রোববার   ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ২৪ ১৪২৬   ১০ রবিউস সানি ১৪৪১

কোরআন শরীফ আনতে আবারো ভবনের ভেতরে ঢুকেছিলো নিখোঁজ ওয়াজিদ

প্রকাশিত: ৪ নভেম্বর ২০১৯  

স্টাফ রিপোর্টার (যুগের চিন্তা ২৪) : ১২ বছরের ছোট্ট ছেলে ইফতেকার আহমেদ ওয়াজিদ। বাবা আব্দুল রুবেল ও মা কাকলী বেগমের প্রথম সন্তান। প্রাইমারি স্কুলের গন্ডি পাড় হয়ে সবেমাত্র ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। ছোট বেলা থেকেই আরবি শেখায় তার প্রবল আগ্রহ। মায়ের নির্দেশনা অনুয়ায়ী সে তার খালা রুনার ঘরে আরবি শিক্ষক সোনিয়ার কাছে পড়তেন। প্রতিদিন বিকাল ৪টা থেকে ৫ টা পর্যন্ত আরবি শিখেন। প্রতিদিনের মতোই পড়ার জন্য মা কাকলী বেগম পৌঁনে ৪ টায় তাকে আরবি পড়তে পাঠায়। কিন্তু এখনো ফিরেনি ওয়াজিদ। ২৪ ঘন্টা পরেও এক বুক আশা নিয়ে ছেলের ফেরার অপেক্ষায় কাকলী বেগম। কখন তার ছেলে তার বুকে ফিরবে।

 

রোববার (৩ নভেম্বর) নারায়ণগঞ্জ শহরের ১নং বাবুরাইল এলাকাতে খালের উপর নির্মিত এইচএম ম্যানশন নামের ভবনটি ধ্বসে পড়ে। এই ৪ তলা ভবনের নীচের তলায় আরবি পড়তে গিয়েছিলেন ইফতেকার আহমেদ ওয়াজিদ, তার খালাতো ভাই সোয়াইর ও সমবয়সী স্বপনা। হটাৎ করেই বাহির থেকে জোরে জোরে ডাক আসল ওয়াজিদ, সোয়াইর তোরা কই বাইরে আয়, জলদি আয়। ভিতরের সবাই বের হতে নেয়। দরজার কাছাকাছি গিয়ে আবার ফিরে আসে নিজের কোরআন শরীফের টানে আবার ঘরের ভিতরে যায়। এর মধ্যেই ধ্বসে পড়ে ভবনটি।

 

ঘরের ভিতরে সবাই যখন পানির দিকে যেতে থাকে স্বপনা খাটের পায়া ধরে রাখে। সোয়াইরের উপর ভাড়ি জিনিস পড়ায় সে উঠতে পারে না, আর ওয়াজিদ গড়িয়ে বারান্দার দিকে যেতে থাকে। ওয়াজিদ স্বপনার হাত ধরলেও বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারে নি। সে বারান্দার দিকে গড়িয়ে চলে যায়। ঘরের বারান্দার অংশটি খালের পানিতে ডুবে যায়। এরপর ফায়ার সার্ভিস এসে উদ্ধার কাজ চালিয়ে সোয়ারের লাশ উদ্ধার করে। এবং বাড়ির ভিতরের অন্য ৪জন কে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে। কিন্তু এখনো পাওয়া যায়নি ইফতেকার আহমেদ ওয়াজিদকে।

 

ওয়াজিদ তার খালা রুনা বেগমের ঘরেই আরবি পড়তো। ভবনটি ধসে পড়ার পূর্বে তিনি বাড়ির বাহিরে ছিলেন। ভবনের পিলার কিছুটা মাটি থেকে সড়ে পড়ছে লক্ষ করেই তিনি হৈচৈ শুরু করেন। বার বার নিজের দুই বোনের দুই ছেলের নাম ধরে ডাকছিলেন, ওয়াজিদ, সোয়াইর তোরা কই বাইরে আয়, জলদি আয়। তাদের না আসতে দেখে নিজেই ভবনের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকেন। কিন্তু ফটক দিয়ে ঢুকতেই ভবনটি ধ্বসে পড়েন। পরবর্তীতে তাকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার করেন।   

 

এদিকে ওয়াজিদের মা আহাজারিতে বলেতে থাকেন, আমার ছেলেরে নিয়ে কথ স্বপ্ন দেখছি। কখন আসবি তুই ওয়াজিদ। আমার ছেলেরে কেউ নিয়া আসো। আরবি পড়তে পাঠাইছিলাম। আমার ছেলে কোরআন শরীফ খতম দিবো। আমার ছেলে তো আর আসে না। আমি ওরে ছাড়া বাঁচুম কেমনে? আমার তো এই একটাই মানিক। মানিক আমার কোরআন শরীফ রাইখা আসতে চায় নাই। ও মানিক তুই কই? এই মাসের ১৬ তারিখে জন্মদিন আমার মানিকের। আমারে কয়েকদিন যাবৎ বার বার বলতাছিল, ‘ওমা ওমা আমার কিন্তু জন্মদিন আইসা পড়ছে’। সবাই গিয়ে আমার মানিকরে একটু আইনা দেও না!

 

অন্যদিকে ধ্বসে পড়া ভবনটির সামনে নিরুপায় হয়ে দাড়িয়ে আছেন ওয়াজিদের বাবা আব্দুল রুবেল। চাড়িদিকে হাক-ডাক, হৈ চৈ। টলমলে দুটি চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছেন ধ্বসে পড়া ভবনটির দিকে। কিছুক্ষনের জন্য বাসায় যাচ্ছেন, আবার ভবনটির সামনে ফিরে আসছেন ছেলের টানে। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্র্মীরা কাজ করছেন। কিন্তু ১ দিন পার হবার পরেও ছেলেকে উদ্ধার করতে পারেনি বিধায় নিরাশায় অপেক্ষা করছেন ছেলের জন্য। তিনি প্রতিবেদককে বলেন, আমার শুধু আমার ছেলেকে চাই। যেকোন ভাবে আমার ছেলেটারে ফিরায়া আইনা দেন। আর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যদি না পারে বের করতে আমার এলাকাবাসী আর আমার আত্বীয়দের চেষ্টা করতে দেওয়া হোক। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা খুঁজতাছে। পাইতাছি না তো। যেকোন মূল্যেই আমার সন্তানরে খুঁজে দেন। 
 

এই বিভাগের আরো খবর