সোমবার   ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আশ্বিন ১ ১৪২৬   ১৬ মুহররম ১৪৪১

উত্তর দক্ষিণ

প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট ২০১৯  

পর্ব: ৫

হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে সীমা। হাসপাতাল হোটেল নয়। আর এ হচ্ছে ক্যান্সার হাসপাতাল। এখানে প্রতিটি মানুষ বড় অসহায়। এখানে আনন্দ বহুদূর থাকে। কেবল আতঙ্ক থাকে সারাক্ষণ। আর যদি হয় দুরারোগ্য ব্যাধি তবে রোগীর যে মানসিক অবস্থা তৈরি হয় তা শুধু ক্ষণিকের জন্য এসে দেখে বোঝার উপায় নেই। রোগী এবং রোগীর যিনি সেবক/সেবিকা থাকেন তাদের মানসিক অবস্থা নিরূপণ করা কঠিন। 

 

এটেনডেন্টকে ফেস করতে হয় চিকিৎসকগণ থেকে প্রতিনিয়ত যে নির্মম অসহনীয় সত্যটুকু যা কাউকে আবার শেয়ার করা যায় না। কারণ রোগীর অবস্থা ভালো নয়। চিকিৎসায় কোনো ফল আসবে না। তখন অনেকেই চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে ঝাড়ফুকে চলে যায়। আমি দেখেছি এমন। সময়ভেদে বিভিন্ন রোগীর সাথে ব্যবহারের তারতম্য। সুস্থ ও অসুস্থ কিংবা গুরুতর অসুস্থ্যের সাথে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। বিগত কয়েকটি দিনে যা দেখলাম তা মানব জীবনের শেষ ভাগে ভয়াবহ মনোকষ্টকর বিষয়।

 

সীমাকে নিয়ে যখন গাড়িটি ক্যান্সার হাসপাতালের দিকে যাচ্ছে তখন তাঁর সাথে আমি নানা বিষয়ে কথা বলে মনযোগ অন্যদিকে রাখার চেষ্টা করি। ও যেনো দেখতে না পায় হাসপাতালের নাম ফলক। তাতে করে ওর মানসিক অবস্থা প্রথমেই খারাপ হয়ে না যায়। এই যে রোগীর সামনে সাবধানে কথা বলা। তাঁর মানসিক অবস্থা জেনে চলা। ক'জনে খেয়াল করে ?


এই যে তারা সারাক্ষণ মায়া মমতার কথা বলেন। তা আদৌ শুদ্ধ কি ? জানতে অজান্তে কত ভুল করে বসেন! তারা কি সত্যি সবাই মায়া-মমতা কী জিনিষ সেটা জানেন? না, জানে না। প্রতিনিয়ত ভুল করে তারা রোগীর মানসিক অবস্থা নীচে নামিয়ে দেন। একজন ভিজিটর এসে সীমার সামনে বসে বলে ফেললো- এতো দেখছি ভয়াবহ ব্যাপার!

 

ক্যান্সার আক্রান্ত বা নিশ্চিত মৃত্যুর ঝুঁকি আছে এমন রোগীর সাথে ব্যবহার কি করা উচিত, কী করা উচিত নয়। কী খেতে পারে কী খেতে পারে না। কিসে তাঁর শরীর ও মন উন্নত হতে পারে তা বেশির ভাগ মানুষ জানে না। এ দেশে নাকি সব দেশেই মৃত্যুর সময় মুমূর্ষু সঠিক পরিচর্যা পায় কি না আমার সন্দেহ হয়। এটা কঠিন এক ত্যাগ স্বীকারের বিষয়। মুখে মুখে বলে কিছুই করা যায় না, যাবে না। শক্ত সার্মথ্য বিনয়ী সুশিক্ষিত ত্যাগ স্বীকারে সম্পূর্ণ অকৃপণ। সাথে গভীর মমত্মবোধ যাঁর মধ্যে আছে একমাত্র তিনিই পারেন মৃত্যুপথ যাত্রীর ভয়াবহ কষ্ট কিছুটা হলেও উপশম করতে।

