বুধবার   ২৩ অক্টোবর ২০১৯   কার্তিক ৮ ১৪২৬   ২৩ সফর ১৪৪১

জামাল উদ্দিন মৃধার পরিবারের দাবি পুরো ঘটনা পুলিশের সাজানো নাটক

প্রকাশিত: ৪ অক্টোবর ২০১৯  

যুগের চিন্তা রিপোর্ট : রূপগঞ্জের তারাবো পৌরসভার রসুলপুর এলাকার একটি বাড়িতে মঙ্গলবার দিবাগত রাত ২ টার দিকে অভিযান চালিয়ে নগদ ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ও দুই হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ‘মাস্টার মশার কয়েল’ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামাল হোসেন মৃধার ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত।

 

বৃহস্পতিবার (৩ অক্টোবর) বিকেলে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল মোহসীনের আদালত এ আদেশ দেন। এরআগে মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে জামাল মৃধার সংযোগ রয়েছে জানিয়ে তার ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে রূপগঞ্জ থানা পুলিশ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কোর্ট পুলিশের ইন্সপেক্টর আব্দুল হাই।

 

তবে জামাল হোসেনের মৃধার পরিবারের দাবি, পুরো ঘটনাটি পুলিশের সাজানো নাটক। জামাল মৃধা একজন পরহেজগার এবং ভালো লোক হিসেবে তার এলাকায় পরিচিত।

 

জামাল মৃধার বড় ভাই লাভলু মৃধা বলেন, আমার ভাই মাস্টার মশার কয়েল প্রতিষ্ঠান করে সারাদেশে নাম ডাক করেছে। সারাদেশেই তার ডিলার রয়েছে। কোটি টাকার ব্যবসা হয়। এছাড়া তার গরুর ফার্ম আছে। এবার কোরবানিতেও কোটি টাকার গরু বিক্রি করেছে। অথচ পুলিশ বলে সে মাদকের ব্যবসা করে।

 

তিনি আরও বলেন, তাকে ফাঁসিয়েছে। অভিযানের সময় তারা বাড়ির সিসি ক্যামেরা এবং এর রেকর্ড ডিভাইজ ভেঙে নিয়ে এসেছে। আইনজীবী বলছেন সেগুলো জব্দ দেখায় নাই। পুলিশ বাড়িতে গিয়ে কী অভিযান চালিয়েছে তা ওই ভিডিও দেখলেই বের হয়ে যাবে। তাই তারা সেগুলো সরিয়ে নিয়েছে। কারও প্ররোচনায় পুলিশ এই অভিযান চালিয়ে আমার ভাইকে ফাঁসিয়েছে।

 

জামাল মৃধার স্ত্রী  সোনালী বেগম দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে ঘুরছেন আদালত পাড়ায়। তিনি বলেন, আমরা স্বামী দক্ষিণ রূপসী নান্নু কাজীর মসজিদে তাবলীগে ৩ দিনের জন্য গিয়েছিলো। সেখান থেকে আসার পরদিনই হঠাৎ রাতে পুলিশ যায়। আমার স্বামীকে পুরো এলাকায় ভালো লোক হিসেবেই জানে।

 

তার কয়েল ব্যবসা এবং গরুর ফার্ম সম্পর্কে পুুরো গ্রাম জানে। ৬ বছর হয় আমরা রূপগঞ্জে এই বাড়ি করেছি। পুলিশ অভিযানের নাটক করে আমার স্বামীকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসিয়েছে।

 

জামাল মৃধার ভাতিজা সোহেল বলেন, চাচা মাদকের বিরুদ্ধে সবসময় সরব ছিলেন এলাকায়।ওখানে বরাব কবরস্থান রোডে নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদেও তিনি। মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় ওখানকার মাদকব্যবসায়ীরা তার উপর ক্ষুদ্ধ ছিলো।

 

তাছাড়া আলোচিত প্রিয়াংকা হত্যা মামলার আসামিদের বিচারের দাবিতেও তিনি মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছে। এতে ক্ষুদ্ধ হয়ে এই ষড়যন্ত্র হয়ে থাকতে পারে। চাচার বাড়ির পাশেই পুলিশ হেডকোয়ার্টারের উপপরিদর্শক মোস্তফা পাশার বাড়ি। তার সাথে চাচার সুসম্পর্ক ছিলো সবসময়। আচমকা এভাবে চাচাকে গ্রেপ্তারের পেছনে এ তিনটি ঘটনা ছাড়া আর কোন কিছুই আমরা মাথায় আনছিনা। সম্পূর্র্ণ পরিকল্পিতভাবে তাদের ফাঁসানো হয়েছে। 

 

ছেলের গ্রেপ্তারের খবর শুনে বরিশালের উজিরপুর ধাসুরা গ্রাম থেকে এসেছেন জামালের মা ৭৫বছর বয়সী বৃদ্ধা জাহানারা বেগম। তিনি বলেন, আমার ৯ ছেলে মেয়ের মধ্যে জামাল তৃতীয়। আমাদের পুরো পরিবার অত্যন্ত পরহেজগার। আমার ছেলে একটা সিগারেট পর্যন্ত খাননা। সেখানে তাকে মাদক ব্যবসায়ী বানানো হয়েছে। ছেলেকে পুলিশ ধরে নিয়ে এসেছে শুনে বাড়ি থেকে চলে এসেছি। আমি ন্যায় বিচার চাই।

 

