বুধবার   ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪   ফাল্গুন ৮ ১৪৩০

আলোচনায় ভাই-বোনের ভালোবাসা

রাকিবুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২০ জানুয়ারি ২০২৪  

 

নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দুই পরিবারের চমক প্রদ ইতিহাস রয়েছে। এই দুই পরিবারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ভাবেও আওয়ামী লীগ দুই মেরুতে বিভক্ত। যদিও বর্তমানে তাদের মাঝে ঐক্যের বন্ধন গড়ে উঠেছে। আর এতে করে নগরবাসী ইতিবাচক নারায়ণগঞ্জ গড়ার যে স্বপ্ন তা বাস্তবায়নের জন্য সহজতর মনে করছে।

 

দুই পরিবারের কর্তারা হলেন, ওসমান পরিবারের সদস্য নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। বিপরীতে রয়েছে চুনকা পরিবারের সদস্য নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তারা তিন জনই এই ধণী জেলার আলোচিত ব্যক্তি। এই তিন ব্যক্তিই বর্তমানে হ্যাট্রিক জনপ্রতিনিধি হিসেবে নিজ নিজ এলাকায় নির্বাচিত হয়ে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তারা তিন জনই টানা তিনবার নির্বাচিত হওয়ায় তাদেরকে হ্যাট্রিক জনপ্রতিনিধি বলেন।

 

এদিকে সদ্য অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনের আগে এবং পরে বিভিন্ন সময় দুই পরিবারের কর্ণধারকে একই প্রোগ্রামের এক টেবিলে দেখা গেছে। এমনকি বৃহস্পতিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র আইভীর সাথে সাক্ষাৎ করেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি সেলিম ওসমান। যদিও দীর্ঘ দিন যাবৎ সাংসদ সেলিম ওসমান বলে আসছেন তিনি এবং মেয়র আইভী এক টেবিলে বসলে নারায়ণগঞ্জের সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। নগরবাসীও মনে করেন তারা এক হলে এই শহরের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে। তবে তারা কতটুকু উন্নয়ন ঘটাতে পারে সেদিকে তাকিয়ে রয়েছে নগরবাসী।

 

অপরদিকে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমান অনুসারীদের উত্তর মেরু হিসেবে চিনেন দলীয় নেতা কর্মীরা। বিপরীতে মেয়র আইভী সমর্থকদের দক্ষিন মেরুর বলয় হিসেবে চিনেন। তবে এখন দুই মেরুই এক কাতারে বসেছে। ওসমান পরিবারের অন্যতম সদস্য টানা তিনবারের এমপি নির্বাচিত এমপি শামীম ওসমান ১৯৯৬ সালে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হন।

 

সাংসদ নির্বাচিত হয়েই নারায়ণগঞ্জের সবচেয়ে ভয়ংকর রাজনীতিবিদের তকমা লাগে তার গায়ে। তখন তাকে গডফাদার তকমা দেয়া হয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে এক কথায় বলতে গেলে প্রায় পুরো নারায়ণগঞ্জ ছিল তার করায়ত্তে। তিনি তখন এমপি নারায়ণগঞ্জের টানবাজারের পতিতালয় উচ্ছেদ করে সারাদেশে আলোচনায় আসেন। সেই সাথে মানুষের প্রশংসা অর্জন করেন।

 

২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবির পর শামীম ওসমান প্রথমে ভারতে পালিয়ে যান। সেখান থেকে তিনি যান কানাডায়। পরবর্তিতে ২০০৬ সালে ফিরে এসে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবির্ভূত হলেও ২০০৭ সালের ওয়ান ইলেভেনের পট পরিবর্তনে আগের দিন তিনি দেশত্যাগ করেন। ফিরে আসেন ২০০৯ সালের এপ্রিলে। ততদিনে তার দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জের মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তার পক্ষে কাজ করলেও সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হতে হন তিনি।

 

কিন্তু শামীম ওসমানের বিরোধিতার কারণে মেয়র পদে থেকেও প্রথম মেয়াদে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলতে হয় আইভীকে। পরবতির্তে ২০১৪ সালের নির্বাচনে অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরীকে বাদ দিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে শামীম ওসমানকে মনোনয়ন দেয়। একতরফা এই নির্বাচনে এমপি হয়ে নারায়ণগঞ্জে নিজের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করেন শামীম ওসমান।

 

এর পতে আর তাকে পিছনে তাকাতে হয় নাই। ২০১৮ সনের নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থী প্রার্থী মনির হোসেন কাসেমীকে পরাজীত করে তিনি এমপি নির্বাচতি হন। সর্বশেষ ২০২৪ সনের ৭ জানুয়ারি নির্বাচনে ৩২ পার্সেন্ট ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। কিন্তু এত কম পার্সেন্ট ভোট পাওয়ায় নিজে খুশি হতে পারেন নাই। এতে করে টানা তিন বারের মত নির্বাচিত হয়ে হ্যাট্রিক এমপি হয়ে জনপ্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব পান।  

