মঙ্গলবার   ১২ নভেম্বর ২০১৯   কার্তিক ২৮ ১৪২৬   ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

ইজতেমা আয়োজনকে নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা

প্রকাশিত: ৭ নভেম্বর ২০১৮  

স্টাফ রিপোর্টার (যুগের চিন্তা ২৪) : সম্প্রতি জেলায় ইজতেমা আয়োজনকে নিয়ে তাবলীগ জামাতের ওলামায়ে কেরাম ও তাবলীগের মূল ধারার সূরা সদস্যদের সাথে তাবলীগ জামাতের সাদপন্থীদের মধ্যকার বিবাদমান ঘটনায় যে কোন মুহুর্ত্বে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পর্যন্ত দুপক্ষের মধ্যে দুইবার হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে। জেলা তাবলিগ মার্কাজ মসজিদের অধিভুক্ত নগরীর আমলাপাড়ায় অবস্থিত ছোট মার্কাজ মসজিদে এ দুটি ঘটনা ঘটে।

এখনই প্রশাসন পূর্ণাঙ্গ সতর্কতা অবলম্বন না করলে যে কোন মুহুর্ত্বে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।  কেননা সরকারের পক্ষ থেকে ২০১৯ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ জানুয়ারি ও ২৫, ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি দ্বিতীয় ধাপ টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমার তারিখ নির্ধারণ করা হয়।  কিন্তু মাওলানা সা’দ পন্থীরা নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার থানায় ২০১৮ সালের ২২, ২৩ ও ২৪ নভেম্বর ইজতেমা আয়োজন করার চেষ্টা করছেন। এবং এটিকে নিয়ে অনেক বড় ধরণের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন। 

জানা যায়, ছোট মার্কাজ মসজিদে তাবলীগ প্রতি মঙ্গলবার মাশোয়ারা (আলোচনা) এবং প্রতি বৃহস্পতিবার ‘সবগুজারি’ (রাত্রী যাপন) অনুষ্ঠিত হয়। তাবলীগ জামাতের সাদপন্থীরা জেলায় ইজতেমা আয়োজনকে কেন্দ্র করে জেলার বিভিন্ন মসজিদ থেকে তাদের সাথীদের নিয়ে জড়ো হয়। এই মসজিদে তাবলিগ জামাতের মুল ধারার তারাও নিয়মিত আসেন।

কিন্তু ১ নভেম্বর দুপক্ষের মধ্যে হঠাতই উত্তেজনা তৈরি হয়। ওই দিন নিয়মিত বয়ান শেষে নারায়ণগঞ্জ জেলা ওলামা পরিষদের সভাপতি ও ডিআইটি মসজিদের খতীব মাওলানা আব্দুল আউয়ালকে দোয়া করার অনুরোধ করলে সাদপস্থীরা এর প্রতিবাদ করেন। এবং তাকে গালিগালাজ করে লাঞ্ছিত করেন বলে অভিযোগ করেছেন মূল ধারা সূরা সদস্যরা। তাবলীগ জামাতের সাদপন্থী অনুসারি হিসেবে জেলায় মো.আসাদুজ্জামান, জালাল উদ্দিন রাসেল, আবিদ হোসেন, আমিনুল ইসলাম, শাহাদাত, সজিব, আশ্রাফ হাসান রুবেল, শহিদুল্লাহ খান, মাসুদ শাহজাহান, রেজাউদৌলঅ কাজল নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে মুফতি আনিস আনসারি বাদী হয়ে তাদের বিরুদ্ধে সদর মডেল থানায় জিডি করেছেন।

এমন ঘটনায় পরবর্তীতে আরো উত্তেজনা তৈরি হয়। ২ তারিখ ডিআইটি জামে মসজিদে জুম্মার খুতবার বয়ানে মাওলানা আউয়াল হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় জেলার যে ইজতেমা আহবান করেছেন, আলেম ওলামাদের বাদ দিয়ে এভাবে সূরাকে উপেক্ষা করে ইজতেমার আয়োজন হলে রক্তের বন্যা বইয়ে যাবে।’

উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় ৩ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ সদর আমলাপাড়া মার্কাজের সকল তাবলীগি কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত করতে জেলা তাবলীগ মারকাজের সুরার পক্ষে মাওলানা আব্দুল আউয়াল ও সিরাজ মিয়া সদর ওসি বরবার আবেদন করেন। যার প্রেক্ষিতে (৫ নভেম্বর) দুপুরে প্রশাসন দুপক্ষকে সতর্কবার্তা পাঠায়। এবং পরবর্তী ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত কার্যক্রম স্থগিতের নির্দেশনা দেয়। কিন্তু এরপরেও সাদপন্থী ও মূলধারার তাবলীগের দুইপক্ষই আলাদাস্থানে নিজেদের অবস্থানের প্রস্তুতি নেয়। ফলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়। তাবলীগ জামাতের মূল ধারার দাবি, প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও সাদপন্থীরা ছোটমার্কাজ মসজিদে মাশোয়ারা জন্য জড়ো হয়েছে। এটি আমরা প্রশাসনকে জানিয়েছিলাম। সেখানে পুলিশ মোতায়েনের অনুরোধও করেছিলাম।  
এদিকে ৬ নভেম্বর আমলাপাড়া ছোট মার্কাজ মসজিদে আবারো সাদপন্থীরা মাশোয়ার করছে বলে খবর পায় বলে দাবি মূলধারার তাবলীগ জামাতের অনুসারীরা। হাজার দেড়েক সদস্য নিয়ে তারা প্রথমে ডিআইটি মসজিদে জড়ো হয়। এবং প্রশাসনকে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানাতে থাকে। এরপর তাদের একটি পক্ষ ডিআইটি মসজিদ থেকে ছোট মার্কাজ মসজিদ আনে। এসময় তাদের তিনজন সাদপন্থীদের কেন সভা করছে তা জিজ্ঞাসা করতে ঢুকলে তারা তাদের বেধড়ক মারধর করে।

পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে মূল ধারার তাবলীগ সদস্যদের উদ্ধার করে। সাদপন্থীরা মসজিদের ছাদ থেকে ঢিল মারলে এতে কয়েকজন আহত হয়। বাইরে তাবলীগের মূল ধারার হাজারো সদস্য জড়ো হলে সাদপন্থীদের সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ( ওসি) কামরুল ইসলাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে আগামীকালও বৃহস্পতিবার (৮ নভেম্বর) ছোট মার্কাজ মসজিদে সাপ্তাহিক ‘সবগুজারি’ কার্যক্রমে আবারো যে ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনার ঘটার আশঙ্কা করছেন অনেকে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ইজতেমা আয়োজনকে  নিয়ে এমন আশঙ্কার ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানাচ্ছে সবাই প্রশাসনকে।

জেলা তাবলীগ মারকাজের কাজ : 
তাবলীগ জামাতের জন্য বিখ্যাত ও কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কাকরাইল মসজিদ জেলা তাবলীগ মারকাজগুলোর দায়িত্ব ও কাজের ব্যাপারে ২০ এপ্রিল ২০০৯ সালে একটি নির্দেশনা প্রদান করেন। তাতে উল্লেখ করা হয় জেলা তাবলীগ মারকাজের অধীন ওই জেলার সকল ছোট মারকাজগুলো কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

ফতুল্লার নয়মাটিতে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ জেলা তাবলিগ মার্কাজ মসজিদ থেকে পুরো জেলায় তাবলিগের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হয়। জেলা মারকাজের অধীনে রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবো, মূড়াপাড়া, সোনাগায়ের বারদী, আড়াইহাজার বাজার সংলগ্ন এবং নগরীর আমলাপাড়া এলাকায় ছোট মারকাজ মসজিদ। তাবলীগ জামাতের এ পাঁচটি মারকাজ পয়েন্ট মসজিদে প্রতি মঙ্গলবার মাশোয়ারা (আলোচনা) এবং প্রতি বৃহস্পতিবার ‘সবগুজারি’ (রাত্রী যাপন) অনুষ্ঠিত হয়। আর নারায়ণগঞ্জ জেলা তাবলিগ মার্কাজ মসজিদ প্রতি সোমবার মাশোয়ারা অনুষ্ঠিত হয়। 

মাওলানা সা’দ পন্থীদের নারায়ণগঞ্জ জেলায় ইজতেমা স্থগিত প্রসঙ্গ : 

