জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট দুর্যোগের কারণে শিক্ষা কার্যক্রম পিছিয়ে পড়ছে

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট দুর্যোগের কারণে শিক্ষা কার্যক্রম পিছিয়ে পড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৫:০৮, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১

আপডেট: ১২:৪২, ৭ এপ্রিল ২০২১

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট দুর্যোগের কারণে  শিক্ষা কার্যক্রম  পিছিয়ে পড়ছে

ছবি: সংগৃহিত

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলা পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থী আবির হোসাইন। বছরের অধিকাংশ সময় নির্বিঘ্নে বিদ্যালয়ে যেতে পারে না এ শিক্ষার্থী। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টিসহ নানা দুর্যোগে চলাচলের রাস্তা কোমর পানিতে তলিয়ে যায়। এতে কার্যদিবসের প্রায় অর্ধেক দিনই বিদ্যালয়ে যাওয়া হয় না তার। আবার কখনো যেতে পারলেও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে পাঠদান হয় না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট দুর্যোগের কারণে এভাবে শিক্ষা কার্যক্রমে পিছিয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন স্থানের শিক্ষার্থীরা। জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর পড়ালেখায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

চলতি মাসের শুরুতে ‘রাইজিং টু দ্য চ্যালেঞ্জ ইয়ুথ পারসপেকটিভ অন ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এডুকেশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রকাশ করে ইউনিসেফ। বাংলাদেশের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৫ হাজার ৫৮৬ শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। তাদের মধ্যে ৫১ শতাংশের বয়স ছিল ১৫ থেকে ১৯ বছর ও ৪৯ শতাংশের বয়স ছিল ২০ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৬০ শতাংশ গ্রামের ও ৪০ শতাংশ শহরের বাসিন্দা।

ইউনিসেফের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পড়ালেখায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের। জরিপে অংশ নেয়া ৭৮ শতাংশ নেতিবাচক এ প্রভাবের কথা জানিয়েছে। ২৩ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত যেতে না পারার কথা বলেছে। উপস্থিতি ও প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা চালিয়ে নিতে পরিবারের অক্ষমতা রয়েছে ১৮ শতাংশের ক্ষেত্রে। এছাড়াও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অবকাঠামো সুবিধা ভেঙে পড়া, শিক্ষকদের অনুপস্থিতি ও অন্যান্য সমস্যার সৃষ্টি হয়। এসব কারণে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ছে বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ।

জরিপে অংশ নেয়া এক শিক্ষার্থী জানায়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছর তার এলাকায় অনেক বন্যা হয়। এতে স্থানীয় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠ ডুবে যায়। কোনো কোনো সময় স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও ডুবে যায়। তখনো সেখানে ক্লাস করা সম্ভব হয় না। বেশির ভাগ শিক্ষার্থী স্কুল-কলেজে অনিয়মিত হয়ে পড়ে। অনেকে লেখাপড়া বন্ধ করতে বাধ্য হয়। দরিদ্ররা আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রামের শিক্ষার্থীরা বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তাদের বই-খাতা পর্যন্ত ভেসে যাচ্ছে। ২০০৭ সালে স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনা করে একাডেমিক ক্যালেন্ডার করা হলেও পরে তা আর আলোর মুখে দেখেনি। শিক্ষার্থীরা যেন ঝরে না পড়ে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্যালেন্ডারসহ আরো বেশকিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। আর নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে।’

জরিপে বলা হয়, দেশের ৭০ শতাংশ কিশোর-তরুণ জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। যার মধ্যে ৪৫ শতাংশ খুব বেশি উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা দুশ্চিন্তার কথা জানিয়েছে। বিভিন্ন তরুণের মতো সদ্য উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পার করা রওশন জাদিদ রাফি জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে উদ্বেগের কথা জানায়। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যের ক্ষতির বিষয়টিও উদ্বেগজনক।

গত বছরের জুনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য এবং পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) বলছে, ২০১৯ সালে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ৪৯২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১ হাজার ৪৭৭টি জুনিয়র মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১৩ হাজার ৬০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৯৬৮টি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ২ হাজার ৪৮৭টি কলেজ এবং ৬ হাজার ৯৭৭টি মাদ্রাসা ক্ষতির মধ্যে পড়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়মিত উপস্থিতির হার বাড়ছে। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, পরিবারের স্থানান্তর, শিক্ষা উপকরণের ক্ষতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফি পরিশোধে অক্ষমতা, বাড়ির কাজে বাবা-মাকে সাহায্য করা, উপার্জনে নেমে পড়া, ভবিষ্যৎ পড়াশোনার বিষয়ে উদাসীনতা, স্কুলে নিরাপত্তা বোধ না করা, যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি অনিয়মিত হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে শিক্ষকদের উপস্থিতিও বিভিন্নভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

শিক্ষার সঙ্গে স্বাস্থ্যেরও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কোনো এলাকায় পানি বেশি হবে, কোনো এলাকায় পানি কম হবে। কৃষির ক্ষতি হচ্ছে। এর প্রভাব পশুপাখির ওপরও পড়ছে। খাদ্যের অপর্যাপ্ততা দেখা দিচ্ছে। দুর্যোগে মানুষ সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নিচ্ছে। ছোট জায়গায় একসঙ্গে অনেক বেশি মানুষ থাকার কারণে পানিবাহিত রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। চর্মরোগ, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়াচ্ছে। পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ঠিক রাখা যাচ্ছে না। এতে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরামর্শক ডা. মুশতাক হোসেন।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তন এক বড় ধরনের সমস্যা বলে উল্লেখ করেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত। তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে খাদ্যের ঘাটতি। এ সংকট প্রকট। দিন দিন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে। স্কুলের বাচ্চারা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন রাতারাতি রোধ করা সম্ভব না। তবে আমরা পরিবেশবান্ধব নীতি নির্ধারণ করে কিছুটা ঠিক রাখতে পারি। স্কুলের বাচ্চারাও যেন ক্ষতির মুখে না পড়ে, এজন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া দরকার।’

মূলত আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, শ্রীলংকার ১০ ভাষাভাষীর ওপর জরিপটি চালানো হয়। এতে ২৫ হাজার ৮২৬ জন অংশগ্রহণ করে। গত বছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে তথ্য ও প্রযুক্তি ব্যবহার তারা ইউনিসেফকে তথ্য দেয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, ‘দেশের দক্ষিণাঞ্চলে এর প্রভাব বেশি। তবে আমাদের যথেষ্ট গবেষণা নেই। বিশদ গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।’

দুর্যোগের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যাহত হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দেশের সব স্থানের দুর্যোগ ও আবহাওয়া এক নয়। স্থানভেদে দুর্যোগ ভিন্ন হয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দুর্যোগ হয়। এজন্য দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একসঙ্গে বন্ধ হবে ও একসঙ্গে খুলতে হবে—এমনটি জরুরি নয়। রাজধানীর স্কুল বন্ধের সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুল বন্ধ হওয়ার সম্পর্ক নেই।’