 

সোজা কথা সুশিক্ষা না থাকলে আন্তরিকতাও সঠিক হয় না। ভালোবাসায়ও পবিত্রতার রূপ পাখা মেলে না। যাকে যাদেরকে আমরা ভালোবাসার কথা বলি তা সম্পূর্ণ নয়। ভালোবাসা এ এক অনন্য দায়িত্বের বিষয়। কমিটমেন্টের বিষয়। অভিভাবক অনুজদের ভালোবাসেন। শুধু কী ভালোবাসেন ? তারা কি তাঁর ভালো-মন্দ খেয়াল করবেন না! ভালো-মন্দ অন্য কোনো দিকে খেয়াল না করে যে ভালোবাসা সেটা কি তার আসলেই ভালোবাসা হলো? 

 

সম্পর্কের কারণে বেশির ভাগ ছোটোরা তাদেরই কাছে থাকতে চায় বেশি। যেখানে তাঁর জন্ম শৈশব বাল্যকাল কেটেছে, যৌবনে প্রবেশ করেছে। জীবনভর অন্ধভাবে তাদেরই কথা শোনে যায়। অন্যদিকে বাস্তবতা হলো অন্ধ সমাজে পবিত্র আলোর প্রবেশ সহজ নয়। যতটা দ্রুত আরও কঠিন গাঢ় পাপযুক্ত আঁধার নেমে আসে। বড় অদ্ভুত সমাজের কিছু অংশ তারা কুক্ষিগত করে রাখবে সারাক্ষণ আবেগের কৌশলে, চুষে খাবে তলানি পর্যন্ত কিন্তু এর বাহিরে আর কোনো খবর রাখবে না।

 

সেখানে কোনো মায়া নেই। ভালোবাসা নেই। এমন-কি জীবনটা দিয়ে যে করে গেলো তাঁর বিদায় বেলায় এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়তে দেখা যায় না! স্বার্থের কারণে কথায় কথায় যেখানে জল পড়তে দেখেছি অবলীলায় সেখানে মরু শুষ্কতা একেবারেই অবিশ্বাস্য! এ কেমন ভালোবাসা ? এ কেমন সম্পর্ক? তাহলে দেহটা রেখে তাঁর সকল সত্ত্বা কেনো ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিলে? শুধু কি স্বার্থের প্রয়োজন মুখ্য ছিলো ?

 

বাংলাদেশে সরকারি যে কোনা হাসপাতালে ভর্তি করাতো দূরের বিষয় এত তাড়াতাড়ি ব্যক্তি মালিকানাধীন ক্লিনিকেও ভর্তি হওয়া কঠিন। এখানে কাউকে আমি ধন্যবাদ দিবো না, এঁরা আমার কেহ বন্ধু, কেহ ভাই। ব্যক্তি জীবনে তারা সজ্জন। যাঁরা পিছন থেকে সম্পূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সীমার ভর্তির বিষয়ে।

 
এতটা সুযোগ পাওয়ার পরও এখানে ভর্তির বিষয়ে একজন আপত্তি তুলেছিলেন! হয়তো না জেনে, অজ্ঞানতাবশতঃ তার আপত্তি থাকতে পারে। যাক সে বিষয়ে গেলাম না। শুধু এটুকু বলি কিছু মানুষের বয়স হলেও চিন্তা-ধারায় অপরিপক্ক থেকে যায় তা কেবল কর্মক্ষেত্রে ধরা পড়ে না, সকল পরিবেশেই প্রকাশ পায়! 

