ্রহণ করি। এতক্ষণ সেই সুনাম ধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কথাই বলছিলাম। এখানে শিক্ষকতা করতে এসে এখানকার সহজ-সরল কষ্টের মানুষগুলোর হৃদয়কে আমি হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছি।

 

এখানে শিক্ষকতা করতে এসে মা-বাবাকে হারিয়েছি। তাদের মৃত্যুকালে তাদের সামনে থাকার সৌভাগ্য হয়নি। তাই সন্তানতুল্য ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে আমি আমার মৃত মা-বাবাকে খুঁজেছি। ছাত্র-ছাত্রীদের শাসন করেছি, আবার আদরও করেছি। আমি ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের বাণীকে সামনে রেখে দুষ্ট ছাত্র-ছাত্রীদের গোপনে ডেকে নিয়ে শাসন করে তাদের অন্তরের মানুষটাকে জাগানোর চেষ্টা করেছি। 

 

আমার শিক্ষক কবি মোজাফফর আলী তালুকদার বলতেন, শিক্ষককে কখনও, কখনও মায়ের, কখনও পিতার ও কখনও বন্ধুর ভূমিকা পালন করতে হয়। একজন ভাল শিক্ষক ভাল ছাত্রও বটে। আদর্শ শিক্ষকের কথা ছাত্র-ছাত্রীরা পিতা-মাতার কথার চেয়ে মূল্য দিয়ে থাকে বেশি। সাপের গাছান্তের ন্যায় মন্ত্রপুত কাজ। কথায় আছে, “শাসন করা তারি সাজে সোহাগ করে যে” আমি এ কথাকে গুরু বাক্য বলে মনে করি। আমার ছাত্রজীবনে মহাদেব তালুকদার, মজিবর রহমান, মোজাফফর আলী তালুকদার, আব্দুল মোতালেব, মতিলাল সাহা, প্রাণ গোপাল দত্ত এবং গৃহ শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ সেন, রমেন্দ্র মজুমদার এদের কাছ থেকে আমি এ শিক্ষাই পেয়েছি। 

 

নিম্নবৃত্ত ও নিম্ন মধ্যবৃত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীই বেশি। উচ্চবৃত্ত ও মধ্যবৃত্ত পরিবারের সন্তানদেরকে পরবর্তী ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ শহরের স্কুল সমূহে ভর্তি করা হতো। ক্লাসে সেই সব নিম্নবৃত্ত পরিবারের ছাত্র-ছাত্রীদের আর্থিক কষ্টের কারণে কেউ প্রয়োজনীয় পোশাক-পাতি, খাতা, কলম এমনকি সময় মতো মাসিক বেতন পর্যন্ত দিতে হিমশিম খেতো।এসব দেখে আমি আমার মন থেকে আমার ছাত্র-ছাত্রীদেরকে ডেকে প্রস্তাব রাখি তোমরা তোমাদের একদিনের টিফিন খরচের টাকা আমাকে দিবে। সমাজে যাদের সামর্থ্য রয়েছে তারা সমাজের দরিদ্র লোকগুলোকে সাহায্য করা উচিত। তোমরা বন্ধু ফান্ডে টাকা জমাবে। হাঁস-মুরগী-কবুতর পালন করে লেখাপড়া করতে উৎসাহিত করতাম। 

 

আমি দেখতাম অনেক শিক্ষিত মায়েরা তাদের সন্তানদের হাত দিয়ে দান করতো। বিষয়টি প্রথম প্রথম বুঝতাম না। হিন্দু শাস্ত্রে দান করা পূণ্য কাজ। দান করলে মন পবিত্র হয়। পাপ বিমোচন হয়। প্রথম ভাগে পড়েছি, “দিন দেখিয়া দান করিও”। ইসলাম ধর্মে যাকাত প্রথার বিধান রয়েছে। ধনীর সম্পদে দরিদ্রের হক রয়েছে। নবী করিম হযরত আবু বকর’কে তাঁর সমস্ত সম্পদ দান করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ইসলাম ধর্মে সুক্ষভাবে সমাজতন্ত্রের বীজ বপন করা হয়েছে। 