আসামীপক্ষের আইনজীবী এড.জসিম উদ্দিন বলেন, মামলার এজহারে অভিযান পরিচালনার সময় উল্লেখ করা হয়েছে ২ অক্টোবর দিবাগত রাত ২ টা ৫মিনিটে। অথচ জব্দ তালিকার একটি সময় ২টা ১৫ মিনিটে। আরেকটিতে ওইদিন রাত ৩ টা ১০ মিনিটে। এটি একটি প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়। 

 

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আদালতের বৈধ নিয়ম হচ্ছে ২৪ ঘন্টার মধ্যে আসামিকে আদালতে হাজির করা। কিন্তু ওই সময় পেরিয়ে কয়েকঘন্টা পরে আসামিদের আদালতে হাজির করা হলেও তড়িঘড়ি করে আবার মামলার নথি ও আসামিকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আদালতে আনা হয়।

 

কোন মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবীর ওকালতনামা দাখিলের পর স্বাভাবিক নিয়ম হচ্ছে শুনানির জন্য মামলা সংশ্লিষ্ট নথি, এজহার, ফরওয়ার্ডিং, জব্দ তালিকা আসামীপক্ষের আইনজীবীদের দেখতে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে চরম গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়েছে। আমরা আসামীপক্ষের আইনজীবীরা এটিকে অস্বাভাবিক ও প্রশ্নবোধক বলে মনে করি। এই মামলায় সবকিছুতেই লুকোচুরি লুকোচুরি ভাব।

 

আসামীপক্ষের মূল আইনজীবী এড.আনিসুর রহমান দিপু বলেন, সারাদেশে দুর্নীতি ও মাদকবিরোধী অভিযান চলছে। আমরা এবং সাধারণ মানুষ দুর্নীতি ও মাদকবিরোধী অভিযানকে স্বাগত জানাই। কিন্তু প্রত্যেকটি ভালো কাজ কিংবা উদ্যোগ কিছু অতিউৎসাহী মানুষ, কর্মকর্তার জন্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। এই মামলাটি তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ।

 

আসামীপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, পুলিশ মাদক বিক্রির যে টাকা জব্দ করেছে বলছে তা মূলত তার জমি বিক্রি ও গরু বিক্রির টাকা। এ সংক্রান্ত কিছু দলিলদস্তাবেজ ও প্রমাণাদি তারা আদালতে দাখিল করেছেন। শুনানির সময় আসামি পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে এড.আল মামুন ভূঁইয়া, এড.রাজীব, এড.সাখাওয়াত হোসেন জুনিয়র, এড.কানিজ ফাতেমা, এড.ওয়ালিউল্লাহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। 

 

প্রসঙ্গত,  রূপগঞ্জের ‘মাস্টার মশার কয়েল’ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামাল হোসেন মৃধার অভিযান চালিয়ে নগদ ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ও ২ হাজার পিছ ইয়াবাসহ মঙ্গলবার দিবাগত রাতে তিনজনকে আটক করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আটককৃতরা হল- বাড়ি মালিক ও কয়েল ব্যবসায়ী  জামাল হোসেন মৃধা (৪০), তার বড় ভাই মোস্তফা  কামাল ও মানিক মিয়া।

 

জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) উপ-পরিদর্শক মিজান জানান, জামাল ও মোস্তফা অবৈধ কয়েল কারখানা ও গরুর খামারের আড়ালে ইয়াবার ব্যবসা করে আসছিলেন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ জানতে পারে এক লাখ পিছ ইয়াবা ট্যাবলেটের একটি চালান স্থানীয় কয়েল ব্যবসায়ী জামাল হোসেন মৃধার বাড়িতে প্রবেশ করবে। এরপর থেকেই গোয়েন্দা পুলিশ মঙ্গলবার বিকেল থেকে ওই এলাকায় নজরদারি শুরু করে।

 

মধ্য রাতে জামাল হোসেন মৃধার চার তলা বাড়ির তৃতীয় তলার ফ্লাটে তল্লাশি চালায়। এসময় একটি ট্রাংক থেকে নগদ এক কোটি টাকা এবং আলমারির ভেতর থেকে আরও পঁচিশ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। একই সাথে বাড়িটির নিচ তলায় জামাল হোসেনের ব্যক্তিগত অফিস থেকে দুই হাজার পিছ ইয়াবা উদ্ধার হয়। খবর পেয়ে জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ ভোর রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। 

 

জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ জানান, গ্রেফতারকৃত ব্যবসায়ী জামাল হোসেন মৃধা নিজেকে তিনটি কয়েল কারখানার মলিক দাবি করলেও এর কোন বৈধ লাইসেন্স দেখাতে পানেনি। জব্দকৃত টাকার বৈধ কোনো উৎসও দেখাতে পারেননি তিনি।এই টাকাগুলো হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করার জন্য রাখা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া কয়েল ব্যবসার আড়ালে তিনি দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা করে আসছে বলেও সন্দেহ রয়েছে। তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

 

পুলিশ সুপার আরও জানান, আটকৃতদের বিরুদ্ধে বিদেশে টাকা পাচারের অভিযোগে মানি লন্ডারিং আইনে, ইয়াবা ব্যবসার অভিযোগে মাদকদব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে এবং আবাসিক এলাকায় কয়েল কারখানা নির্মাণ করে পরিবেশ দূষণের অপরাধে পরিবেশ আইনে মোট তিনটি মামলা দায়ের করা হবে।

 

পাশাপাশি জামাল হোসেন বাড়িতে এতো টাকা কি কারণে রেখেছেন, ইয়াবা ব্যবসা করে কতো টাকার মালিক হয়েছেন এবং তিনি কোন জঙ্গী সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত আছেন কিনা সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ। 

এই বিভাগের আরো খবর