 

এক সাথে চলতে গেলে সে দুর্বলতা চোখে পড়বে। দূর থেকে যা বোঝা যায় না। দেখেছি খুব কাছের মানুষও দুঃসময়ে সমস্যা মোকাবেলায় তারা পুরোপুরি সিদ্ধহস্ত নয় ! অবশ্য বাহ্যিক প্রকাশ ভিন্ন একেবারে পরিপক্ক কিন্তু ভেতরে একদম কাঁচা।

 

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনিস্টিটিউট ও হাসপাতালে সীমাকে ভর্তি করিয়েছি শোনার পর নারায়ণগঞ্জ থেকে হাসপাতালে অনেকে এলেন। কথা হলো। ভরসা দিলেন। বেশ বড় এবং পরিচ্ছন্ন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিন দেখে তারা স্বস্তি পেলেন। চিকিৎসার ব্যাপারেও খোঁজ নিলেন। এর মধ্যে দুজন নগদ টাকা দিলেন। যদিও খুব বেশি নয় তবুও এ দুঃসময়ে এটুকু ভরসা বৃদ্ধির শক্ত অবলম্বন বলা চলে। সামনে যুদ্ধ করার আশাটা বাঁচিয়ে রাখে।

 

মানুষের ভাবে-ব্যবহারে তার ভিতরের চরিত্র প্রকাশ পায়। তার ভিতরের টান অনুভব ব্যক্তি বিশেষে কার জন্য কতটুকু পরিষ্কার বোঝা যায়। যেমন দুজন মানুষকে একই সময়ে যদি কিছু ক্রয় করে আনতে বলা হয়। যা ধরতে গেলে প্রায় সমান ক্যাটাগরির। সেই ক্রয়কৃত তৈজষপত্র থেকে বোঝা যায় তাদের ভিতরের মন-মানসিকতা। একজন চরম মুমূর্ষু দান গ্রহিতার প্রতি তাদের আন্তরিকতা।

 

আমার চোখে কোনো কিছু এড়ায় না। অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়গুলো ধরা পড়ে অনায়েসে। সাথে সাথে ঘটনার বিশ্লেষণ আমার অনুর্বর মস্তিষ্কও সহজে করে নেয়। দেখলাম একজন আমার শুভাকাঙ্খী ফল কাটার জন্য ছোট্ট একটি ছুরি নিয়ে এলেন। অন্য আরেকজন অপর প্রান্তে তা দেখে তার যে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া আমার চোখে পড়ে, সে কখনও আমি ভুলবো না। বোকা কিংবা নিষ্ঠুর প্রকৃতির মানুষ হলে এমন যে কোনো নির্মমতা ভেবে নিতে পারে অনায়েসে।

 

দুপুরের পর থেকে হাসপাতালের ব্যস্ততা কমে আসে। আমরা আছি নবম তলার একেবারে পশ্চিমে। পাশেই বিশাল করিডোরের প্রান্তে মাঝারি সাইজের একটি বারান্দা। আমাদের কেবিনের একেবারে লাগোয়া। বিকালের দিকে বিভিন্ন ওয়ার্ড, কেবিন থেকে দেখলাম রোগীরা এখানে এসে বসে থাকেন, কেহ দাঁড়িয়ে দূরে উদাস দৃষ্টি ফেলে রাখেন। ধীরে ধীরে দিনের আলো হারিয়ে যেতে দেখেন। তাঁরা সবাই ক্যান্সারের রোগী। এঁরা খুব কম কথা বলেন। ভয়ার্ত তৃষ্ণা নিয়ে দেখেন বেশি, ভাবেন বেশি। যেনো অন্তহীন দুর্বোধ্য কি যেনো ভাবনা তাঁদের পেয়ে বসেছে। তাঁরা চোখ বন্ধ করতে চায় না। তাঁরা ভাবনা থামাতে চায় না। তাঁদের সকল ইন্দ্রিয় সক্রিয় রাখতে চায় সারাক্ষণ।

 

