শনিবার   ৩০ মে ২০২০   জ্যৈষ্ঠ ১৫ ১৪২৭   ০৭ শাওয়াল ১৪৪১

করোনার চ্যালেঞ্জে ঈদুল ফিতর 

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২২ মে ২০২০  

এক মাস সিয়াম সাধনার পর প্রতি বছরই ঈদুল ফিতর মুসলমানদের জন্য নিয়ে আসে আনন্দের বার্তা। এবার ঈদুল ফিতর এসেছে করোনা সংকটের মধ্যে। করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনেই সকলকে ঈদ উদযাপন করতে হবে। রোজার শেষের দিকে এসে ঈদ যতই এগিয়ে আসছে মানুষ ততই ছুটছে মার্কেট পানে। 

 

তবে ভয়ংকর করোনা ভাইরাসকে মোকাবেলা করে ঈদ উদযাপন করার চ্যালেঞ্জটি সামনে এসেই গেল বলে মনে করেন বোদ্ধামহল। তাদের মতে, মার্কেট খুলে দেয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই মানুষ বাইরে বের হতে থাকে। মার্কেট কর্তৃপক্ষ ক্রেতাদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ও স্যানটিাইজার স্প্রে করার ব্যবস্থা করেন। এর সাথে যুক্ত হয় ট্যানেল। এখন প্রতিটি মার্কেটের সামনেই নিরাপত্তা ট্যানেল বসানো হয়েছে। ক্রেতারা ট্যানেল দিয়ে মার্কেটে ঢুকছেন। 

 

এতকিছুর পরও স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মানা হচ্ছেনা। স্বাস্থ্যবিধি পায়ে দলে মানুষ পঙ্গপালের ন্যায় মার্কেটে যাচ্ছে। একজন আরেকজনের গাঁ ঘেঁষাঘেঁষি করে কেনাকাটা সারছেন। রাস্তায় প্রচন্ড ভিড়। রিক্সা, সিএনজি ও অটোরিক্সার যানজট। ফুটপাতে হকার বসে গেছে। ঈদের বেঁচাকেনা চলছে। হকাররা আরো বেপরোয়া। কোন নিরাপত্তাই  নেই ফুটপাতেই। আর নিরাপত্তা ব্যবস্থার জায়গাও নেই। প্রচন্ড ভিড়ে মানুষ হাঁটছে। কেনাকাটা করছে। এদের চারপাশে ঘুরছে অদৃশ্য ঘাতক করোনাভাইরাস। কে কার গাঁয়ে থাক্কা লেগে করোনা বহন করে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন, কার সাথে ধাক্কায় আরেকজন করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন-কেউ তা বলতে পারছেনা। 

 

মোট কথা ঈদ মার্কেটকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জের মানুষ স্বাভাবিক সময়ের ন্যায় যত্রতত্র বিচরণ করছেন। হ্যাঁ তারা শুধু মুখে মাস্ক পড়েই স্বাস্থ্যবিধি চর্চা করছেন। করোনার পরোয়া কেউ করছেন না। করোনাকে চ্যালেঞ্জ করেই যেন মানুষ ঈদ মার্কেট করছে। এত বেপরোয়া চলাচলের মাশুল এই নগরবাসীকেই দিতে হবে। ঈদের পরেই বোঝা যাবে করোনা পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে উপনীত হয়। 

 

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে করোনা-দুর্যোগ উত্তরণ কমিটির আহবায়ক রফিউর রাব্বি যুগের চিন্তাকে বলেন, ঈদের পরে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আগেই জানিয়েছিল মে মাসটা খুব স্পর্শকাতর। মে মাসে লকডাউন শিথিল করাটা ছিল সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত। জীবীকার জন্য জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে সরকার। আরো এক মাস লকডাউন কঠোরভাবে বজায় থাকলে হয়তো মানুষের কষ্ট হত। আর্থিকভাবে কষ্ট হত। কিন্তু ঝুঁকিটা কম হতো। গার্মেন্টস ও মার্কেট খুলে দিয়ে জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়া হল। এর দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে। জুন মাস নাগাদ বোঝা যাবে পরিস্থিতি কতটা ভয়ংকর। সবকিছু খুলে দেয়ায় বেপরোয়া মানুষ করোনাকে চ্যালেঞ্জ করে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর পরিণতি কতটা নির্মম হতে পারে তা সময়ই বলে দেবে।

 

মার্কেটিং এর পাশাপাশি ঈদের ছুটি উপলক্ষ্যে ঘরমুখি মানুষ পঙ্গপালের মত গ্রামের বাড়ি ছুটছে। তারা নানা কৌশল অবলম্বন করে বাড়ি যাচ্ছে। মহাসড়কে চলছে পুলিশের সাথে লুকোচুরি। চেকপোস্টে গাড়ি আটকে দেয়ায় ঘরমুখি লোকজন কৌশলে চেকপোস্ট পার হচ্ছে। বড় বা মিনি ট্রাকে চড়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ডে বা চিটাগাং রোড মোড়ে আসার পর পুলিশ গাড়ি আটকে দেয়। পুলিশের চোখ এড়াতে ঘরমুখি মানুষ বোঝাই ট্রাক থামে চেকপোস্টের একটু আগে। সেখানে লোকজন নেমে যায়। ট্রাকটি খালি হয়। মানুষগুলো হেঁটে পথচারীদের মত চেকপোস্ট পার হয়। খালি ট্রাকটিও চেকপোস্ট পার হয়। রাস্তার অপর পাশের চেকপোস্টটি পার হয়ে কিছু দূরে ট্রাকটি থেমে থাকে। এরপর পায়ে হেঁটে চেকপোস্ট পার হওয়া মানুষগুলো একেএকে আবার ট্রাকে চড়ে গ্রামে ফিরে।

