বুধবার   ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪   ফাল্গুন ৮ ১৪৩০

কী রেখে যাচ্ছেন শামীম ওসমান 

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২১ জানুয়ারি ২০২৪  

 

১৯২০’র দশকে কুমিল্লা থেকে নারায়ণগঞ্জে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন খান সাহেব ওসমান আলী। শুধু রাজনীতিই নয় তৎকালীন সময়ে নারায়ণগঞ্জে সামাজিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এই নামটি সর্ব মহলে পরিচিত ছিলো। ছেলে একেএম শামসুজ্জোহা বাবা ওসমান আলীর মতোই নারায়ণগঞ্জে রাজনীতির অঙ্গনে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিলেন। আবুল খায়ের শামসুজ্জোহার তিন ছেলে নাসিম ওসমান, সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমান।

 

বলা যায়, ওসমান পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের পর বর্তমানে চতুর্থ প্রজন্মে রয়েছে নাসিম ওসমান পুত্র আজমেরী ওসমান ও শামীম ওসমান পুত্র অয়ন ওসমান। চতুর্থ প্রজন্মের মধ্যে আলোচনায় আজমেরী ওসমান ও অয়ন ওসমানের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে নানা চুলচেরা বিশ্লেষণ। শামীম ওসমান ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা পোড়া খাওয়া রাজনীতিবিদ বললে অতুক্তি হবে না। তবে ইতিমধ্যে শামীম ওসমান একাধিকবার ভবিষৎতে নির্বাচন করবেন না বলে ঘোষণাও দিয়েছেন।

 

তারপরেও তিনি পরপর দুটি নির্বাচন করেছেন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের বিভিন্ন শোডাউনে অয়ন ওসমানকে বাবা মায়ের সাথে গনসংযোগ করতেও দেখা গেছে। তবে অয়নের ভবিষৎ রাজনীতির পরিবেশে কতোটা পরিষ্কার তা এই মূুহুর্তে বলা দুষ্কর। কারণ হিসেবে অনেকেই দাবী করেছেন, শামীম ওসমানের রাজনীতির শুরু থেকে যারা ছিলেন তারাই রয়েছেন। নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন পুরোপুরি।

 

ফলে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে অয়ন ওসমানের জন্য যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রস্তুত করে রাখার কথা, তা এখনো প্রস্তুত হয়নি বলেও অনেকের অভিমত। এতো প্রভাব থাকার পরও এবার শতকরা ৩২% ভোট কাস্ট করেছেন শামীম ওসমান। ছাত্রলীগের কোনো পদে অয়ন ওসমান না থাকলেও জেলা ছাত্রলীগে তাঁর একটা প্রভাব রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

 

অপরদিকে অয়ন ওসমান এখনো রাজনীতির মাঠে জানান দিয়ে মাঠে নামেননি। আগামী দিনে শামীম ওসমান তাঁর উত্তরসূরীর জন্য কি রেখে যাচ্ছেন তা নিয়েও নানা মহলে চলছে নানা কথা।

 

খান সাহেব ওসমান আলী ছিলেন একজন প্রগতিশীল মানুষ। শুধু নারায়ণগঞ্জেই নয়, তিনি তার গ্রামের বাড়িতেও তৎকালীন সময়ে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজের রুচি ও মনমানুষিকতার জানান দিয়েছিলেন। তেমনি তিনি নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন সময় বেশ কিছু উদ্যোগও গ্রহণ করে সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছিলেন। ৩০’র দশকে নারায়ণগঞ্জ থেকে ‘সবুজ বাঙলা‘ নামের একটি পত্রিকাও প্রকাশনা করেছিলেন।

 

খান সাহেব ওসমান আলীর বংশধর আবুল খায়ের মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা, বাবা ওসমান আলীর পথ ধরেই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনসহ মহান মুক্তিযুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা রেখেছিলেন। তাঁর তিন ছেলের মধ্যে নাসিম ওসমান ছিলেন পুরোদস্তুর বাবা শামসুজ্জোহার মতোই রাজনীতির বরপুত্র। নারায়ণগঞ্জে তিনি সর্বদলের মধ্যে একজন রাজনীতিক ব্যক্তি হিসেবে ছিলেন সবার শ্রদ্ধারপাত্র। নাসিম ওসমানের পদাঙ্ক অনুসরন করেই শামীম ওসমান ছাত্ররাজনীতির সাথে নিজেকে জড়িয়ে ছিলেন।

 

নিজের বন্ধু বিশেষ করে ভিপি বাদল, বাবু চন্দনশীল, সারোয়ার, লালকে দিয়েই তিনি তার অবস্থান শক্ত করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করেছিলেন আলহাজ্ব গিয়াস উদ্দিন। তবে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করে শামীম ওমসমান আওয়ামীলীগের মনোনয়ন নিজের বগলদাবা করেছিলেন। তাঁর নিজস্ব বাহিনী বা বলয়ের বাইরেও কেউ কেউ বিতর্কিত কর্মকান্ড করে অনেক সময় তিনি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেন স্বয়ং শামীম ওসমান।