সীমাকে বিকালের চা খাওয়াই। লাল চা তাঁর খুব পছন্দ। সাথে বিস্কুট। এরই মধ্যে নার্স সিস্টার ওযার্ড বয় ক্লিনার সবার সাথে পরিচয় হয়েছে। আশা করছি সবার সাথে দ্রুত ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠবে। মানুষের সাথে সম্পর্ক দ্রুত গড়ার ক্ষেত্রে আমার উপর অবিশ্বাস বোধহয় শত্রুও করে না। এদিকে ধারণা করছি এখানে এ হাসপাতালে আমাদের বেশ সময় দিতে হবে। শাহাব বলেছে- যতদিন এখানে তাদের আওতায় থাকা যায়, সেটাই চেষ্টা করিস। এখানকার ডাক্তরগণ, অফিসের লোকজন সবাই আমাদের আলাদাভাবে দেখছেন প্রথম থেকেই। এ আমাদের পরম সৌভাগ্য!

 

প্রথমত চেহেরা, সুঠাম দেহ, তারপর শেষ সুযোগ থাকে তার ব্যবহার। চেহেরা যেমন তেমন ব্যবহারটা যদি স্বাভাবিক হয়, আন্তরিক হয়, ভিতরের কালিমা যত্রতত্র প্রকাশ না পায়, অপরকে সম্মান করার নমনীয়তা-বিনয় থাকে তবে কেনো সে মানুষের মন জয় করতে পারবে না ? অতি কঠিন মানুষেরও মন গলে যায় সরল-সহজ ব্যবহারে। এর জন্য সবার আগে অন্তরটা পরিষ্কার থাকতে হবে। সবজান্তা ভাবটা দূর করতে হয়। কারণ সর্বক্ষেত্রেই প্রতিনিয়ত নতুন নতুন নিয়ম কৌশল বের হচ্ছে। তা জানতে হবে। জানার আগ্রহটাও থাকবে সুপ্ত কৌশলের মাঝে। কারণ এ দেশে কাউকে ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য কেউ বসে নেই। সবাই ছুটছে অন্যরকম অস্বাভাবিক এক গতিতে। তাদের অস্থিরতা দেখে মনে হয় ট্রেনটা এখ্খুনি ছুটে যাবে। প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে যাবে। হায়, এই ট্রেনের শেষ গন্তব্যস্থল অনেকেই ভুলে থাকেন! তারপরেও কত অন্ধ মোহ তার এই ট্রেনে চড়ার!

 

কেবিনে যখন যে আসছেন ডক্টর, নার্স, ওয়ার্ডবয় তাঁদের নাম ও ফোন নম্বর খুব বিনয়ের সাথে জেনে রাখি। ডক্টরদের নম্বর খুব জরুরি তাঁরা থাকেন সব সময় ব্যস্ত। নিঃসংকোচে তাদের নম্বরও চেয়ে যখন বসি তখন তাঁরা কেউ কেউ অবাক হন। তবে তাঁরা প্রতিটা মুহূর্ত আমাদের বেশ সহযোগিতা করছেন। আজীবন কৃতজ্ঞতা থাকলো তাঁদের প্রতি। বিশেষ করে তাঁরা আমাকে ভীষণ মানসিক সাপোর্ট দিয়েছেন। নতুবা এই ভয়াবহ অবস্থায় সেবা করার সাহসটুকু হারিয়ে ফেলতাম। দেখে খুব ভালো লাগলো এরই মধ্যে ডক্টর আজিজ, ডক্টর রোবানা সাবরিন সীমার পছন্দের তালিকায় এসে গেছেন।

 

সীমা তাঁদের বলেন- বায়াপসি রিপোর্ট এলে দেখবেন আমার আসলে কিছুই হয় নি। তাঁরাও বলেন হ্যাঁ, আপনার কিছু হয় নি। যা হয়েছে যতটুকু হয়েছে তার চিকিৎসা করবো। আপনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাবেন। আমি দেখি তাঁদের কথা শোনে সীমা কখনও চঞ্চল হয়ে ওঠে আবার একটু পরেই ভাবলেসহীন দৃষ্টি এদিক সেদিক ঘুরে ফিরে। বুঝলাম কিছু নির্বোধ মূর্খ মানুষের অসাবধানে কথাবার্তার কুফল সীমাকে গ্রাস করেছে।যা আমাকে ভীষণ অসহায় করে তোলে!

