শুক্রবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আশ্বিন ৫ ১৪২৬   ২০ মুহররম ১৪৪১

একজন বাঙালী মা ও মুক্তিযুদ্ধ

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট ২০১৮  

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১সালের ৭মার্চ স্বাধীনতার ডাক দিলেন, মুক্তিযুদ্ধের ডাক  দিলেন পরাধীনতার শিকল ভেঙ্গে বাঙালী জাতিকে মুক্ত করার ঘোষণা দিলেন। ২৫ মার্চ কালোরাত্রিতে ঢাকার পিলখানায় জহিরুল হক হল, জগন্নাথ হল, ঢাকার আশে পাশে পাকিস্তানী হায়েনারা ঘুমন্ত মানুষের উপর নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায়। 

চলে মানুষ মারা চলে ধ্বংসলীলা, চলে ঘর-বাড়ি পোড়ানো। সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য প্রাণ বাঁচাতে শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে ছুটে চলে। ১৯৭১সালের জুন মাসের গোড়ার দিকে আমাদের গ্রামে এলেন ঢাকা বিশ^ বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র  সজিব। এক সপ্তাহের মধ্যে এলাকার শিক্ষিত যুবকদেরকে একত্রিত করে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। 

টীমে ছিলেন জালালউদ্দিন জালু, শামীম, কামরুল হাসান, আবদুল আজিজ, নাজিমউদ্দিন মাষ্টার, বাদশা মিয়া, আবদুল ওয়াদুদ, সফিউদ্দিনসহ আরো অনেকে বেনাপোল পার হয়ে ভারতের পালাটন ইয়ূথ ক্যাম্পে যোগ দেন। সেখানে ৩মাসর ট্রেনিং শেষে দেশে ফিরে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন সেই দামাল ছেলেরা। 

এরা যুদ্ধে যাওয়ার সময় এদের পরিবারের কেউ কেউ জানলেও আবার  অনেকে জানতোও না। শামীম তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। যুদ্ধে যাওয়ার সময় মাকে বলেন মা’ আমি যুদ্ধে যাচ্ছি দেশ স্বাধীন করতে। মা তাকে সম্মতি দিয়ে বলেন তোমার মতো ছেলেদের দেশের মুক্তির জন্য  বেশি প্রয়োজন। দেশকে স্বাধীন করে পাকিস্তানী হায়েনাদের পরাজিত করে বীরের বেশে ফিরে এসো।

দিন যায় মাস যায় ছেলের জন্য মায়ের অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হয়না। দীর্ঘ ৯মাস যুদ্ধের পর ১৯৭১সালের ১ডিসেম্বর বিজয় লাভ করেন। একে  একে সবাই ফিরে আসেন। শামীমের মা শুনতে পান দেশ স্বাধীন হয়েছে সবাই ফিরে এসেছে। সবার মতো শামীমের মা স্কুল মাঠে গিয়ে দেখতে পান একটি খাটিয়ায় স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকায় মোড়ানো একটি লাশ। এক কাঁধে মুাক্তিযোদ্ধাদের অ¯্র অন্য কাঁধে শামীমের লাশ।

শামীমের মা দৌড়ে গিয়ে সবাইকে জিজ্ঞাসা করেন আমার শামীম কোথায়। তোমাদের সবাইকেতো দেখছি আমার শামীম আসেনি। মুক্তিযোদ্ধারা  খাটিয়া নামিয়ে  মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকেন। কমান্ডার সজিব  মায়ের কাছে এসে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলেন মাগো মা তোমার শামীম এসেছে ঐ দেখো। 

মা খাটিয়ার দিকে এগিয়ে গেলেন ছেলের গুলিবিদ্ধ লাশ দেখে স্তব্দ হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর মায়ের গগনবিদারী আর্তনাদে গোটা বন্দর শাহী মসজিদের আকাশ পাতাল যেন ভারী হয়ে উঠল। মায়ের চিৎকার কোনক্রমেই থামানো যাচ্ছেনা। মা হঠাৎ ছেলের হাতে থাকা চিরকূট নিয়ে দেখলেন তাতে লেখা..মা আমি তোমাকে কথা দিয়েছিলাম পরাধীনতার শিকল ভেঙ্গে দেশকে স্বাধীন করে দেশের মানুষকে মুক্ত করে আনবো। 

আমি আমার কথা রাখতে পেরেছি। আমাকে নিয়ে তুমি  আফসোস করোনা মা। আমি নেই তাতে কি হয়েছে তোমার জন্যতো হাজারো শামীম রেখে গেলাম। তোমার জন্য রেখে গেলাম একটি লাল-সবুজের পতাকা, একটি স্বাধীন সার্বভৌম ভূ-খন্ড বিশ^ মানচিত্রে একটি নাম বাংলাদেশ। 

যখন আমাকে মনে পড়বে তখন পতাকার গন্ধ শুকে আমাকে খুঁজে নিও মা। পতাকা হাতে নিয়ে মা উঠে দাড়িয়ে  বলে উঠলেন এইতো আমার শামীম। মা যতদিন পৃথিবীতে বেঁচে ছিল জাতীয় পতাকা বুকে ধারণ করেই বেঁেচ ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মমতাময়ী মা সন্তানের জন্য এতোটুকুও মন খারাপ করেননি এজন্য যে,কারণ তার গর্বিত সন্তান দেশের জন্য নিজের জীবন দান করে গেছেন।            

লেখক: মোঃ  সামসুল হাসান
সাবেক সভাপতি, বন্দর ইউনিয়ন ছাত্রলীগ