 

শেষ মুহূর্তে মানুষ মরিয়া হয়ে উঠেছে। যে কোন উপায়ে যে কোন কৌশলে ফিরছে গ্রামের বাড়ি। পরিবার-পরিজনকে গ্রামে পৌঁছে দিয়ে গৃহকর্তা আবার ফিরছেন নারায়ণগঞ্জে বা রাজধানী ঢাকায়। ব্যবসা বা চাকুরী যাই করেন না কেনো গৃহকর্তা গ্রামের পথ ধরবেন চাঁদ রাতে। পুলিশসহ আইনশৃংখলা বাহিনী মহাসড়কগুলোতে মানুষের চলাচল ঠেকাতে কঠোর ভূমিকা পালন করছেন। তারা দিনরাত চেষ্টা করছেন গ্রামমুখী মানুষের মিছিল ঠেকাতে। একই সাথে নারায়ণগঞ্জ জেলায় প্রবেশমুখেও গ্রাম থেকে ফিরে আসা মানুষকে আটকে দিয়ে পুণরায় গ্রামে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। 

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার মো. জায়েদুল আলম যুগের চিন্তাকে বলেন, মহাসড়কে আমাদের ১০টি চেকপোস্ট রয়েছে। তাছাড়া প্রতিটি থানায় এন্ট্রি ও এক্সিট পয়েন্টে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবুও মানুষ আসছে। মহাসড়কগুলোতে পুলিশের তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের উপর দিয়ে কোন গাড়ি যেতে দেয়া হচ্ছেনা। মানুষ অনেক কৌশল শিখে গেছে। পুলিশ বাহিনী তৎপর কিন্তু মানুষ বেপরোয়া। মানছেনা স্বাস্থ্যবিধি। পরিস্থিতি খারাপের দিকে চলে যাবে। 

 

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দোকানপাট, মার্কেট ও শপিংমলে ক্রেতা-বিক্রেতাদের স্বাস্থ্যবিধি না মানা, শহর থেকে অসংখ্য মানুষের গ্রামে ছুটে যাওয়া এবং সামাজিক দূরত্ব পালন না করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দোকানপাট, মার্কেট ও শপিংমলে ক্রেতা-বিক্রেতাদের স্বাস্থ্যবিধি না মানা, শহর থেকে অসংখ্য মানুষের গ্রামে ছুটে যাওয়া এবং সামাজিক দূরত্ব পালন না করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

 

এ কারণে করোনা সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন অবস্থায় ঈদের আগে ও পরে অন্তত সাত দিন মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণে রুদ্রমূর্তিতে থাকবেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত ও সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকার ঘোষিত নির্দেশনা বাস্তবায়নে পুলিশ সম্ভাব্য সব চেষ্টা অব্যাহত রাখবে। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন শহর থেকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ যাতে অন্যত্র যেতে না পারে, সেজন্য গ্রহণ করা হয়েছে বাড়তি নজরদারি, বাড়ানো হয়েছে টহল। শহরের প্রবেশপথে কঠোর নজরদারি করছে আইনশৃংখলা বাহিনী।

 

১৫ শর্তে চলমান সাধারণ ছুটির মেয়াদ ৩০ মে পর্যন্ত বাড়িয়ে আদেশ জারি করেছে মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ। ১৪ মে সপ্তম দফায় বাড়ানো এ ছুটির আদেশে বলা হয়েছে- সাধারণ ছুটি ও নিষেধাজ্ঞাকালে কেউ কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারবেন না। এ সময়ে সড়কপথে গণপরিবহন, যাত্রীবাহী নৌযান ও রেল চলাচল এবং অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচল বন্ধ থাকবে। মহাসড়কে জরুরি সেবায় নিয়োজিত যানবাহন (মালবাহী) ছাড়া অন্যান্য যানবাহন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

 

খোলা মাঠে বা উন্মুক্ত স্থানে আসন্ন ঈদের নামাজের বড় জামাত পরিহার করতে হবে। মানতে হবে স্বাস্থ্য বিভাগের স্বাস্থ্যবিধি। তবে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি। গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও নানা কৌশলে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে প্রবেশ ও বাহির হচ্ছেন অনেকেই। শপিংমলগুলোয়ও বালাই নেই স্বাস্থ্যবিধির। এতে বেড়েই চলছে করোনা সংক্রমণ।

 

এ বিষয়ে অধ্যাপক ডা. শাহরিয়ার নবী গণমাধ্যমকে বলেন, যত ‘মুভমেন্ট’ হবে, ততই সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়বে। তাই রাজধানী ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আগামী ঈদে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কারণ গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও মানুষ কিন্তু ঠিকই নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকায় আসছে, বেরও হচ্ছে। ফলে আশঙ্কা করছি, আগামী ঈদকে কেন্দ্র করে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। 

এই বিভাগের আরো খবর