মঙ্গলবার   ২৬ মে ২০২০   জ্যৈষ্ঠ ১১ ১৪২৭   ০৩ শাওয়াল ১৪৪১

গ্রামে ফিরতে লুকোচুরি

ইমতিয়াজ আহমেদ

যুগের চিন্তা

প্রকাশিত : ০৬:১৮ পিএম, ২১ মে ২০২০ বৃহস্পতিবার

অভিনব কৌশলে ঈদে ঘুরমুখি মানুষ ফিরছে গ্রামের বাড়ি।  মহাসড়কে চলছে পুলিশের সাথে লুকোচুরি। চেকপোস্টে গাড়ি আটকে দেয়ায় ঘরমুখি লোকজন কৌশলে চেকপোস্ট পার হচ্ছে। পিকআপ, বড় বা মিনি ট্রাকে চড়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ডে বা চিটাগাং রোড মোড়ে আসার পর পুলিশ গাড়ি আটকে দেয়।

 

পুলিশের চোখ এড়াতে ঘরমুখি মানুষ বোঝাই পিকআপ, ট্রাক থামে চেকপোস্টের একটু আগে। সেখানে লোকজন নেমে যায়। পিকআপ কিম্বা ট্রাকটি খালি হয়। মানুষগুলো হেঁটে পথচারীদের মত চেকপোস্ট পার হয়। খালি পিকআপ, ট্রাকটিও চেকপোস্ট পার হয়। রাস্তার অপর পাশের চেকপোস্টটি পার হয়ে কিছু দূরে ওই গাড়িগুলো থেমে থাকে।

 

এরপর পায়ে হেঁটে চেকপোস্ট পার হওয়া মানুষগুলো একেএকে আবার পিকআপ, ট্রাকে চড়ে গ্রামে ফিরে। শেষ মূহুর্তে মানুষ মরিয়া হয়ে উঠেছে। যে কোন উপায়ে যে কোন কৌশলে ফিরছে গ্রামের বাড়ি। পরিবার-পরিজনকে গ্রামে পৌঁছে দিয়ে গৃহকর্তা আবার ফিরছেন নারায়ণগঞ্জে বা রাজধানী ঢাকায়। ব্যবসা বা চাকুরী যাই করেন না কেনো গৃহকর্তা গ্রামের পথ ধরবেন চাঁদ রাতে।

 

পুলিশসহ আইনশৃংখলা বাহিনী মহাসড়কগুলোতে মানুষের চলাচল ঠেকাতে কঠোর ভূমিকা পালন করছেন। তারা দিনরাত চেষ্টা করছেন গ্রামমুখি মানুষের মিছিল ঠেকাতে। একই সাথে নারায়ণগঞ্জ জেলায় প্রবেশমুখেও গ্রাম থেকে ফিরে আসা মানুষকে আটকে দিয়ে পূণরায় গ্রামে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ পুলিশসুপার মো: জায়েদুল আলম যুগের চিন্তাকে বলেন, মহাসড়কে আমাদের ১০টি চেকপোস্ট রয়েছে।

 

তাছাড়া প্রতিটি থানায় এন্ট্রি ও এক্সিট পয়েন্টে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবুও মানুষ আসছে। মহাসড়কগুলোতে পুলিশের তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের উপর দিয়ে কোন গাড়ি যেতে দেয়া হচ্ছেনা। মানুষ অনেক কৌশল শিখে গেছে। পুলিশ বাহিনী তৎপর কিন্তু মানুষ বেপরোয়া। মানছেনা স্বাস্থ্যবিধি। পরিস্থিতি খারাপের দিকে চলে যাবে। 

 

একাধিক সূত্রে জানাগেছে, আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দোকানপাট, মার্কেট ও শপিংমলে ক্রেতা-বিক্রেতাদের স্বাস্থ্যবিধি না মানা, শহর থেকে অসংখ্য মানুষের গ্রামে ছুটে যাওয়া এবং সামাজিক দূরত্ব পালন না করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

 

দোকানপাট, মার্কেট ও শপিংমলে ক্রেতা-বিক্রেতাদের স্বাস্থ্যবিধি না মানা, শহর থেকে অসংখ্য মানুষের গ্রামে ছুটে যাওয়া এবং সামাজিক দূরত্ব পালন না করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।


এ কারণে করোনা সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন অবস্থায় ঈদের আগে ও পরে অন্তত সাত দিন মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণে রুদ্রমূর্তিতে থাকবেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত ও সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকার ঘোষিত নির্দেশনা বাস্তবায়নে পুলিশ সম্ভাব্য সব চেষ্টা অব্যাহত রাখবে।

 