 

তাছাড়া ২০১৪ সনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের প্রয়াত এমপি নাসিম ওসমান আকস্মিক ভাবে মারা যান। পরে এই আসনে এস আকরামকে পরাজিত করে উপ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে সেলিম ওসমান এমপি নির্বাচিত হন। কিন্তু ২০১৬ সালের ১৩ মে সেলিম ওসমানের সামনে একজন প্রবীণ শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করায় তাকে বিতর্ক তৈরী হয়। সেই সাথে তখন এই সাংসদ সমালোচনায় পরেন।

 

সেখান থেকে তার জনপ্রতিনিধি হওয়ার যে ভাগ্য খুলে গেল সেই থেকে আজও পর্যন্ত তাকে পিছনে তাকাতে হয় নাই। ২০১৮ সনের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী এস এম আকরামকে পরাজিত করে তিনিই এমপি নির্বাচিত হন। সর্বশেষ টানা তিনবারের মত করে জয়ী হয়ে সেলিম ওসমানও হ্যাট্রিক এমপি হন।

 

অপরদিকে ওসমান পরিবার থেকে কোন অংশে পিছিয়ে নেই নাসিক মেয়র আইভী। তিনি আওয়ামী লীগের দলের রাজনীতিবিদ হয়েও বিএনপি সরকারের আমলে শহরের পৌর চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন। নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান আলী আহমেদ চুনকার মেয়ে আইভী চিকিৎসা শাস্ত্রের ডিগ্রি নিয়ে বিদেশে পড়াশোনায় ব্যস্ত ছিলেন। দেশে ফিরে ২ যুগ আগে রাজনীতিতে নামেন তিনি।
রাজনৈতিক জীবনের শুরুতেই তিনি ২০০৩ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। সেই থেকে তাকে আর পিছনে তাকাতে হয় নাই।

 

জানা যায়, ২০১১ সনে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ঘোষনা হওয়ার পর মেয়র আইভীর প্রথম দফায়  প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন নিজ দল আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমান। দ্বিতীয় দফায় ধানের শীষের প্রার্থী এড. সাখাওয়াত হোসেন খান। আর তৃতীয় দফায় বিএনপির বহিস্কৃত প্রবীণ নেতা বর্তমানে তৃনমূল বিএনপির মহাসচিব তৈমূর আলম খন্দকার। এভাবে বার বার প্রতিদ্বন্দ্বী বদলেছে তার। তবে ফলাফল একই থেকে গেছে।

 

আইভীর জয়ের পিছনে কারন হিসেবে নগরবাসী মনে করেন তিনি শহরের দখলদার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এমনকি কখনো কখনো দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে 'ন্যায্যতার প্রশ্নে' সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাছাড়া দৃশ্যমান অনেক উন্নয়নও করেছেন।

 

নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগে চুনকার সঙ্গে যে দ্বন্দ্ব ওসমানদের ছিল, তার জের চলতে থাকে আইভী-শামীম ওসমানের মধ্য দিয়ে। ২০১১ সালে পৌরসভা থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন হলে প্রথম ভোটে মেয়র পদে আইভীর প্রতিদ্বন্দ্বী হন শামীম ওসমান। দলীয় প্রতীকে ভোট না হলেও আওয়ামী লীগের সমর্থন ছিল শামীমের দিকে। তবে বিপক্ষ প্রার্থী হিসেবে নারায়ণগঞ্জ সিটির প্রথম ভোটে আইভী লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে হরিয়ে দেন শামীম ওসমানকে। এরপর ২০১৬ সালে দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে আইভী বিএনপি প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেনকে পরাজিত করেন।

 

সর্বশেষ ২০২২ সনের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৃতীয় নির্বাচনে আইভীর কাছে হার মানেন বিএনপি থেকে সদ্য অব্যাহতি পাওয়া প্রবীণ নেতা তৈমুর আলম খন্দকার। এই ভাবে ডা. সেলিনা হায়াত আইভীও টানা তিন বারের মত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়ে জনপ্রতিনিধেত্ব হ্যাট্রিক করেন।তারা তিন জনই হ্যাট্রিক জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। 

 

তবে নারায়ণগঞ্জে পরিবার কেন্দ্রিক রাজনীতি পরিহার করার আহ্বান জানান তাদেরই গুরু মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে শেখ হাসিনার রাজনীতি করতে দলীয় নেতা কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান। যা তিনি বিভিন্ন সভায় একাধিকবার বলে আসছেন। এস.এ/জেসি 
 

এই বিভাগের আরো খবর