সোমবার   ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ২৪ ১৪২৬   ১১ রবিউস সানি ১৪৪১

ডিসবাবুর ছেলের যেভাবে জামিন পাওয়া

যুগের চিন্তা

প্রকাশিত : ০৪:৪৩ পিএম, ৩১ অক্টোবর ২০১৯ বৃহস্পতিবার

যুগের চিন্তা রিপোর্ট : টানা ১৬ দিন পর শ্রীঘরে থাকার পর জামিন পেয়েছেন ১৭নং ওয়ার্ডের বির্তকিত কাউন্সিলর আব্দুল করিম বাবু ওরফে ডিসবাবুর ছেলে এমআরকে রিয়েন। বৃহস্পতিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান মাসুমের ডিজিটাল আইনে দায়ের করার মামলায় জেলা ও দায়রা জজ আদালতে জামিনের আবেদন করেন রিয়েনের আইনজীবীরা।

 

সকাল ১১টার দিকে দীর্ঘ শুনানির পর জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ আনিসুর রহমান বাদী (মাহবুবুর রহমান মাসুমের) জিম্মায় জামিন প্রদান করেন। এসময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন রিয়েন। প্রায় ৪০০ আইনজীবী এই মামলার শুনানি চলাকালে এজলাসে উপস্থিত ছিলেন। তারা এমামলার শুনানিতে নানা ঘটনাকে নারায়ণগঞ্জ আদালতের একটি নজিরবিহীন মামলা বলে মন্তব্য করেন।

 

শুনানির সময় এজলাসে উপস্থিত আইনজীবীরা জানান,  জেলা ও দায়রা জজের আদালত কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামির উদ্দেশ্যে বলেন, মামলার বাদী একজন সম্মানিত এবং গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি। তিনি জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজেও সংশ্লিষ্ট থাকেন। আপনার (আসামি) মতো বাচ্চা ছেলে এমন একজন সম্মানিত ব্যক্তির সম্মানহানি করতে পারেননা। আদালত আসামিকে কাঠগড়া থেকে বেড়িয়ে পায়ে ধরে মাফ চাইতে বলেন, এবং বলতে বলেন, আমি যে কাজটি করেছি, সেটি সঠিক করিনি। এসময় কাঠগড়ার বাইরে থাকা পুলিশ সদস্যরা গেট খুলে দিয়ে সরে দাঁড়ান। আসামি রিয়েন বাদী মাহবুবুর রহমান মাসুমের পা ধরে ক্ষমা চান। আদালতে উপস্থিত আসামির বাবা আব্দুল করিম বাবুও বাদীর কাছে মাফ চান।

 

পায়ে ধরা মাফ চাওয়ার সময় আসামি রিয়েনের আইনজীবী এড.খোকন সাহা রিয়েনের গালে ৩/৪টি চড় মারেন এবং বলেন ইঁচড়ে পাকা ছেলে, মুরুব্বিদের সাথে বেয়াদবি করো। মাফ চাও এবং আর কখনো এমন করবেনা বলো। এজলাসে উপস্থিত শত শত আইনজীবীর সামনেই আসামি রিয়েন বাদী মাহবুবুর রহমান মাসুমের পায়ে ধরে মাফ চান। এবং আসামির বাবাও বাদীর কাছে মাফ চান।  

 

কিন্তু এরপরেও বাদীপক্ষের আইনজীবী সাবেক পিপি এড.আসাদুজ্জামান জামিনের বিরোধীতা করে আদালতকে বলেন, বাদী একজন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। তার সম্মানহানি করে এই আসামি যদি জামিন পান তবে তরুণরা মুরুব্বিদের সম্মান করতে অনুৎসাহিত হবে। আসামির জামিন নামঞ্জুর করার জন্য আবেদন জানাই।

 

এসময় আসামি পক্ষের আইনজীবী বলেন, যেহুতু আসামি তার ভুল স্বীকার করেছেন এবং ভবিষ্যতে আর কখনো এমন ধরণের কোন কাজ করবেনা বলে শপথ করেছে তাই তাকে জামিন দেয়া হোক।

 

রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁশুলি (পিপি) ওয়াজেদ আলী খোকন বলেন, এই আসামিকে জামিন দিয়ে ছেড়ে দেওয়ার কোন কারণে নেই। যতক্ষণ না পর্যন্ত বাদী  সন্তুষ্ট না হন।

 

এসময় জেলা ও দায়রা জজ আদালত জামিনের আদেশ প্রদান করেন। এবং বাদীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এই আসামিকে আপনার জিম্মায় জামিন দিলাম। আসামি যদি জামিনে বেরিয়ে আবারো কোন কটুক্তি কিংবা অন্যায় আচরণ করে তবে সেটি আপনি আদালতকে জানাবেন। সাথে সাথে আদালত তার জামিন বাতিল করে দিবে। মামলাটি চলমান অবস্থায় থাকবে।  

