শুক্রবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আশ্বিন ৫ ১৪২৬   ২০ মুহররম ১৪৪১

আমরা এ নাম দেখতে চাই না, এ ফটো দেখতে চাইনা : সেলিম ওসমান

প্রকাশিত: ১৬ আগস্ট ২০১৯  

স্টাফ রিপোর্টার (যুগের চিন্তা ২৪) : নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান বলেছেন, আমাদের যারা ক্ষতি করেছিল, সেখানে দেখা যায় একজনের ফটো লাগিয়ে একটা হল হয়ে পরে রয়েছে। আমি জেলা প্রশাসকের কাছে আনুরোধ রাখতে চাই, হল দিতে না পারেন, বিল্ডিং দিতে না পারেন, আমাকে মাঠ দেন। আমার বাচ্চারা যেন খেলাধুলা করতে পারে। আমরা যেন অনুষ্ঠান করতে পারি। আমরা মেলা করে দেখবেন এই বিল্ডিংয়ের টাকা উঠিয়ে দেব। 


জেলা প্রশাসককে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, চলেন আমার সাথে কোন মন্ত্রণালয় যেতে হবে। আমরা আর এ নাম দেখতে চাইনা। আমরা এই ফটোটা দেখতে চাইনা। আমরা এ নামটাকে পরিবর্তন করতে চাই। আমরা এটাকে একবার নাম দিয়েছিলাম টাউন হল, একবার নাম দিয়েছিলাম মুক্তিযোদ্ধা হল। যে নামই হোক। নাম না হলে দরকার নাই, টাউন হলই হবে। আমদের দায়িত্ব হবে এইটাকে ঠিক করে নেওয়া।


বৃহস্পতিবার (১৫ আগস্ট) জাতীয় শোক দিবস ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪ তম শাহাদাৎ বর্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নারায়ণগঞ্জ জেলা ইউনিটের উদ্যোগে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে আলোচনা, দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে চাষাড়ার জিয়া হলকে উদ্দেশ্য করে তিনি এসব কথা বলেন।


সেলিম ওসমান বলেন, ১৫ আগস্টের পরে আমরা জয় বাংলা বলতে সাহস পাইনি, অনেকেই  জয়বাংলা বলতে সাহস পায়নি। জয় বাংলাটা শুধুমাত্র মুক্তিযোদ্ধার সপ্নের জয়বাংলা। তারা দেশকে মুক্ত করেছেন। তারা সমস্ত শরীরের শক্তি সঞ্চয় করেছেন জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলে। বঙ্গবন্ধু কোনো দলের নয়, বঙ্গবন্ধু কোনো জাতের নয়, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জাতির জনক। 


তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশকে আমরা সোনার বাংলা গড়ার জন্য চেষ্ঠা করে যাচ্ছি। চেষ্টা এমনভাবে করছি সেই চেষ্টা হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেনো উন্নত হয়ে আসে। ওরা যেন সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে। আমদের মত অর্ধ শিক্ষিত হয়ে যেন দেশের দায়িত্ব না নেয়। তাদেরকে শিক্ষাগ্রহণ করানোর জন্য আমরা অত্যাধুনিকভাবে স্কুল, কলেজ নির্মাণ করছি। তাদের পরিবেশের প্রয়োজন। এই পরিবেশ গড়ার জন্য আমরা কাজ করছি।


জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একদিন এখানে মুক্তিযোদ্ধা ভবন হবে এটা আমরা কেই চিন্তা করতে পারিনি। আপনদের নিশ্চয় মনে আছে আমি একলা এখানে আসছিলাম। এখানে একটা অবৈধ রেস্টুরেন্ট ছিলো। আমি বলেছিলাম আপনাদের মামলা দিতে হলে তাহলে যেন আমার নামেই মামলা হয়। আমর জায়গা উদ্ধার করেছি।


তিনি আরও উল্লেখ করেন, এরপর আপনারা জানেন নৌ মন্ত্রী এখানে একটা জায়গা দখল করে রেখেছিলেন।  নৌ মন্ত্রীকে দিয়ে সেই জায়গাটাকে আমরা অবমুক্ত করেছি। এখানে আমরা আজকে জেলা মুক্তিযোদ্ধা ভবন তৈরি করতে পেরেছি। তারপরেও আমাকে অনেকে অনেকভাবে দোষী করেন রেগুলার আসিনা, সময়মতে আসিনা। 