 

ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ নিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন। ফতুল্লা থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি হিসেবে রয়েছেন বয়সের ভারে ন্যুব্জ এম সাইফ উল্লাহ বাদল ও সাধারণ সম্পাদক হিসেব রয়েছেন এম শওকত আলী। বাকি কমিটিতে যারা রয়েছেন তারাও শামীম ওসমান বলয়ের। তবে দলে নেতৃত্বদানের বিষয়ে অনেকেই অজ্ঞ।

 

অপরদিকে, আওয়ামীলীগের অনেক একনিষ্ট কর্মী মনোকষ্টে দলীয় কার্যক্রম থেকে দূরে সরে আছেন। তবে ভোটের সময় শামীম ওসমান কৌশল অবলম্বন করে এলাকায় এলাকায় পুরাতন কর্মীদের মূল্যায়নের কথা বলে থাকেন। ভোট গেলে তাদের কথা শামীম ওসমানের মনে থাকে না বল্লেই চলে। এমন দাবি খোদ নেতাকর্মীদের। একই অবস্থা সিদ্ধিরগঞ্জেও। তবে সবকিছু মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জে শামীম ওসমানের বর্তমানে হুংকার রয়েছে ঠিকই, তবে সেই হুংকার আর আগের মতো নেই।

 

তার অনেক কথাই শুধু বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। তবে ভোটের মাঠে তেমন কর্মী নেই তাঁর। তার প্রমান শামীম ওমসমান দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে পেয়ে গেছেন। মাত্র ৩২% ভোট কাস্ট হয়েছে। এ নিয়ে শামীম ওসমানের মনে ক্ষোভও রয়েছে। ভোট পরবর্তী সময়ে তিনি নিজের মনোকষ্টের কথাও বলে যাচ্ছেন। কি কারনে তিনি ভোটের মাঠে তেমন একটা জুত করতে পারেননি তা নিয়েও তিনি আছেন মহাচিন্তায়। যদি শামীম ওসমানের প্রতিপক্ষ থাকতো তাহলে ভোটের মাঠে তাঁর অবস্থান কোথায় গিয়ে ঠেকতো এ নিয়েও হিসেব কষছেন অনেকে।

 

শামীম ওসমানের দুই সন্তানের মধ্যে পুত্র সন্তান অয়ন ওসমান। পিতার ভবিষৎ উত্তরসূরী হিসেবে তাঁকেই ধরা হয়। অয়নকে অনেকে জেলা ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রক হিসেবেই মনে করেন। তবে রাজনীতির মাঠে অয়ন এখনো পরিপক্কতা অর্জন করতে পারেনি। পিতার বলয় আগামী রাজনীতির মাঠে অয়নকে কতোটা সাপোর্ট দেবে তা নিয়েও যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে। যেখানে শামীম ওসমান নিজেই শেষ বয়সে এসে নিজের জনপ্রিয়তা নিয়ে শঙ্কিত, সেখানে অয়নের অবস্থান কতোটা শক্ত হবে তা অনেকে পরিষ্কার বলে মনে করে।

 

অপরদিকে রাজনীতিতে নামার আগেই অয়ন তাঁর স্ত্রীর বড় ভাই ভিকির কর্মকান্ড নিয়েও নানা সমালোচনার মধ্যে রয়েছে। ৯০’র দশকের মতো এখন আর রাজনীতির মাঠ নেই। মানুষ এখন জুজোকে ভয় পায় না। সময় পরিবর্তন হয়েছে। সেই সাথে পরিবর্তণ হয়েছে কৌশল। পরিবর্তন হয়েছে মানুষের মন মানুষিকতার। এরই মধ্যে শামীম ওসমান তার ছেলের জন্যে যে মাঠ রেখে যাচ্ছেন, তা অয়নের জন্যে কতোটা মানান সই হবে তা অনেকটাই পরিষ্কার। বর্তমানে শামীম ওসমানের আস্থাভাজন যারা রয়েছেন তারাই অয়নের নেতৃত্ব কতোটা মেনে নিবেন তা নিয়েও ভাবতে হবে শামীম ওসমানকেই।

 

এ ব্যাপারে ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জের নেতৃবৃন্দ নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদককে বলেন, শামীম ওসমান একজন বিচক্ষণ নেতা। এটা অস্বীকার করার মতো কিছু নেই। তবে ভবিষৎ রাজনীতিতে অয়ন পিতার স্থান কতোটা আগলে ধরে রাখতে পারবেন তা সময় বলে দেবে। ত্যাগী অনেক নেতারা অনেকেই হাইব্রিডের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে দলীয় কার্যক্রম থেকে দূরে সরে আছেন। যা দলের জন্য অশনি সংকেত। এখনো শামীম ওসমান মুষ্টিমেয় কিছু নেতাদের কথামতো কাজ করে থাকেন। থানা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে শামীম ওসমানের পাশে থাকে। তবে তার মনে কষ্টে আছে। ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জে একই অবস্থা বিরাজ করছে। এস.এ/জেসি

এই বিভাগের আরো খবর