বুধবার   ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪   ফাল্গুন ৮ ১৪৩০

ডামি প্রার্থী কারা হচ্ছেন

রাকিবুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২৭ নভেম্বর ২০২৩  

 

# বিনা ভোটে নির্বাচিত হলে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

 

 

আসন্ন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনীতির মাঠে নির্বাচনী হাওয়া বইছে। নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার পর থেকেই আওয়ামী লীগ মনোনয়ন বিক্রি শেষে গতকাল তিনশ আসনে দুইশ’ আটানব্বই জনের নাম প্রকাশ করেছে। কিন্তু নাম প্রকাশ না করা আসনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন রয়েছে। এখানে পরে ঘোষনা করা হবে। বিএনপি বরাবরই বলে আসছে তারা এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিবে না। তাছাড়া বিএনপি সপ্তম দফায় অবরোধ কর্মসূচি দিয়ে একদফা আন্দোলনের সাথে ত্বত্তাবধায়ক সরকারের দাবীতে অনড় রয়েছে।

 

এদিকে আওয়ামী লীগ গণভবনে গতকাল দলীয় প্রার্থীদের নাম ঘোষনা করেছে। তার মাঝে নারায়ণগঞ্জের ৪টি আসনের নাম প্রকাশ হলেও ১টি আসন বাদ রাখা হয়। জেলার ৪ টি আসনে নৌকা পাওয়া ব্যক্তিরা হলেন, নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে নৌকার প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়েছে নজরুল ইসলাম বাবু, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে দশ বছর পর নৌকার প্রার্থী হলেন আব্দুল্লাহ আল কায়সার হাসনাত, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে টানা তৃতীয় বারের মত নৌকা পেয়েছে শামীম ওসমান।

 

কিন্তু এবারের নির্বাচনে সবেচেয়ে চমকের বিষয় হলো কোন আসনে যেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কেউ নির্বাচিত না হতে পারে এজন্য প্রতিটি আসনে আওয়ামী লীগের ডামি প্রার্থী থাকার ঘোষনা দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই হিসেবে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারবে। তাই আওয়ামী লীগের যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হবে তারা আলোচনায় থাকবে। এছাড়া এখানে স্বতন্ত্রপ্রার্থীরা জয়ী হলে তাদের গ্রহনযোগ্যতা বাড়বে। কেননা নৌকার প্রার্থী এবং আওয়ামী লীগের ডামি প্রার্থী একই দলের হবে। এজন্য রাজনৈতিক অঙ্গনে বলা বলি হচ্ছে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ।

 

অপরদিকে নৌকা মনোনয়ন প্রত্যাশী হওয়া সত্বেও যারা নৌকা পায় নাই তারা ডামি প্রার্থী হিসেবে স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। তাই এজন্য নির্বাচনে বিএনপি না আসলেও আওয়ামী লীগ গলার কাটা আওয়ামী লীগ হতে যাচ্ছে। কেননা যারা স্বতন্ত্রপ্রার্থী হবে ভোটের মাঠে তাদেরও অনেকের ভাগ্য খুলতে পারে।

 

প্রতিটি আসনেই দলের একাধিক প্রার্থী থাকবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যদি কারো মনোনয়ন বাতিল হয় সেক্ষেত্রে বিকল্পজন প্রার্থী হবেন। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কেউ পাস করে আসতে পারবেন না। প্রত্যেক প্রার্থীকেই একজন করে দলীয় ডামি প্রার্থী রাখতে হবে। দলে যার যে অবদান ও ত্যাগ আছে পর্যায়ক্রমে সেসবের মূল্যায়ন হবে বলে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের আশ্বস্ত করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে ২৯৮টি আসনে দলের মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

 

জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে যাদের নাম ঘোষনা হয় নাই তাদের নিয়ে এবার আলোচনা হচ্ছে। এখানে কারা প্রার্থী হতে পারে তা দুএকদিনের মাঝে পরিষ্কার হতে যাচ্ছে। তাছাড়া অনেক ডামি প্রার্থীও ভোটের লড়াইয়ে বর্তমান সংসদ সদস্যকে পরাজিত করতে পারে এমন গুঞ্জনও উঠেছে। কেননা ভোট দিবে জনগণ। যাদের জনপ্রিয়তার তলানীতে রয়েছে তারা হতাশ হয়ে রয়েছে। তাই আওয়ামী লীগের নিজেরাই এবার বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় কাউকে জয়ী হতে দিবে না। নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারে মনোনয়ন প্রত্যাশী হয়ে যাদের নাম ঘোষনা হয় নাই তারা হলেন,

 

নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে রূপগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান শাহজাহান ভূঁইয়া, নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুল হাই। তারা দুজনেই আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট নেতা। নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনে রয়েছেন, সাবেক রাষ্ট্রদূত বীর মুক্তিযোদ্ধা মমতাজ হোসেন, আড়াইহাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি শাহজালাল মিয়া, কৃষকলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা ড. হাবিবুর রহমান মোল্লা, যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক তথ্য বিষয়ক সম্পাদক এড. ইকবাল পারভেজ ও আড়াইহাজার উপজেলা চেয়ারম্যান হেলো সরকার।

 

নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) রয়েছেন, নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়াামী লীগের সাবেক সদস্য, সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এড. হোসনে আরা বেগম বাবলি, সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এড. সামসুল ইসলাম ভূঁইয়া, উপজেলা আওয়াামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান কমিটির সদস্য মাহফুজুর রহমান কালাম, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও গবেষণা উপ কমিটির সদস্য এ এইচ এম মাসুদ দুলাল, উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ডা. আবু জাফর চৌধুরী বীরু, উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মারুফুল ইসলাম ঝলক, উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মনির হোসেন, আওয়ামী লীগের সমর্থক আনোয়ার হোসেন ও হাজী আব্দুল মতিন খান, সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত মোবারক হোসেনের ছেলে এরফান হোসেন দীপ, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজ কল্যান উপ-কমিটির সদস্য দীপক কুমার বনিক দীপু, কাঁচপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ও তার সহোদর সোনারগাঁ উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান মো. বাবুল ওমর বাবু।

 

নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে আছেন জাতীয় শ্রমিক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কাউসার আহম্মেদ পলাশ। প্রতিটি আসনেই ডামি প্রার্থী হওয়ার জায়গায় হেভিওয়েট নেতা থাকায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে তারা সুবিধা জনক অবস্থায় নেই। তাদের মাঝেও এক প্রকার হতাশ রয়ে গেছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের বিপক্ষে আওয়ামী লীগের প্রার্থী থাকায় অন্য দলের প্রার্থীরা তার সুযোগ কাজে লাগিয়ে জয়ী হওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবেন। তারাও আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের ছেড়ে দিবে না। কেননা ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরাও মনোনয়ন সংগ্রহ করেছে।

 

রাজনৈতিক বোদ্ধমহল বলছে, আওয়ামী লীগ নির্বাচনকে সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য ভাবে করার জন্য যে উদ্যোগ নিয়েছে তারই প্রতিফলন হিসেবে ইতোমধ্যে নিজেদের দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে প্রার্থী রাখার নির্দেশনা দিয়েছে। এছাড়া অন্যান্য দলের প্রার্থীদেরও সহযোগিতা করার কথা বলেছে। তবে নৌকার বিপক্ষে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হচ্ছে স্বতন্ত্রপ্রার্থী। তাই তাদের দলের মাঝে এখন একাধিক প্রার্থী নিয়ে ব্যাপক আালোচনা হচ্ছে। তাই সচেতন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাই কি তাহলে ভোটার উপস্থিতি বাড়াবে। স্বতন্ত্রপ্রার্থীদের সমর্থকদের মাধ্যমে ভোট গ্রহন বশে করা। তাছাড়া সবচেয়ে বড় বিষয় হলো এবারের নির্বাচনে বিনা ভোটে কেউ জয়ী হবে সেই রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে।

 

প্রসঙ্গত, দ্বাদশ নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করার তাগিদ দিয়ে সরকার প্রধান ও আওয়ামীলীগ সভনেত্রী বলেছেন, “বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কেউ পাশ করে আসতে পারবেন না। অন্য দলের প্রার্থী না থাকলে প্রত্যেক প্রার্থীকেই একজন করে দলীয় ডামি প্রার্থী রাখতে হবে।”

 

প্রসঙ্গত, সরকার পতনের এক দফা দাবি ও একতরফা তফসিল বাতিলের দাবিতে বিএনপি সমমনা দলগুলোকে নিয়ে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনে রয়েছে। একই সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে ঘটছে নানা নাটকীয়তা। আলোচনায় আসছে ছোট ছোট নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত দলগুলো।

 

ভোটে যাওয়া নিয়ে দ্বিধায় থাকা জাতীয় পার্টি নির্বাচনের মাঠে পুরো শক্তি নিয়ে সক্রিয় থাকার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা ৩ দলের জোট “যুক্তফ্রন্ট”আন্দোলনে “না পেরে” নির্বাচনী মাঠের মোকাবিলার কথা বলেছে। তৃণমূল বিএনপিও বেশ তোড়জোর করছে। এছাড়া নিবন্ধিত ইসলামিক দলের মধ্যে ৭টি দল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

 

এখন ইসিতে নিবন্ধিত দল রয়েছে ৪৪টি। এরমধ্যে বিএনপিসহ ১৮টি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। তারা তাদের দাবিতে আন্দোলন করে যাবে বলে জানিয়েছে। এছাড়া নিবন্ধন হারানো জামায়াতে ইসলামী, কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া নুরুল হক নূরের গণঅধিকার পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে জানিয়েছে। সব মিলিয়ে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে কতটি দল অংশ নেয় সেটি জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। ওইদিন মনোনয়ন জমা দেওয়ার নির্ধারিত শেষ সময়।

 

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩৯টি দল অংশ নিয়েছিল; ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর হওয়া এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৪৮.০৪% ভোট পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। এই নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ভোট পায় ৩২.৫০% আর জাতীয় পার্টি পায় ৭.০৪% ভোট।

 

দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় ১২টি দল। বিএনপি ও সমমনাদের বর্জনের মধ্যে এই নির্বাচনে ৭২.১৪% ভোট পেয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। আর সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির পক্ষে ৭% ভোটার রায় দেন।

 

একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় ৩৯টি দল। এই নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে ভোট পড়ে ৭৬.৮০%, ধানের শীষে ১৩.৫১% আর লাঙ্গলে ৫.৩৭% ভোট পড়ে। পরে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। আর সংসদে প্রধান বিরোধী দল হয় জাতীয় পার্টি।

 

গত ১৫ নভেম্বর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইসির তথ্য অনুযায়ী, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামী বছরের ৭ জানুয়ারি। ওই দিন সকাল ৮টা থেকে টানা ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ৩০ নভেম্বর।

 

মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ১ থেকে ৪ ডিসেম্বর। প্রার্থীতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১৭ ডিসেম্বর। প্রতীক বরাদ্দ ১৮ ডিসেম্বর। সেদিন থেকেই প্রচারণা শুরু করতে পারবেন প্রার্থীরা। এস.এ/জেসি

এই বিভাগের আরো খবর