তাঁর শারীরিক অবস্থার কথা উল্লেখ করে সেলিম ওসমান বলেন, বিগত সাত মাস কী গেছে আমার জীবনে আমি বলে বুঝাতে পারবোনা। আজকেও আমি ভীষণ বড় অসুস্থ। আজকে আমার এখানে প্রোগ্রাম করার কথা না। শুধু মোহাম্মদ আলী সাহেবের ধমকে আমি আজকে এখানে এসে পৌঁছেছি। আসলে আপনাদের সাথেই আমি থাকবো, আপনাদের সাথেই আমি আছি। 

 

তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর কাছে লাখো কোটি শুকরিয়া জানাতে পারি। নদীর এপার এবং ওপার মুক্তিযোদ্ধা ভবন। ওপারের ভবন প্রায় সম্পন্ন। এ জায়টার প্রতি আমাদের একটু নেগলেছি আছে। জেলা প্রসাশক সাহেব আপনার কাছে বিণীত অনুরোধ রাখলাম নিচে আমদের কয়েকটা দোকান ভাড়া দিতে হবে। দেতলাটা খালি আছে। আপনারা যদি সম্মতি দেন তাহলে দোতলাটা আমার কর্যালয় হিসেবে ভাড়া নিতে রজি আছি। যে ভাড়া আপনারা সিদ্ধান্ত দেন দেব। কারণ বন্দর এবং এপার মিলিয়ে এজায়গাটা আমার জন্য খুব ভালো হবে। তাহলে আমি মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে থাকতে পারবো। ওটা কোনো দলীয় কার্যালয় হিসেবে নয়, শুধুমাত্র আমার কার্যালয় হিসেবে, সংসদ সদস্যের কর্যালয় হিসেবে থাকবে।


তিনি আরও বলেন, ভাড়ার জন্য যে এডভান্স নেবেন তা দিয়ে যেন এ ভবনের উপরে টিনসে করা হয়। আমরা যেন এ অনুষ্ঠানগুলো ওখানে করতে পারি। আপনি থাকতে থাকতে কাটা হোক। আপনি (জেলা প্রশাসক ) মাঝে মাঝে আসবেন। সন্ধ্যার পরে বোস কেবিন থেকে চপ খাওয়ায় জন্য। দেখবেন মুক্তিযোদ্ধারা কীভাবে ভাগাভাগি করে খায়।


মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা ও সুযোগ সুবিধার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের জন্য একটা ভাতার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এ ভাতার এগেনেস্টে যেকোনো মুক্তিযোদ্ধা দু’লক্ষ টাকা লোন নিতে পারে।এট অনেকেই হয়তো জানেননা। এই আলোচনাগুলো আমাদেতর করতে হবে। আমাদের আয় বাড়াতে হবে।


অতীত জীবনের কথা স্মরণ করে সেলিম ওসমান বলেন, মুক্তিযোদ্ধা সেলিম ওসমান আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। পঁচাত্তরের পরের সেলিম ওসমান, কোনো ওসমান পরিবারের সেলিম ওসমান নয়। যাকে দেখেছেন নারায়ণগঞ্জ থেকে চৌমুহোনী পর্যন্ত গাড়ি চালাতে, বায়তুল মোকাররমের সামনে মুরগি বিক্রি করতে, মোহনগঞ্জ থেকে এই পাঁচ নম্বর ঘাটে মাছ এনে বিক্রি করতে। 


উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা হাত পাতেনা, মুক্তিযোদ্ধারা মাথানত করেনা। আপনারা মাথানত করবেননা আপনারা হাত পাতবেননা। আপনদের ব্যবস্থা আমরা করবো। আপনদের বন্দোবস্ত আমরা করবো।


