সোমবার   ৩০ মার্চ ২০২০   চৈত্র ১৬ ১৪২৬   ০৫ শা'বান ১৪৪১

থমথমে নারায়ণগঞ্জ উদ্বিগ্ন মানুষ

যুগের চিন্তা

প্রকাশিত : ১০:৪৫ এএম, ২১ মার্চ ২০২০ শনিবার

যুগের চিন্তা রিপোর্ট : নারায়ণগঞ্জে করোনা ভাইরাস আতঙ্ক বিরাজ করছে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত প্রাণঘাতি এই রোগে একজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে দেশে সর্বপ্রথম করোনা আক্রান্ত সন্দেহে সনাক্ত তিনরোগীর মধ্যে দুইজনই ছিল নারায়ণগঞ্জে। 


শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত জেলায় ৭৩ জনকে হোম কোয়ারান্টাইনে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ইমতিয়াজ।  চলতিমাসের গত ১৪ দিনে পঁাঁচ হাজারেরও বেশি প্রবাসী জেলায় ফিরেছেন। প্রবাসীদের বাধ্যতামূলক চৌদ্দ দিনের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলা হয়েছে।


বিশাল সংখ্যক প্রবাসী জেলায় ফিরলেও কোয়ারেন্টাইনে থাকার সংখ্যায় বিশাল ফারাক থাকায় মানুষের মাঝে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সরকার, জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও উপজেলা প্রশাসন থেকে করোনা মোকাবেলায় নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।  


সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও নানা প্রচারণাতেও মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে। করোনায় একজনের মৃত্যুর খবরের পরপরই সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক বেশি তৈরি হয়েছে। তবে সবাইকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্কতা রক্ষার পরামর্শ দিচ্ছেন প্রশাসন।  কেউ প্রশাসনের সতর্ক বাণী শুণছেন না। মানুষ বাজারে ছুটছে। বেশি বেশি করে কিনছে  নিত্যপণ্য। 


হঠাৎ কয়েকগুণ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অসাধু ব্যবসায়ীচক্র জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে মুনাফা লোটার ধান্দায় লিপ্ত হয়েছে। নগরীর বড় বড় পাইকারীবাজার গুলো পরিদর্শনে এমন চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। প্রতিদিনই বাড়ছে চাল, সয়াবিন তেল, পিয়াজ, আলুসহ অন্যান্য জিনিসপত্রের দাম। 


সবমিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরী হয়েছে আতঙ্ক। এখনি এই অবস্থা। করোনার প্রকোপ বাড়লে পরিস্থিতি কি হবে ! দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবেতো। সরকার কি বাজার মনিটরিং করে মূল্য সন্ত্রাসীদের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে পারবে।  


সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ইমতিয়াজ বলেন, ‘করোনা প্রতিরোধে সবাইকে ভীড় পরিহার করতে হবে। সড়কে চলাচলের সময় মাস্ক ব্যবহার করতে হবে, একে অন্যের সাথে পর্যাপ্ত দুরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। প্রবাসী কেউ আসার পর যদি হোম কোয়ারেন্টাইন না মানে তবে সিভিল সার্জন কিংবা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের জানান। 


হোম কোয়ারেন্টাইন মানছেন না এমন কাউকে পেলেই জরিমানা আদায় করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ৬ জনকে সর্বমোট ৪০ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে এবং ১৭ দিন করে  হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে। ’

তবে তা অগ্রাহ্য করে অনেকে শহরের ফুটপাতে বসার চেষ্টা করলেও র‌্যাব-১১’র পক্ষ থেকেও টানা দুইদিন অভিযান চালানো হয়েছে। যদিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে। তারপরেও গোপনে কয়েক জায়গায় কোচিং সেন্টার চালু রাখায় অভিযান চালিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।


সরকারি নির্দেশ অমান্য করে শিক্ষার্থীদের কোচিং করানোয় শহরের কলেজরোড এলাকার পড়ার ঘর, শফিক স্যারের কোচিং সেন্টার এবং ইউনাইটেড আইটি কোচিং সেন্টারে অভিযান পরিচালনার পর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)  নাহিদা বারিক জানান, ‘নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কোচিং সেন্টারে শিক্ষার্থীদের কোচিং করিয়ে আসছিলো এমন অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা এর সত্যতা পেয়েছি এবং জরিমানা করেছি। 


জেলায় যারা এখনো সরকারি নির্দেশ অমান্য করেও কোচিং সেন্টার চালু রেখেছেন পর্যায়ক্রমে তাদের বিরুদ্ধেও জেল জরিমানাসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’


বাজারে হঠাৎ করেই চালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে এরপরেও নানা জায়গায় বেশি দামে পণ্যদ্রব্য বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তবে এই দাম বাড়ার পেছনে ক্রেতাদেরই দুষছেন অনেকে। 