 

আমার বলার পর ক্লাস ক্যাপটেন, ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে একদিনের টিফিনের পয়সা সংগ্রহ করে আমাকে দিতো। আমি মাস শেষে নিজের প্রাপ্ত বেতনের কিঞ্চিত অংশ সংগ্রহকৃত অর্থের সাথে যোগ করে অতি গোপনে ক্লাসের সবচেয়ে গরীব ছাত্র-ছাত্রীকে তার পোশাক, খাতাপত্র কেনার জন্য দিয়ে দিতাম। ক্লাসে কোন ছাত্র-ছাত্রীকে দেওয়া হলো, তা অন্য ছাত্র-ছাত্রীরা জানতো না। কাউকে কেউ যেন ছোট না জানে। এজন্যই এই গোপনীয়তা অবলম্বন করা হতো।

 

১৯৮৮ সালে বন্যার সময়ও বন্যার্তদের ছাত্র-ছাত্রীরা সাহায্য করেছে। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে মানবিকগুণ প্রস্ফুটিত হোক এ আমাদের প্রার্থনা। আজ শিক্ষকতা জীবন থেকে অবসর নিয়ে অনেক স্মৃতিই মনে পরছে। তবে দুঃখ হয় যখন শুনি দেশের সর্ব উচ্চ বিদ্যাপীঠে ছাত্ররা-ছাত্ররা রাজনীতির নামে মারামারি করছে। দুঃখ পাই তখন যখন শুনি ছাত্র কর্তৃক শিক্ষক লাঞ্চিত হচ্ছে। জ্ঞানীরা বলেন, “বিদ্যা বিনয় দান করে।” “বিদার্থী বিনয়ী, ছাত্র সমাজকে সর্বত্র দেখবো কবে? রাজনীতি কি এমনই এক স্বার্থলোভী হাতিয়ার? রাজার নীতির সাথে তার কোন মিল থাকবে না। হবে সর্বগ্রাসী লোভাতুর এক রাক্ষস?

 

বর্তমান সরকার শিক্ষার প্রসার ঘটানোর লক্ষ্যে বিনামূল্যে বই বিতরণ করছে। ১ জানুয়ারি বই উৎসবের মাধ্যমে ৪ কোটি ২৬ লাখ ১৯ হাজার ৮৬৫ জন শিক্ষার্থীর মাঝে ৩৫ কোটি ৩১ লক্ষ ৪৪ হাজার ৫৫৪টি নতুন বই বিতরণ করা হয়। এদেশের সাধারণ মানুষ বিনামূল্যে বই পাবে তা কল্পনাও করেনি কোনদিন। মেধাবীদের মাঝে উপবৃত্তি প্রদান করছে। বিদ্যালয় সমূহ উন্নয়নে আধুনিক তার আলোকে সাজাচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রের দুর্নীতি দূর করে সত্যিকারের শিক্ষার বীজ বপন করা সময়ের দাবি। 

 

যে শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে। যে শিক্ষা জীবন গড়ার পথকে প্রশস্থ করে শিক্ষা শুধু সার্টিফিকেট মধ্যে থাকবেনা, মাঠে-ময়দানে হাতে কলমে জীবন জীবিকায় শিক্ষা হবে মায়ের মতো। প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে জাগ্রত হবে সত্যিকারের শ্রদ্ধাবোধ ও দেশপ্রেম। এই শ্রদ্ধাবোধ আর দেশপ্রেম জাগ্রত হলেই ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ স্বার্থক এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।

 

রণজিৎ মোদক
লেখক-শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবং সভাপতি, ফতুল্লা রিপোর্টার্স ক্লাব, নারায়ণগঞ্জ
মুঠোফোন : ০১৭১১ ৯৭৪ ৩৭২
 

এই বিভাগের আরো খবর