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন শহর থেকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ যাতে অন্যত্র যেতে না পারে, সে জন্য গ্রহণ করা হয়েছে বাড়তি নজরদারি, বাড়ানো হয়েছে টহল। শহরের প্রবেশপথে কঠোর নজরদারি করছে আইনশৃংখলা বাহিনী।


১৫ শর্তে চলমান সাধারণ ছুটির মেয়াদ ৩০ মে পর্যন্ত বাড়িয়ে আদেশ জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ১৪ মে সপ্তম দফায় বাড়ানো এ ছুটির আদেশে বলা হয়েছে- সাধারণ ছুটি ও নিষেধাজ্ঞাকালে কেউ কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারবেন না। এ সময়ে সড়কপথে গণপরিবহন, যাত্রীবাহী নৌযান ও রেল চলাচল এবং অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচল বন্ধ থাকবে। মহাসড়কে জরুরি সেবায় নিয়োজিত যানবাহন (মালবাহী) ছাড়া অন্যান্য যানবাহন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।


খোলা মাঠে বা উন্মুক্ত স্থানে আসন্ন ঈদের নামাজের বড় জামাত পরিহার করতে হবে। মানতে হবে স্বাস্থ্য বিভাগের স্বাস্থ্যবিধি। তবে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি। গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও নানা কৌশলে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে প্রবেশ ও বাহির হচ্ছেন অনেকেই। শপিংমলগুলোয়ও বালাই নেই স্বাস্থ্যবিধির। এতে বেড়েই চলছে করোনা সংক্রমণ।


এ বিষয়ে অধ্যাপক ডা. শাহরিয়ার নবী গণমাধ্যমকে বলেন, যত ‘মুভমেন্ট’ হবে, ততই সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়বে। তাই রাজধানী ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আগামী ঈদে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কারণ গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও মানুষ কিন্তু ঠিকই নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকায় আসছে, বেরও হচ্ছে। ফলে আশঙ্কা করছি, আগামী ঈদকে কেন্দ্র করে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। সেটি করতে না পারলে বড় বিপদ হতে পারে।


এ বিষয়ে একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকার ঘোষিত নির্দেশনা বাস্তবায়নে সব ধরনের চেষ্টাই থাকবে। এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে, সেগুলো হল- জরুরি প্রয়োজন ছাড়া যাতে কেউ স্থান ত্যাগ করতে না পারে, সামাজিক দূরত্ব বজায়ের নির্দেশনা যাতে পালন করা হয়, অপ্রয়োজনে কেউ বাইরে ঘোরাঘুরি না করে এবং সর্বোপরি সীমিতভাবে ঈদ পালন করা হয়।


তিনি বলেন, ঈদকে ঘিরে সংক্রমণ প্রতিরোধে পুলিশ সর্বতোভাবে চেষ্টা করবে। ‘প্যাট্রোল’ বাড়ানো হবে। পাশাপাশি জনগণকে সচেতন করতে ধর্মীয় ব্যক্তিদের সহায়তা নেয়া হচ্ছে। যেহেতু সাধারণ মানুষ তাদের কথা শোনে। ইতোমধ্যে আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এসব বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।


এদিকে, ঈদকে সামনে রেখে মহামারী করোনা ভাইরাস রোধে রোববার থেকে ঢাকা মহানগরীতে প্রবেশ ও বের হওয়া নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর হয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। চেকপোস্ট ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। যাতে কোনো ব্যক্তি একান্ত জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত ঢাকা শহরে প্রবেশ বা ঢাকা শহর থেকে বের হতে না পারেন সেজন্য এমন সিদ্ধান্ত। যথোপযুক্ত কারণ ব্যতীত কোনো যানবাহন চলাচল করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।


সূত্রমতে, করোনার কারণে সরকার প্রথমে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করে। সেই সঙ্গে সারা দেশে সব ধরনের যানবাহন চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। সবাইকে নিজ বাড়িতে অবস্থান (লকডাউন) করতে বলা হয়। এরপর সেই ছুটির মেয়াদ কয়েক দফায় বাড়িয়ে ১৬ মে পর্যন্ত করা হয়। তবে এর মধ্যে কিছু বিধিনিষেধ তুলে নেয়া হয়।

 

ঘর থেকে বের হওয়ার সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানোর পাশাপাশি বিপণিবিতান ও দোকানপাট খোলার অনুমতি দেয়া হয়। একই সঙ্গে পোশাক কারখানা চালু হয়। এখন মসজিদে জামাতে নামাজও পড়া যাচ্ছে। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টার ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে ১ এপ্রিল থেকে নির্ধারিত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষাও স্থগিত হয়ে গেছে।