সোমবার   ০৪ মার্চ ২০২৪   ফাল্গুন ২১ ১৪৩০

কোটি টাকায় চলে ‘গরীবের বউ’

ফরিদ আহম্মেদ বাধন

প্রকাশিত: ১৮ জানুয়ারি ২০২৪  

 

একদিকে পুলিশ। আরেক দিকে নামধারী শ্রমিক নেতা। সব দিক মিলিয়ে এই শহরে ‘গরীবের বউ’ হিসেবে বেঁচে আছে মিশুকও তার চালকরা। গ্রাম্য ভাষায় একটি প্রবাদ আছে ‘গরীবের বউ সবার ভাবী’। এই প্রবাদ বাক্য কোন অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে তা বুঝতে কারো বাকি থাকার কথা নয়। ব্যাটারী চালিত মিশুককে সরকার বৈধতা দেয়নি। তবে এই মিশুকের উপর ভর করে লাখ লাখ মানুষ বেকারত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছে।

 

আর এই বেকারত্বের অভিশাপ থেকে বাঁচতে মানুষ যখন মিশুক চালানোকে সম্বল হিসেবে বেছে নিয়েছে তখনই এই মিশুককে পুঁজি করে বিভিন্ন জেলায় গড়ে উঠেছে শ্রমিক কল্যাণের নামে বেশ কিছু ‘চাঁদাবাজ সংগঠন’। আবার এই মিশুককে প্রতিদিন পুলিশ আটক করে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। নারায়ণগঞ্জ শহর এর ব্যতিক্রম নয়। পুুলিশ ধরে অবৈধ মিশুক। আবার টাকার বিনিময়ে হয়ে যায় বৈধ।

 

অপরদিকে সিটি কর্পোরেশন থেকেও মিশুক ধরা হয়। ৩ হাজার টাকায় সেই মিশুক সিটি কর্পোরেশন আবার ছেড়ে দেয়া হয়। পুলিশ ও শ্রমিক নেতাদের মাঝ থেকে এক শ্রেনীর দালালের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে আবার পাওয়া যায় ‘টোকেন’। শুধু মাত্র মিশুককে পুঁজি করে এই শহরে পুলিশ, দালাল ও শ্রমিক ফান্ডের নামে কোটি কোটি টাকার উপরে বানিজ্য হয় বলে বিশ্বস্ত বেশ কয়েকটি সূত্র নিশ্চিত করেছেন।

 

ব্যাটারী চালিত মিশুক সরকার নিষিদ্ধ। অথচ এই মিশুকের পার্টস আসে সরকারকে ট্যাক্স দিয়েই। তারপরেও এই মিশুক অবৈধ। সরকারের বৈধতা না থাকায় মিশুক প্রশাসন থেকে শুরু করে প্রতিটি ঘাটে ঘাটে উৎকোচ দিয়ে আসছে। মিশুকের উপর নির্ভর করে লাখ লাখ শ্রমিক জীবিকা নির্বাহ করছে। অথচ বৈধতা না পাওয়ায় এই মিশুকের মালিক শ্রমিককে প্রতিদিন পদে পদে গুনতে হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। যা মাস শেষে দাঁড়ায় দুই কোটি টাকারও উপরে।

 

তথ্যমতে, প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে কলেজ রোডে শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে মিশুক আটক করে ডাম্পিং করা হয়। প্রতিটি মিশুককে ১ হাজার ৫’শ করে টাকা রেকার বিলের নামে গুনতে হয়। জেলা ট্রাফিক পুলিশকে প্রতিদিন টার্গেট মতো ১৫০টি মিশুক আটক করতে হয়। হিসেব মতে দৈনিক যার অংক দাড়ায় ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। যার মাসিক অংক দাাঁড়ায় ৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

 

ট্রাফিক পুলিশের ঝামেলা এড়াতে অনেকে বিকল্প পথ খোঁজেন। সেই ব্যবস্থাও রেখেছেন জেলা ট্রাফিক পুলিশের বেশ কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা। বেশ কিছু দালালের হাতে তুলে দিয়েছেন ২ হাজারের মতো স্টিকার। একেকটি স্টিকার সারা মাসের জন্য ১ হাজার ৫’শ টাকা করে নিয়ে থাকেন দালালরা। প্রতিমাসে ট্রাফিক পুলিশের নামে এই খাত থেকে তোলা হয় ৩০ লাখ টাকা। স্টিকার বা কার্ড যে মিশুকে থাকবে সেই মিশুক শহরে ট্রাফিক পুলিশের হাতে আটক হতে হয় না।

 

রেকার বিলের নামে যে টাকা উত্তোলন করা হয় সেই টাকার কতোটুকু সরকারী কোষাগারে গিয়ে জমা পড়ে তা ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরাও বলতে পারবে না। শহরের বিভিন্ন গলি থেকে মিশুক আটকের জন্য বেশ কিছু টোকাই বা কর্মী রয়েছে। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর তাদেরকে দৈনিক হাজিরা ভিত্তিক টাকা প্রদান করে ট্রাফিক পুলিশ।

 

অপরদিকে রয়েছে শ্রমিক কল্যাণ ফান্ডের নামে এক শ্রেনীর শ্রমিক নেতা মিশুকের প্লেট বিক্রি করে যাচ্ছেন বছরের পর বছর। প্রতিমাসে প্লেট বাবদ মিশুকের চালক বা মালিক পক্ষকে গুনতে হয় ৩’শশত টাকা। মাসিক ৩’শ টাকা হারে ফতুল্লা, সদর ও সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ হাজার মিশুক থেকে আদায় করা হয় মাসে ৬০ লাখ টাকা। এছাড়াও সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক যদি কোনো মিশুক আটক করা হয় তাহলে রশিদের মাধ্যমে প্রতিটি মিশুক বাবদ ৩ হাজার টাকা গুনতে হয় মালিক-শ্রমিককে। তবে সিটি কর্পোরেশন মাঝে মাঝে এ অভিযান পরিচালনা করে থাকে। 

 

এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার রিক্সা ও ভ্যানচালক শ্রমিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক বলেন, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা রিক্সা-ভ্যান চালক শ্রমিক ইউনিয়নের (রেজি নং-৩৭৩২) পক্ষ থেকে যে প্লেট বরাদ্দ তা নিজেদের সদস্যদের জন্য। এই সদস্যরা নিজেদের বিপদ আপদে একে অন্যের জন্য যাতে বিভিন্ন সহযোগীতা করতে পারে সেজন্য এই সংগঠন করা হয়েছে। এটি কোনো চাঁদাবাজ সংগঠন নয়।

 

এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ জেলা ট্রাফিক পুলিশের টিআই (এডমিন) করিম বলেন, প্রতিদিন মিশুক ধরার কোনো টার্গেট নেই। শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মিশুক আটক করা হয়। রেকার বিল যা হয় তা সরকারী কোষাগারে জমা করা হয়। কোনো স্টিকার বিক্রির সাথে ট্রাফিক পুলিশ জড়িত নেই। কোন মিশুকে স্টিকার আছে কোনটাতে নেই তা হিসেব করে মিশুক ধরা বা আটক করা হয় না। শহরে কিছু টাউট বাটপার আছে তারা স্টিকার বাণিজ্যের সাথে জড়িত। এস.এ/জেসি

এই বিভাগের আরো খবর