প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ রেখে  সেলিম ওসমান বলেন, আমাদের বয়স ষাটের উপরে হয়ে গেছে। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রেিক বলতে চাই, প্রতিবছর আমাদের মুক্তিযোদ্ধা কমছে। আর মুক্তিযোদ্ধাদের যে বরাদ্দ তা ফেরত যাচ্ছে। আমরা যারা বেঁচে আছি তাদের ভাতা যেনো বৃদ্ধি পায় সে বন্দোবস্ত করার জন্য আমি আবেদন করছি। সেটা যেনো কমে না যায় । আমি মরে গেলে আমার ভাতা যেনো ফেরত না যায়। আমার পরিবারের সদস্যরা যেন পায়।


তিনি আরও বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রজন্ম আছে। তাদের ছেলে-মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করতে যেনো কোনো ধরনের সমস্যা না হয় । আমরা সে ব্যবস্থা করবো। আমরাই কররো আমরাই পারবো। আমরা সম্মিলিতভাবে এটা করবো।


নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি খালেদ হায়াদার খান কাজলকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আজকে আপনাদের সামনে দু’জন অতিথি নিয়ে আসছি। একজন হলেন নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল।যিনি আমাদেরকে সবগুলে কাজে সহযোগিতা করেন। ওনার কেনো দল নাই । ওনার কোনো জাত নাই। উনি সবার সাথে আছেন। মানুষের উপকার করতে ভালোবাসেন। ওনার বাবার সাথে উনি যত জীবন কাটিয়েছেন তার চেয়ে বেশি জীবন কাটিয়েছেন আমার সাথে। আর মুক্তিযোদ্ধা বলতেই উনি অন্ধ। তাকে যে নির্দেশনা দেয়া হয় এর প্রত্যেকটা অনুষ্ঠান তিনি করেন।


বিকেএমইএ এর প্রথম সহসভাপতি মনসুর আহম্মেদকে উদ্দেশ্য করে সেলিম ওসমান বলেন, আরেকজন আমার ছোট বেলার বন্ধু। বর্তমানে বিকেএমই এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে আছেন। আসার সময় বলতেছিলেন সিড়ি দিয়ে তিনতলায় ওঠা যায়না। আমি বললাম আজকেই আপনি ঘোষণা দিয়ে যাবেন, মুক্তিযোদ্ধা ভবনে আপনাদের নিজস্ব ফান্ড থেকে একটা লিফট দেবেন। মুক্তিযোদ্ধাদের যেন কষ্ট না হয়। আমরা চেয়েছি। হয় লিফট দিবেন না হয় অনুদান দেবেন।


নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্য ফকিরটোলা মসজিদের কথা উল্লেক করে তিনি বলেন,  আজকে ফকিরটোলা মসজিদের ঈমাম সাহেবের সাথে কথা বলেছি। নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস যদি জানতে চান তাহলে এটা হলো নারায়ণগঞ্জের প্রথম মসজিদ। মুক্তিযুদ্ধের সময় এখানে প্রথম গুলি করা হয়েছিল। ফকির টোলা মসজিদকে নারায়ণগঞ্জের মসজিত হিসেবে সম্মান দিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। কয়একজন লোকের কারণে এ মসজিটা হতে পারছেনা। দলমত নির্বিশেষে এই মসজিত যেন অত্যন্ত সুন্দরভাবে হয়, সে বন্দোবস্ত করতে হবে। 


নারায়ণগঞ্জ থেকে দেশের সমগ্র আন্দোলনের সূত্রপাত উল্লেখ করে সেলিম ওসমান বলেন, সমগ্র আন্দোলনের সূত্রপাত কিন্তু এ নারায়ণগঞ্জ থেকে। ভাষা আন্দোলন বলেন, আর স্বাধীনতার যুদ্ধ বলেন। প্রথম ডিক্লারেশনগুলো কিন্তু নারায়ণগঞ্জ থেকে হয়েছে। প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ আমাদের মাসদাইর গোরস্থানের এখানে হয়।


এ সময় উপস্থিত ছিলেন, জেলা প্রশাসক মো.জসিম উদ্দিন, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার মোহাম্মদ আলী, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি খালেদ হায়াদার খান কাজল, বিকেএমইএ এর প্রথম সহ সভাপতি মনসুর আহম্মেদ প্রমুখ।

এই বিভাগের আরো খবর