 

চিকিৎসকগণ যখন সীমাকে দেখে যান আমি তাঁদের পিছনে পিছনে যাই। বিনয়ের সাথে জানতে চাই সীমার জন্য কোনো চিকিৎসা রয়েছেতো। তাঁরা তেমন কিছু বলেন না। শুধু বলেন সিনিয়র ডক্টরগণ জানাবেন। মিছে প্রবোধ দেয়ার মতো তাঁদের উত্তর তবুও আমি আশায় বুক বেঁধে আসি। আশা করি সিনিয়র ডাক্তারগণ অবশ্যই কোনো পথ দেখাবেন।

 

যখন কেবিনে ফিরে এলাম সীমা তাকিয়ে আছে আমার মুখের দিকে। মুখে কিছু বলে না। কিন্তু তার মনের মধ্যে হাজারো প্রশ্ন ঘুরে ফেরা করছে সে আমি বুঝি। কিন্তু সে আামাকে সরাসরি প্রশ্ন করে কোনো বিব্রতকর অবস্থায় ফেলবে না, এ সচেতনতা তার মধ্যে প্রখর। আমি নিজেই ভিতরে ভিতরে কী বলবো দ্রুত ভাবতে থাকি। তাৎক্ষণিক কোনো উত্তর মাথায় আসে না। মিথ্যে বলাও আমার পক্ষে অত সহজ না। 

 

শেষে ঘুরায়ে ফেরায়ে বলি ওনাদের মোবাইল নম্বরটা নিয়ে আসলাম। সীমার বড় বড় চোখ দুটি আমার চোখের দিকে কোনো অজানা ভরসায় অপলক নিবদ্ধ। তাঁর মনিদুটি টলমলে ভাসমান লক্ষ্য তীক্ষ্ণ এবং অনড়। ও নয়তো জটিল কিছু ভাবছে। আমি বাড়তি কোনো প্রশ্ন করি না। বর্তমান প্রসঙ্গ দ্রুত অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে যাই। জিজ্ঞাসা করি রাতে কী খাবে ? ও কিছু বলে না। কিছুক্ষণ পর আমি খাবারের জন্য বের হই। তাকে একা কেবিনে রেখে মন সায় দেয় না কোথাও যেতে কিন্তু কোনো উপায় নেই। যে যার কাজে ব্যস্ত। কে কতটা গভীরভাবে ভেবে কারো জন্য এগিয়ে আসবে সে দুরহ চিন্তা। কেউ কেউ আসে একদিন দুদিন কিংবা তিনদিন নিজের সুবিধামত। খুব বেশি যদি আবেগ কাজ করে তবে আরও কিছু দিন। তারপর?

 

জগতের বিশেষ করে অতি মাত্রায় করাপশনের দেশগুলোর কঠিন অবস্থা সম্পর্কে আমার বহু পূর্বেই ধারণা ছিলো। দেশি-বিদেশি কিছু গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ পড়ে। বিশেষ করে কিছু রাশান রচনা সমগ্র যা আমি পড়েছি সেখানে এর সহজ বিবরণ পেয়েছি। তার মধ্যে ক্রাইম এন্ড পানিশম্যান্টে দেখেছি রূঢ় বাস্তবতা কাকে বলে। কখনও রাসকোলইনকভের চরিত্রটি আমি ভুলতে পারি না। তাকে যে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় সে যেনো আমিও প্রতিনিয়ত দেখে চলেছি। 

 

