সোমবার   ০৪ মার্চ ২০২৪   ফাল্গুন ২১ ১৪৩০

ওয়েস্টেজ মালামাল বিক্রিকে কেন্দ্র করে দুই হত্যা

অর্ণব হাসান

প্রকাশিত: ২৮ জুন ২০২২  

 

 

# নাটের গুরু ফজর আলী চেয়ারম্যান অভিযোগ এলাকাবাসীর
# রবিন হত্যার প্রতিশোধ নিতেই দৌলত মেম্বার খুন

 

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার গোগনগর ইউনিয়নে ডকইয়ার্ড এবং সিমেন্ট ফ্যাক্টরীর ওয়েষ্টেজ মালামালের আধিপত্য নিয়ে কয়েকদিন পরপর মারামাারি ঘটনা নৈমত্তিক। এবার এই আধিপত্য নিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়দের মতে, এই মারামারি ঘটনায় ঘুরে ফিরে ফজর আলীর বিচ্ছু বাহিনীর লোকজন জড়িত থাকে বলে অভিযোগ উঠে।

 

এলাকাবাসীর অভিযোগ, তার বিচ্ছু বাহিনীই গোগনগরে একক আধিপত্য বিস্তার করে। সিমেন্ট ফ্যাক্টরীর ওয়েষ্টেজ মালামাল বিক্রি, শীতলক্ষা ব্রীজের চোরাই মালামাল বিক্রি, ডকইয়ার্ডের ভাঙাচুরা জিনিসপত্র বিক্রি ফজর আলীর বিচ্চু বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে। গোগনগরে কয়েকটি গ্রুপ রয়েছে যারা কয়েকদিন পর পর আধিপত্য নিয়ে এসব মারমারির ঘটনা ঘটান। তাদের উপর কেউ কথা বলতে পারে না।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ এই বিচ্ছু বাহিনীর সদস্যদের শেল্টার দেন গোগনগরের চেয়ারম্যান ফজর আলী। সে শহরের প্রভাবশালী পরিবারের ক্ষমতা দেখান ফজর আলী চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকে সব কিছু তার নিয়ন্ত্রণে নেয়ার জন্য একের পর এক হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটছে বলে জানান লোকজন। যেখানে ফজর আলীর নিয়ন্ত্রণ নেই সেখানে তার বাহিনী হত্যা করতেও কোন কর্ণপাত করেন না। তারই ফল এবার গোগনগরে দুই হত্যা।

 

এলাকাবাসী দাবী তোলেন, সবার আগে ফজর আলীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় একের পর এক হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে বলে মনে করেন গোগনগরের সচেতন মহল। তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবী জানান ভুক্তভোগী দুই পরিবার।  
২৬ জুন রাতে তৃতীয় শীতলক্ষা সেতু ব্রীজের সামনে ঔষধ ক্রয় করতে যাওয়ার পথে গোগনগরের সাবেক মেম্বার দৌলত সিকদারকে কুপিয়ে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ নিহত পরিবারের। দৌলত মেম্বার জেলা কৃষক লীগের সাবেক সহসভাপতি ছিলেন। ওই দিন সন্ধ্যায় তার উপর গোগনগরের প্যানেল চেয়ারম্যান রুবেলের সন্ত্রাসী বাহিনী এই হামলা চালান। পরে তাকে উদ্ধার করে রাজধানীর আজগর আলী হাসপাতালে নিয়ে গেলে দায়িত্বরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। আর এনিয়ে পুরো গোগনগরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এই হত্যায় নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় মামলা হয়েছে বলে জানান অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আনিচুর রমান। সেই সাথে ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে তিনি রিশ্চিত করেন। তবে গ্রেপ্তারকৃতদের নাম জানাননি তিনি।

 

দৌলত মেম্বারের হত্যার ঘটনা নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গোগনগরের চর সৈয়দপুর থেকে সন্ধ্যার পর সিএনজি যোগে শহরে দিকে যাওয়ার পথে শীতলক্ষ্যা ব্রীজের সামনে গেলে তাকে ২০ থেকে ৩০ জনের মত লোক হামলা করেন। এক পর্যায়ে সিএনজি থেকে নামিয়ে বুকে শরীরের সর্বত্রে অস্ত্র দিয়ে আঘাত করতে থাকে। দৌলত মেম্বারের মাথায় প্রচুর আঘাত পায়। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে রডসহ অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়।

 

নাম প্রকাশে অচ্ছিুক এক ব্যক্তি জানান, চর সৈয়দপুর এলাকার আহ্মদ ডকইয়ার্ডের ওয়েষ্টেজ মালমাল নিয়ে কয়েকদিন আগে রানা বাহিনী এবং রুবেল মেম্বারের ভাই রবিন বাহিনীর সাথে মারামারির ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনার জের হিসেবে দৌলত মেম্বার হত্যার ঘটনা ঘটে। তাদের পিছনে শক্তি হিসেবে শেল্টার দেন ফজর আলী চেয়ারম্যান। উভয় গ্রুপের লোকজন এই জনপ্রতিনিধির বিচ্ছু বাহিনীর সদস্য।


অন্যদিকে দৌলত মেম্বারের ছেলে কাসেম সম্রাট জানান, আমার পিতা রানা ও রবিন বাহিনীর মারা মারির সাথে জড়িত নয়। তারা কেন আমার পিতাকে এই ভাবে হত্যা করলো আমি তা জানতে চাই। সেই সাথে যারা আমাকে পিতা হারা করেছে তাদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে কঠোর শাস্তির দাবী জানাই। হত্যাকারীরা মিথ্যা মামলা দিয়ে আমাদেরকে ফাঁসানোর পায়তারা করছে। এলাকাবাসী বলছেন গোগনগরের জনপ্রতিনিধির শেল্টারে আমার পিতাকে হত্যা করা হয়েছে। যারা আমার পিতার হত্যার সাথে জড়িত। তাদের যেন প্রশাসন কোন ভাবেই ছাড় না দেয়।