নারায়ণগঞ্জ জেলা ওলামা পরিষদের সভাপতি ও ডিআইটি মসজিদের খতীব মাওলানা আব্দুল আউয়াল জেলার সর্বস্তরের ওলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলায় ইজতেমা স্থগিত প্রসঙ্গে ২১ অক্টোবর পুলিশ সুপার বরাবর দেয়া আবেদনপত্র অনুসারে,  দাওয়াত ও তাবলীগের সমস্ত কার্যক্রম সবসময় হক্কানী ওলামায়ে কেরামের সহিহ কোরআন ও হাদীসের বয়ন এবং দিক নির্দেশনায় চলে আসছে। তারা বলেন, বাংলাদেশের টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা দেশ ও বিদেশের বিশিষ্ট মাশায়েখ ও ওলায়ামেগণ আলোচনা ও তাবলীগী কর্ম পদ্ধতি ধারণ করতঃ লাখো মুসলমানের ধর্ম পরায়নতা।

কিন্তু মাওলানা সাদ যিনি ভারতের নিজামুদ্দিনের একজন সূরা সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশের ওলামায়ে কেরাম এবং তাবলীগের মূল ধারার সাথীদের আপত্তির কারণে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মাওলানা সাদকে টঙ্গী বিশ্ব এজতেমায় না আসার ফয়সালা করেন। এবং সরকারের সম্মতিক্রমের ২০১৯ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ জানুয়ারি ও ২৫, ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি দ্বিতীয় ধাপ টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমার তারিখ নির্ধারণ করা হয়।  

বাংলাদেশ ওলামায়ে কেরাম ও তাবলীগের মূল ধারার সাথী এবং বাংলাদেশ সরকারের সম্মিলিত সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে মাওলানা সা’দ পন্থীরা নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার থানায় ২০১৮ সালের ২২, ২৩ ও ২৪ নভেম্বর ইজতেমা আয়োজন করার চেষ্টা করছে। এবং এটিকে নিয়ে অনেক বড় ধরণের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন। এর আগে জেলা তাবলিগ মার্কাজ মসজিদের শূরা সদস্যদের পক্ষে সিরাজ মিয়া, আবুল হাশিম, হোজায়ারা, ফজলুল হক জেলা পুলিশ সুপার বরাবর আবেদন করেন। 

আমলাপাড়া মার্কাজের সকল তাবলীগি কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত করা প্রসঙ্গ : 

জেলা তাবলীগ মার্কাজের সূরা সদস্যদের মতে, কয়েক বছর যাবত ভারতের দাওয়াত ও তাবলীগের একজন শুরা সদস্য মাওলানা সাদ কোরআন ও হাদিসের অপব্যাখ্যা এবং তাবলীগের ভেতরে মনগড়া নীতি প্রনয়নের জন্য ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দসহ সকল ওলামায়ে কেরামের এবং তাবলীগের সাথীসহ পুরা পৃথিবীর ওলামায়ে কেরামের ও তাবলীগ সাথীরা তাকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করেন। এই ধারবাহিকতায় তকো গত টঙ্গী ইজতেমার ময়দানেও বয়কট করা হয়।

সাদপন্থী কিছু ভক্ত নারায়ণগঞ্জ সদর আমলাপাড়া মার্কাজে তাদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য ১ নভেম্বর বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জ জেলা ওলামা পরিষদের সভাপতি ও ডিআইটি মসজিদের খতীব মাওলানা আব্দুল আউয়ালসহ আরো ওলামায়ে কেরাম ও তাবলীগের সাথীদের’কে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাসী কায়দায় হামলা করে। এমন ঘটনায় তাবলীগের সাথীদের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কা করেন তারা। 

ফলে নারায়ণগঞ্জ সদর আমলাপাড়া মার্কাজের সকল তাবলীগি কার্যক্রম স্থগিত রাখার অনুরোধ করেন তারা। এবং একই সাথে জেলা মার্কাজের তাবলীগের সূরা সদস্যদের সাথে পরামর্শ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনুরোধ জানান তারা।  এ ব্যাপারে ৩ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ জেলা তাবলিগ মার্কাজের শুরার পক্ষে সিরাজ মিয়া আবেদন করেন।