অতীষ্ট হয়ে কখনও ভাবি আমার এই অবস্থান, এই চাপ অসহনীয়। ধীরে ধীরে বা হঠাৎ একদিন চরম যন্ত্রণার মাঝে মরে যাওয়ার সামিল। এমনও মনে আসে কোনো কিছু আর না ভেবে পালাও এখান থেকে। না, শেষ পর্যন্ত পারি না। এই পরিবেশেই তবু চলতে হয়। স্যাক্রিফাইস না থাকলে তাকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ বলা যায় কি ? সংসারে, পরিবারে, সমাজে স্যাক্রিফাইস খুব জরুরি। অন্যদিকে একপেশে স্যাক্রিফাইসও আবার ঠিক নয়। মাত্রাতিরিক্ত ভুল বা অন্যায় দেখে চুপ করে থাকাও মেরুদণ্ডহীন ব্যক্তির পরিচয়। নতুবা তারও এক প্রকার কঠিন অর্ন্তজ্বালা রয়েছে। যা আমার পক্ষে অসহনীয়। সামান্য স্বার্থ উদ্ধার হলেও অনেকে সহ্য করে থাকে। আবার বৃহত্তর চিন্তা করে গুটিকয়েকজন তা পারে না। এই অর্ন্তজ্বালা এমন হতে পারে যে ভুক্তভোগীকে এক সময় আত্মহত্যার পথে নিয়ে যায়।

 

সীমার তন্দ্রা ভাঙে। আমাকে তাঁর মাথার কাছে দেখে বলে তুমি এখনও যাও নি ? আমি বললাম বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখি তুমি ঘুমিয়ে আছো। এই অবস্থায় বের হলাম না। ও আচ্ছা, রাত হয়ে যাচ্ছে এবার যাও দরজাটা খোলা রাখলেই হবে। আমি যেন বাহিরের মানুষজন দেখতে পাই।

 

করিডোর পার হয়ে নার্সদের বসার জায়গাটা ফেলে বাম দিকের লিফটের কাছে যাই। এখানে সব ক্যান্সারের রোগী অন্য যে কারোর হাটা চলার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে। এখানে রয়েছে কয়েক মাসের অসহায় শিশু থেকে জীবন সায়াহ্নের বৃদ্ধ পর্যন্ত। সবাই বিভিন্ন ক্যান্সারে আক্রান্ত। দেখি সবার চোখে মুখে সাংঘাতিক মৃত্যু আতঙ্ক। এখানে রোগীর সাথে পরিচার্যাকারীর মধ্যেও কাজ করে ভীষণ অস্থিরতা। কারোর মুখে হাসি নেই। কৌতূহল নেই। শুধু ভাবলেশহীন দৃষ্টি এদিক সেদিকে কোনো সহানুভূতির আশায় ঘুরাঘুরি করে। 

 

লিফটের কাছে আমার মতো দাঁড়িয়ে আছে এমনই অনেক অস্থির মানুষ। কেউ ঔষধ আনতে যাচ্ছে, কেউ খাবার, কারোর রিপোর্ট আনার জন্য ব্যস্ততা। এমনও দু’একজন আছে সারাদিন পর এখন অন্য কাউকে রেখে বাসায় ফিরে যাচ্ছে বিষন্ন মন নিয়ে। তাদের চেহেরা দেখে মনে হয়, হয়তো ভাবছে- ঔষধটা ঠিক মতো দিবে তো। সিস্টাররা রাতের ঔষধ সময় মতো দিয়ে যান। তারপরেও একটা দুশ্চিন্তা থেকে যায়। আমাদের অস্বাভাবিক পরিবেশ পরিস্থিতি দুর্ভাবনায় ফেলে দেয়। একজন ক্যান্সার রোগীর বেলায় শুধু ঔষধ নয় তার মানসিক সাপোর্ট ঔষধের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। যা সবাই পারে না। বা আবার সবার থেকে গ্রহণ করে না।