নিহত দৌলত মেম্বারের ভাই আবুল হোসেন জানান, গোগনগর চর সৈয়দপুর এলাকায় কয়েকদিন আগে রুবেলের ভাই ও ফজর আলী চেয়ারম্যানের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে পরিচিত রবিন ভাঙারি দোকানদার সাইজুদ্দিনের কাছে গিয়ে চাঁদা দাবী করেন। চাদাঁ না দেয়ায় তাকে তখন মারধর করা হয়। এর পর থেকে চর সৈয়দপুরের যাকে পায় তার উপর ফজর আলীর বাহিনী রুবেলের লোকজন হামলা চালান। তারা প্রতিশোধ নেয়ার জন্য আরও কয়েকটা হত্যা করতে পারে। তাদের বিরুদ্ধে এখনি যদি আইনি ভাবে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়া হয় তাহেেল আরও অনেক মায়ের বুক খালি হতে পারে।  


খোঁজ নিয়ে জানাাযায়, নারায়ণগঞ্জ সদর থানা পুরান সৈয়দপুর এলাকায় বিচ্ছু বাহিনীর দুই গ্রুপের মধ্যে গোগনগর ইউনিয়ন পরিষদের ১ নং প্যানেল চেয়ারম্যান, মেম্বার রুবেল ও রানা বাহিনীর মাঝে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সোমবার (২০জুন) রাত ১০টার দিকে প্রথমে চর সৈয়দপুর এলাকায় সংঘর্ষ হয় যা রাত ২ টা পর্যন্ত চলে। এই ঘটনায় উভয় গ্রুপের ১৫ থেকে ২০ জন আহত হয়। পরে এই মারামারির ঘটনায় মেম্বার রুবেলের লোকজন রানার বাড়ি পুরাতন সৈয়দপুর গিয়ে দুইটি মটর সাইকেল আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সেই সাথে বাড়ি ঘড়ে ভাঙচুর করা হয়। এই ঘটনায় নারায়নগঞ্জ সদর থানায় পাল্টাপাল্টি মামলা হয়। ২১ জুন রানা বাহিনীর বিপক্ষে ১৫ জনের নাম উল্লেখ্য করে লুৎফর রহমান বাদী হয়ে মামলা করেন। যার মামলা নম্বর ২৩। অপর দিকে একই দিনে রুবেল বাহিনীর বিরুদ্ধে ১৪ জনের নাম উল্লেখ্য করে হাসি বেগম বাদী হয়ে সদর থানায় মামলা করেন। যার মামলা নম্বর ২৪। তবে এই মামলায় তখন দুই গ্রুপের কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ প্রশাসন। সচেতন মহল মনে করছেন তাদের বিরুদ্ধে তখন কঠোর ব্যবস্থা না নেয়ায় আজকে দৌলত মেম্বার হত্যার ঘটনা ঘটে। তার খেসরাত দিতে হচ্ছে ভুক্তভোগী দুই পরিবারকে। কেউ বাবা হারিয়েছে, আবার কেউ সন্তান হারিয়েছে। তারপরেও এই ঘটনার শেষ কবে হবে তা গোগনগরের সচেতন মহল জানেন না। 


 
স্থানীয়রা জানান, তারা সবাই চেয়ারম্যান ফজর আলীর বিচ্ছু বাহিনীর সদস্য তারা কয়দিন পরে পরে এলাকার মধ্যে মারামারি করে আর সাধারণ মানুষ আতঙ্কে থাকে। কারণ তাদের ভয়ে এলাকার সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে ভয় পায়। কিছু দিন আগের রানা বাহিনীর সাথে সাবেক চেয়ারম্যান নূর হোসেন সওদাগর এর সাথে মারামারি ঘটনা ঘটে। তাদের এতো সাহস আসে কোথা থেকে?  এ বিষয়ে মেম্বার রুবেল জানান, আমার কাছ থেকে ডকইয়ার্ড ভাড়া নেয় তার পরে ডকইয়ার্ডের মালামাল রানা ও তার বাহিনী মিলে চুরি করে বিক্রি করতে গেছে তখন আমি এবং আমার লোকেরা বাধা দিলে পিস্তল ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রানা, কাশেম আরো ১৫/১৬ জন মিলে দিয়ে আঘাত করে।


গোগনগরের একাধিক ব্যক্তি জানান, আগের দিনের মারামারি ঘটনায় রুবেলের ভাই রবিন গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে তাকে চিকিৎসার জন্য আজগর আলী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার উন্নতি না হওয়ায় থাইল্যান্ড নেয়া হয়। রবিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু টিটু জানান, রবিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। ইতোমধ্যে এলাকায় মাইক দিয়ে জানানো হয়েছে। এরপরপরই দৌলত মেম্বার হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়।

 

নারায়ণগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ আনিচুর রহমান জানান, দৌলত মেম্বারের হত্যার ঘটনায় ইতোমধ্যে মামলা হয়েছে। সেই সাথে ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলমান আছে। এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করে রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক আছে। মামলা আইও এস আই রুবেল জানান, এখনো মামলা হয় নাই। আসামীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। এ বিষয়ে গোগনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ফজর আলী বলেন, যারা অপরাধী তাদের যেন আইনের আওতায় এনে সঠিক বিচার করা হয়।এমই/জেসি
 

এই বিভাগের আরো খবর