শুক্রবার   ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪   ফাল্গুন ১০ ১৪৩০

আজমেরীর রাজনীতির ভবিষ্যৎ ধোঁয়াশায়

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ২৩ জানুয়ারি ২০২৪  

 

একেএম নাসিম ওসমান। জননন্দিত খান সাহেব ওসমান আলীর নাতি তিনি। সেই সাথে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ভাষা সৈনিক একেএম শামসুজোহার বড় ছেলেও নাসিম ওসমান। ১৯৫৩ সালের ৩১ জুলাই নাসিম ওসমান তাঁর মা মা নাগিনা জোহার কোল আলোকিত করে জন্ম গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর ছেলে শেখ কামালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের সকলের সাথে হত্যা করা হয়।

 

তার আগের দিন ১৪ আগস্ট তিনি পারভীন ওসমানকে বিয়ে করেন। বিয়েতে বঙ্গবন্ধুর পুত্র শেখ কামালও উপস্থিত ছিলেন। ১৫ আগস্ট স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলে, নাসিম ওসমান নবপত্নীকে ফেলে হত্যার প্রতিশোধ নিতে চলে যান। তিনি ঢাকায় প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এরপর তিনি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর বাহিনীতে যোগ দেন। এরপর তিনি আবার ভারতে চলে যান এবং সেখানে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেন।

 

তৎকালীন কাদের বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন নাসিম ওসমান। প্রথমে আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও পরবর্তীতে তিনি জাতীয় পার্টির রাজনীতির সাথে নিজেকে জড়িয়ে নেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির হয়ে ১৯৮৬, ১৯৮৮, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এক কথায় গণ মানুষের নেতা বলতে যা বুঝায় তা নাসিম ওসমানের মধ্যে বিদ্যমান ছিলো। জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্যদের পদও তিনি পেয়েছিলেন।

 

নাসিম ওসমানের তিন সন্তানের মধ্যে আজমেরী ওসমান বড় সন্তান। ২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল নাসিম ওসমান ভারতে একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে একটি নক্ষত্রের পতন হয়েছিলো। নাসিম ওসমানের মৃত্যুর পর নারায়ণগঞ্জে জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে অনেকটা ছন্দ পতন ঘটে। যদিও তাঁরই ছোটো ভাই সেলিম ওসমান নারায়ণগঞ্জে জাতীয় পার্টির হাল ধরেছেন। তবে নাসিম ওসমানের মতো তিনি দলকে তেমন ঘুছাতে পারেননি।  

 

নাসিম ওসমানের স্ত্রী পারভীন ওসমান চেয়েছিলেন স্বামীর আসন থেকে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করতে। কিন্তু পারভীন ওসমান পারিবারিক চাঁপে আর সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। জাতীয় পার্টির অনেক নেতাকর্মী আশা করেছিলেন প্রয়াত নাসিম ওসমানের পুত্র আজমেরী ওসমান রাজনীতিতে আসবেন। কিন্তু না, তিনি রাজনীতিতে তেমনভাবে সক্রিয় নন। তবে ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, সদর ও বন্দরে তাঁর রয়েছে কয়েক হাজার সমর্থক। অনেকের চোখে সেই সমর্থকরা ‘বাহিনী’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে।

 

রাজনীতির মাঠে আজমেরীকে তেমন সরব দেখা যায় না। এবারের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বিরোধী দলের ডাকা হরতালে বেশ কয়েকদিন শোডাউন করেছিলেন। জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের ব্যাপারে আজমেরী ওসমানকে তেমনভাবে সক্রিয় হতেও দেখা যায় না। রাজনীতির মাঠে আজমেরী ওসমান একেবারেই নীরব। তবে তাঁর অন্যান্য কার্যক্রম নিয়ে জেলা ব্যাপী যেমন আলোচনা রয়েছে তেমনি রয়েছে সমালোচনাও।

 