 

বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে শুনানিতে সাবেক পিপি আসাদুজ্জামান আসাদ, এড.আওলাদ হোসেন, এড. মোস্তাফিজুর রহমান ফারুক, শাহজাহান মোড়ল, আক্তার হোসেন, জিয়াউল ইসলাম কাজল, কামাল হোসেন এবং আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে এড.খোকন সাহা, জাকির হোসেন, বারী ভূঁইয়া, সাগরসহ ১৫/২০ জন শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন।

 

বাদী মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, আমি আইনের আশ্রয় নিয়েছি। বাদী হিসেবে আসামির জামিনের বিরুদ্ধে ছিলাম। কিন্তু আসামিকে আদালতের অন্যান্য আইনজীবীরা প্রকাশ্যে আমার পা ধরে ক্ষমা চাইছেন। সম্মানিত জজ সাহেব এবং অন্যান্য আইনজীবীরা যখন আমাকে মাফ করে দেয়ার বিষয়ে বললেন স্বাভাবিকভাবেই আমি সেটি মেনে নিয়েছি। তবে বিষয়টি নজিরবিহীন যা এর আগে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ঘটেনি।

 

এব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁশুলি (পিপি) ওয়াজে আলী খোকন বলেন, কোন বিত্তবান ঘরের ছেলেই হোক, আর রাজনীতিবিদের ছেলেই হোক না কেন একজন সম্মানিত ব্যক্তির সম্মানহানি ঘটাতে সে পারেনা। মানহানিকর কথাবার্তা রটিয়ে সম্মানি ব্যক্তির মানহানি করলে কি হয় তা এই মামলা উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এথেকে শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে আমাদের ছেলে মেয়েরা বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করবে, তাদের সম্মানহানি করার চেষ্টা কখনো করবেনা।

 

যারা উচ্ছৃঙ্খল হয়ে সম্মানিত ব্যক্তির সম্মানহানি করেন তাদের পরিণাম হবে জঘন্য। তবে বাদী একজন সুশিক্ষিত ও সম্মানিত ব্যক্তি বিধায় নিজের সন্তান মনে করে ক্ষমা প্রদর্শণ করেছেন। না হলে এই মামলায় আসামির জামিন পাবার কোন শক্ত গ্রাউন্ডস ছিলোনা। তার অপরাধের প্রমাণও সুস্পষ্ট। প্রকাশ্য আদালতে আসামি ও তার বাবা বাদীর কাছে ক্ষমা চাওয়ায় আদালত বাদীর জিম্মায় জামিন মঞ্জুর করেছেন। এই মামলা থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।

 

আসামিপক্ষের আইনজীবী খোকন সাহা বলেন, ‘মামলাটি যেহুতু তদন্তাধীন রয়েছে। তাই এবিষয়ে কোন মন্তব্য করতে পারবোনা।’

 

প্রসঙ্গত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আপত্তিকর ও অশালীন শব্দ ব্যবহার করে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতিকে হুমকি, ধমকি ও ভীতি প্রদর্শন করে স্ট্যাটাস দেয়ার অভিযোগে ১৫ অক্টোবর বাদী হয়ে মঙ্গলবার রাতে ডিজিটাল আইনে মামলাটি দায়ের করেন নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি এড.মাহবুবুর রহমান মাসুম এরপরপরই ওই দিন রাত ৯টার দিকে ডিসবাবুর পাইকপাড়ার বাসায় অভিযান চালিয়ে রিয়েনকে গ্রেপ্তার করে সদর মডেল থানার পুলিশ।

 

গত ১৩ অক্টোবর জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম বক্তব্যে বলেন, আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সবসময়ই ডিসি সাহেবরাই সভাপতি হতেন। কিন্তু  কোনো এক অদৃশ্য সূতার টানে কাউন্সিলর আব্দুল করিম বাবু, যাকে ডিস বাবু হিসেবে মানুষ চিনে সে সভাপতি হয়ে আছে। তার মতো একজন অপরাধী কীভাবে সে স্কুলের সভাপতি হয়?। তার এমন বক্তব্যে ক্ষুদ্ধ হন ডিস বাবুর ছেলে রিয়েন।

 

১৪ অক্টোবর তার ফেসবুক এ্যাকাউন্টের ‘মাই ডে’ স্টোরিতে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান মাসুমকে ‘রাজাকার পুত্র’, এমনকি জনতা ব্যাংকের টাকা আত্মসাতকারী হিসেবে উল্লেখ করে অশালীন মন্তব্য করেন। সেই সাথে মাসুমকে নারায়ণগঞ্জ থেকে তাড়িয়ে দেয়ার হুমকিও দেন রিয়েন। গ্রেপ্তার হবার পর টানা ১৬ দিন কারাভোগের পর জামিন পান রিয়েন।