শাপলা বেচে জীবন চলে ৩০০ পরিবারের

প্রকাশিত: ১৯:০৮, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১

শাপলা বেচে জীবন চলে ৩০০ পরিবারের

গাজীপুরের কাপাসিয়া ও শ্রীপুর উপজেলায় বেশ কয়েকটি বিল রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে এসব বিল ও পারুলী নদী থেকে শাপলা তুলে জীবিকা নির্বাহ করে আশপাশের অন্তত ৩০০ পরিবার। সাদা শাপলা স্থানীয় বাজারগুলোতে খাদ্য উপকরণ হিসেবে বিক্রি হয়। আর বিশেষ উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করে ঢাকায় পাঠানো হয় লাল শাপলা। দুই উপজেলার নলগাঁও, প্রহলাদপুর, ডুমনী ও লক্ষ্মীপুর গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, বাড়ির পাশে বাঁশের আড়ায় কাঁচা শাপলা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। গ্রামের রাস্তায় ও বাড়ির উঠানে রোদে শুকাতে দেওয়া হয়েছে ছোট ছোট করে কাটা শাপলা। আর প্রক্রিয়াজাত শুকনো শাপলাগুলো বড় ব্যাগে ভর্তি করে বসতঘরে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। লক্ষ্মীপুর গ্রামের গৃহিণী অঞ্জনা দাস বলেন, চার হাজার টাকায় একটি নৌকা আছে তার। শাপলা তুলে বিক্রি করে প্রতি মৌসুমে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন। দুই ছেলের পড়াশোনার খরচসহ সংসারের অন্য খরচও চলে শাপলা বিক্রির টাকায়। বিলের জায়গা মালিকানা থাকলেও শাপলা তুলে বাধা নেই একই গ্রামের দিপালী রানী জানান, নৌকা দিয়ে নদী থেকে শাপলা তুলে রোদে শুকিয়ে বিক্রি করেন। ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজিতে শাপলা বিক্রি হয়। তবে বৃষ্টিতে ভিজে বা পচে গেলে দাম কমে যায়।গৃহিণী আশানন্দ রানী বলেন, নৌকা না থাকলে বিল থেকে শাপলা উঠাতে দীর্ঘ সময় পানিতে থাকতে হয়। এতে চুলকানিসহ নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। একটা করে বাছাই করে শাপলা তুলতে হয়। বৃষ্টি হলে পচে যায়। গত বছর সর্বোচ্চ ১২০ টাকা কেজি দরে ১৬০ কেজি শাপলা বিক্রি করেছিলেন তিনি। রীনা রানী বলেন, তার স্বামী ও ছেলে ভোর থেকে বিলে শাপলা উঠানো শুরু করে। একটা নৌকা পর্যায়ক্রমে একাধিক পরিবার ব্যবহার করেন। শুকনো শাপলা সর্বোচ্চ ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। ১০ বছর ধরে শাপলা বিক্রি করে আসছেন তারা। শাপলা তুলে বিক্রিযোগ্য করতে কমপক্ষে পাঁচদিন সময় লাগে তিনি আরও বলেন, এলাকায় উঁচু মাঠ-ঘাট না থাকায় রাস্তায় রোদে শুকাতে হয়। অনেক সময় বাঁশ বেঁধে তার ওপর আঁটি ঝুলিয়ে রোদে শুকাতে দেন। একজন নারী প্রতি মৌসুমে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। ময়লা ফুলের দাম কম। সক্ষমতা অনুযায়ী পাঁচ থেকে ৩০ মন পর্যন্ত সংগ্রহ করতে পারেন একেক জন। বিলের জায়গা মালিকানা থাকলেও শাপলা উঠাতে বাধা দেয় না কেউ। নলগাঁও গ্রামের গৃহিণী শেফালী রানী বলেন, কমপক্ষে চার মাস পর্যন্ত শাপলা সংগ্রহ করতে পারেন। আবহাওয়া ভালো থাকলে শাপলা কেটে রোদে শুকাতে বিক্রিযোগ্য করতে কমপক্ষে পাঁচদিন সময় লাগে। বিলে পানি থাকে যতদিন শাপলা পাওয়া যায় ততদিন। প্রহলাদপুরের কৃষক লিটন দাস বলেন, গত ১০ বছর ধরে এসব এলাকায় লাল শাপলা সংগ্রহ ও বিক্রি করা হচ্ছে। সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত একজন ব্যক্তি অনেকগুলো শাপলা সংগ্রহ করতে পারেন। সেগুলো শুকানোর পর কমপক্ষে পাঁচ কেজি হয়। সাধারণত পুরুষরা শাপলা সংগ্রহ করেন। শুকানোর কাজ করেন নারীরা। মাস দেড়েক পর পর ঢাকা থেকে লোকজন এসে ট্রাকযোগে শুকনো শাপলা নিয়ে যাবে। বর্তমানে শাপলা ফুলের বাজারমূল্য বেশি হওয়ায় এলাকার প্রায় সবাই সংগ্রহের কাজ করে তোলার পর বৃষ্টিতে ভিজে বা পচে গেলে শাপলার দাম কমে যায় চতর বাজারের সবজি বিক্রেতা আব্দুল কাদির (৫৬) জানান, এক কেজির আঁটি সাদা শাপলা প্রতি মুড়ি (আঁটি) সাত টাকায় কিনে ১০ টাকায় বিক্রি করেন। একদিন পর পর স্থানীয়রা শাপলা তুলে বাজারে নিয়ে আসেন। ক্ষেত্র মোহন মন্ডল (৯০) জানান, তিনিই প্রথম শাপলা সংগ্রহ ও বিক্রি শুরু করেন। শুকনো শাপলা পাইকাররা ওষুধ বানানোর জন্য বাড়ি থেকে এসে কিনে নিয়ে যায়। তিনি এক মণ আট হাজার টাকায় বিক্রি করেন। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে শাপলা বিক্রি করেন সংগ্রহকারীরা শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এ এস এম মুয়ীদুল হাসান বলেন, পারুলী নদী ও পাশের বিলগুলোতে বর্ষাকালে প্রচুর শাপলা ফোটে। গত প্রায় ১০ বছর ধরে এলাকার শত শত পরিবার শাপলা ফুল বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। ঔষধি উপাদান হিসেবে ব্যবহার হওয়ায় চাহিদা বেড়েছে শাপলার। তিনি আরও বলেন, সংগ্রহকারীরা ঢাকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে শাপলা বিক্রি করেন। সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি শাপলা এখন ফুলের বিপরীতে জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।