ভবিষৎতে আজমেরী ওসমানের রাজনীতি কোনদিকে যাবে তা এখনো ধোঁয়াশার মধ্যেই রয়ে গেছে। জেলায় ওসমান পরিবারের এই চতুর্থ পুরুষের রাজনীতির অবস্থান কোনদিকে যাবে এ নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক। বাবার রাজনীতিতে নিজেকে কতোটা জড়িয়ে নিতে পারবেন তা নিয়েও জাতীয় পার্টির মধ্যে রয়েছে নানা দ্বিধাদ্বন্দ্ব। এমন মন্তব্য খোদ জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের।

 

নারায়ণগঞ্জের আওয়ামীলীগে ওসমান পরিবরের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। তবে জাতীয় পার্টির রাজনীতিতেও নাসিম ওসমানের কারণেও এই পরিবারের গ্রহনযোগ্যতা রয়েছে জেলায়। নাসিম ওসমানের রেখে যাওয়া জেলায় জাতীয় পার্টি আর আগের মতো নেই বললেই চলে।

 

জেলা ও থানা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ বলেন, নাসিম ওসমানের পর নারায়ণগঞ্জে যে সেলিম ওসমানকে আমরা পেয়েছি। তিনি মূলত একজন ব্যবসায়ী। বড় ভাই নাসিম ওসমানের মতো তিনি রাজনীতিতে অতোটা পরিপক্ক নয়। নাসিম ওসমানের স্ত্রী পারভীন ওসমানও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য। তবে তিনি জেলায় মূল দলের হাল ধরতে পারেনি এখনো। তার সন্তান আজমেরী ওসমান দলীয় কোনো কর্মকান্ডে তেমন একটা অংশ গ্রহণ করেন না।

 

তাছাড়া জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা দিনেতো দূরের কথা রাতেও আজমেরীর সাথে দেখা করার সুযোগ পান না। তাকে ঘিরে থাকা বলয়ের কারণে কেউ সহজে আজমেরীর ধারে কাছেও ঘেষতে পারে না। একটি বলয় দ্বারা সব সময় তিনি আবদ্ধ থাকেন। সড়কে কোনো কারনে বের হলেও ঐ বলয়ের কারনে সাধারণ মানুষ তাঁর সাথে কথা বলার সুযোগও পাননা। ওসমান পরিবারের চতুর্থ প্রজন্ম আজমেরীকে অনেকে বেপরোয়া হিসেবেও মনে করেন।

 

তাঁর এ বেপরোয়া স্বভাবের কারণে নাসিম ওসমানের অনেক ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা তার কাছে যাননা বলেও জানিয়েছেন জাতীয় পার্টি ও আওয়ামীলীগের বেশ কয়েকজন প্রবীন নেতাকর্মী। ভবিষ্যতে আজমেরী রাজনীতিতে কতোটা সাইন করতে পারবেন তা নিয়েও আশংকা রয়েছে অনেকের।

 

আজমেরী ওসমানকে অনেকে যুবরাজ বলে থাকেন। বাবা নাসিম ওসমানের দেখানো পথে তিনি কতোটা হাটতে পারবেন এ নিয়েও রয়েছে নানা আলোচনা। ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, সদর ও বন্দর এলাকায় আজমেরী ওসমানের রয়েছে বিশাল সমর্থক। এই সমর্থকরা উল্লেখিত এলাকায় তাঁর নাম ভাঙ্গিয়ে করে থাকে নানা অপকর্ম। এজন্য খবরে অনেক সময় আজমেরী ওসমানের সমর্থকরা শিরোনাম হন।

 

এলাকাভিত্তিক বিতর্কিত অনেকেই আজমেরীর লোক হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। যারা তার নাম ভাঙ্গিয়ে অপকর্ম করে থাকে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে তাকে দেখা যায় না। বরং ঐ সমস্ত লোকজনদের কেউ কিছু বললে তিনি উল্টো প্রদিবাদকারীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেন বলেও অভিযোগ রয়েছে বিস্তর।

 

এ ব্যাপারে ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, সদর ও বন্দরের আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা বলেন, আসলে আজমেরী না আওয়ামী লীগের, না জাতীয় পার্টির। তার স্টাইলটাই ভিন্ন। তিনি সরাসরি কোনো দলের হয়ে কাজ করেন না। চাচা শামীম ওসমান, সেলিম ওসমানের আশির্বাদ রয়েছে তাঁর উপর। এস.এ/জেসি  

এই বিভাগের আরো খবর