 

তখন রাত ন’টা। নীচে নেমে দেখি বিশাল গাড়ি বারান্দায়, তার সামনের রাস্তায়, এমনকি সিড়িতে পর্যন্ত পা ফেলার জায়গা নেই। মানুষ আর মানুষ গিজগিজ করছে। বিষয়টি কী ? সারা দেশ থেকে এরা সকালে আউটডোরে চিকিৎসা নিতে এসেছে। এরা নতুন রোগী। পুরানোরা কেউ দিতে এসেছে ক্যামোথেরাপি। কারোর রেডিওথেরাপির তারিখ। কেউবা এসেছে ফলোআপে। এদেরে মধ্যে বড় একটি দলের ভাগ্যে আবার এই ছাদের নীচে জায়গা মিলে নি। তারা ব্যবস্থা করেছে খোলা রাস্তায়। 


এখানে এখন যে যেভাবে পারছে রাত কাটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। শোনলাম সকাল হলে ভীড় আরও বেড়ে যায়। তাদের মধ্যে হয়তো অনেকের সেদিন চিকিৎসকের দেখা না-ও মিলতে পারে। এখানে তেমন একটা আলোর ব্যবস্থা নেই। বাথরুমের ব্যবস্থা নেই। তাহলে এঁরা প্রস্রাব-পায়খানা কোথায় করে ? পুরুষরা না হয় কোনো না কোনো ভাবে লজ্জাহীন হয়ে তাদের প্রকৃতির ডাক যত্রতত্র সেরে ফেলে। মহিলারা ? 

 

এদিকে এই প্রবল জনস্রোতের সাথে হাসপাতালের সিকিউরিটি গার্ডরা খুব একটা ভালো ব্যবহার করে না। আবার তাড়ায়েও দেয় না। কারোর সাথে দেখি ভাবটা একটু বেশি। বিশেষ করে যে সব রোগীর সাথে তরুণী মেয়ে বা যুবতী স্ত্রী আছে। কিংবা চেহেরা-সুরূত সম্ভ্রান্ত মনে হয়। কিংবা ভাবে প্রকাশ পায় তাদের সাথে টাকা কড়ি আছে। কিছু ভাগে মিলবে।

 

আমি খুব সাবধানে কাউকে অসুবিধা না করে খোলা রাস্তায় এসে রিক্সা নেই। রিক্সাওয়ালাকে বলি দ্রুত ভালো একটি খাবারের দোকানে নিয়ে যাও। খুব একটা দূরে নয় বেশ চালু এমন একটি বড় দোকান পেয়ে যাই। সেখান থেকে কয়েক রকমের অল্প অল্প করে গরম খাবার নিয়ে নেই। সাথে হালকা মিষ্টি দই নেই।


বাহির থেকে খাবার নিয়ে যখন কেবিনে ফিরে দেখি সীমা দরজার দিকে এক মনে চেয়ে আছে। আমাকে দেখে তাঁর চোখে-মুখে নির্মল আনন্দ খেলে যায়। যা আমার খুব ভালো লাগে। আমি দ্রুত সব রেডি করে তাকে নিয়ে খেতে বসি। বেশ ক্ষুধা নিয়ে দুজনে হাসপাতালের বেডে পেপার বিছিয়ে তার পাশে বসে খাওয়া শুরু করি।

 

বাহিরে খাওয়া সীমার খুব শখ ছিলো। আইন কলেজের বারান্দায় বসে সে একবার বলেছিলো- অল্প খাবো তবে মাঝে মধ্যে রেঁস্তোরায় খাবো। সব স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয় না। যদি আরও কারোর অসময়ের স্বপ্ন দীর্ঘসূত্রিতায় জুড়ে যায়। (চলবে...)

 

এটিএম জামাল
সোনারাগাঁ ভবন, মিশনপাড়া, নারায়ণগঞ্জ
১৯ জুলাই, ২০১৯