করোনা আতঙ্কে অনেকে বস্তায় বস্তায় চাল নিজ বাড়িতে নিয়ে রাখছেন, এছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বেশি করে পণ্য কেনায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। এই সুযোগে মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরাও পণ্যদ্রব্যের দাম বাড়িয়ে নিচ্ছেন। 


অবশ্য জেলা প্রশাসনসহ সব জায়গা থেকেই আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।  এছাড়া সড়কে প্রয়োজন ছাড়া ঘোরাফেরা করতে বারণ করছে প্রশাসন।


র‌্যাব-১১’র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলেপ উদ্দিন বলেন, চাষাঢ়া শহীদ মিনার, বঙ্গবন্ধু সড়ক, কালীবাজার, শায়েস্তা খাঁন রোড, সিরাজউদৌলা রোডের আশপাশের ফুটপাতে  যাতে ভীড় না জমে আমরা অভিযান চালিয়ে সতর্ক করছি। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে হকার এবং বিভিন্ন ফুটপাতে ভাসমান দোকানগুলোকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বসতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। 


এছাড়া দেশের বর্তমান করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে জনবহুল স্থানগুলোতে আসতে বারণ করছি আমরা। খুব প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া কাউকে রাস্তায় বা উম্মুক্ত স্থানগুলোতে ঘুরাঘুরি না করার আহবান জানাচ্ছি আমরা। 


আজও প্রয়োজন ছাড়া রাস্তায় ঘুরাঘুরি করায় পাঁচজনকে আটক করা হয়। পরে তারা প্রয়োজন ছাড়া রাস্তায়  ঘোরাফেরা করবেনা এই শর্তে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। মোটকথা সচেতনতার কোন বিকল্প নেই।


এদিকে, করোনার প্রভাব পড়েছে নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ীক খাতেও। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল খ্যাত নারায়ণগঞ্জের পোশাক শিল্পে এর প্রভাব পড়েছে। নারায়ণগঞ্জের  পোশাক তৈরির মালিকরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি যেভাবে এগোচ্ছে তাতে এই খাত মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। 


ইতিমধ্যেই কয়েক কোটি ডলারের রফতানি আদেশ বাতিল হয়েছে বলে জানিয়েছেন পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, বিদেশি ক্রেতাদের কেউ ই- মেইল করে রফতানি আদেশ বাতিল করছেন, কেউ স্থগিত করছেন। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে নতুন রফতানি আদেশ না দেওয়ার কথা জানাচ্ছেন।


বিকেএমইএ’র প্রথম সহ-সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ পঞ্চবটি বিসিক মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘আমার পোল্যান্ডের এক  ক্রেতা প্রতিষ্ঠান দু’দফার রফতানি আদেশ বাতিল করেছে। এরমধ্যে একটি আদেশ ছিল ২ লাখ ২০ হাজার ডলারের। আরেকটি আদেশ ছিল ২ লাখ ডলারের। 


তিনি জানান, করোনার কারণে এখন প্রতিদিন, প্রতি ঘণ্টায় রফতানি আদেশ বাতিল বা স্থগিতের মেইল পাচ্ছেন গার্মেন্ট মালিকরা।এ অবস্থায় সরকার যদি আমাদের পাশে না দাঁড়ায় তাহলে আমরা মারা পড়বো।’


করেনা আতঙ্কে জেলায় গণপরিবহণের সংখ্যাও কমে গেছে। শহরের বিভিন্ন সড়ক সাধারণ দিনের তুলনায় তুলনামূলক লোকসমাগমও ছিল কম। তবে রিক্সা ও অটোরিক্সা ছিল, তবে তা সংখ্যায় অন্যান্য দিনের চেয়ে কম।


তবে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় বেশি ‘আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী’সহ বেশ কয়েকটি সংগঠন সবাইকে সচেতন করছেন। শহরেরর বিভিন্ন জায়গায় হাত-ধোঁয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া বিনামূল্যে মাস্ক বিতরণ করছেন অনেকে। 


নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ ১৩নং ওয়ার্ডবাসীর জন্য দুই হাজার বোতল হ্যান্ড স্যানিটাইজার প্রস্তুত করে বিতরণ করছেন। পাশাপাশি আরও পাঁচ হাজার বোতল হ্যান্ড স্যানিটাইজার প্রস্তুত করে বিতরণের প্রক্রিয়া চলছে জানান তিনি। 


এরকম আরো বেশ কয়েকটি সংগঠন উদ্যোগ নিচ্ছেন। শহরের মানুষের মধ্যে করোনা নিয়ে বেশ সতর্কাবস্থা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।