স্বশিক্ষায় শিক্ষিত এক শিল্পীর জীবনকথা

প্রকাশিত: ২২:৩৭, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১

আপডেট: ১৪:৪৫, ৯ মার্চ ২০২১

স্বশিক্ষায় শিক্ষিত এক শিল্পীর জীবনকথা

ছবি: অগ্নিস্নান

চরহরিপুর গ্রামের তিনদিকেই নদী; বর্ষায় স্রোতে ভাসে। শুকনোয় ধু ধু আদিগন্ত নি:সীম। সে এক নিরাভরণ প্রকৃতি। যে নদের ছলাত-ছলাত সুর আড়ি-আড়ি ডাকত সেটি ঝিনাই। প্রতিদিন পাল উড়াত মাঝিরা। ঝিনাই আবার ব্রহ্মপুত্রের শাখা। বৈঠায় ঢেউ কাটত, বিচিত্র জাল ফেলে জেলে ধরতো মাছ। বর্ষায় প্রকৃতির ঢেউয়ে ভেসে ভেসে নিজের মতো করে নিজেস্ব এক আলপনা এঁকে চলেছেন কাদামাটির সন্তান নূর উদ্দিন আহম্মেদ লাভলু। 

ছবি আঁকেন গুলশানের আর্ট গ্যালারিতে। বিক্রিও সেখানে-ডিসিসি মার্কেটের দোতলায়। যেখানে দেশের প্রত্থিতযশা গুণীজনেরা বিক্রির জন্য ছবি রেখে আসেন। কিংবদন্তিতূল্য এসব শিল্পীদের না হয় শিক্ষা-সার্টিফিকেট আছে। কিন্তু নূর উদ্দিন লাভলুর কিছু নেই। মেট্রিক পরীক্ষা দেয়ার আগেই সংসারে হাল ধরতে হয়েছিল। চোখে দেখা প্রকৃতিই তাঁর পরম স্কুল, বাতাসের ঝিরিঝিরি, আকাশের রঙ যেনো তাঁর স্কুলের বই-খাতা। সুতরাং তাঁর দীক্ষাস্থল মনে-মননে, মস্তিষ্ক-ভাবনায়। আর অপরাপর শিল্পীদের স্নেহ, প্রেম তাঁর জন্য মানসিক প্রণোদনা। এই নিয়েই এগিয়ে চলছে স্কুলের গন্ডি পেরুনো নূর উদ্দিন লাভলু।

গুলশান দুইয়ের ডেকোরিয়াম গ্যালারির স্বত্বাধিকারী নূর উদ্দিন লাভলু। অনেকদিন ধরে ইয়ার্ট গ্যালারি মালিক ইয়াকুব আলীর সংস্পর্শে ছিলেন। সন্তানের মতো জড়িয়েছেন ভালোবাসায়-প্রেমে-অদৃশ্য বন্ধনে। ইয়ার্টের ইয়াকুব সাহেব মারা যাবার পর তাঁর স্ত্রী সালমা ইয়াকুব গ্যালারিটির দায়িত্বও দিয়ে রেখেছেন নূর উদ্দিনের উপর। অখ্যাত অজপাড়াগ্রাম থেকে আসা নূর উদ্দিন এখন আঁকেন বিচিত্র সব ছবি। যাতে প্রতিভাত হয় বাংলার অসীম সৌন্দর্য। বিদেশি ক্রেতাদের কাছে সবচেয়ে কদর পেয়েছে তাঁর আঁকা পুরণো ঢাকার বিচিত্র অবয়ব। যা বাস্তবের চেয়েও অতিবাস্তব। 

নারায়ণগঞ্জ আর্ট কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ বিখ্যাত শিল্পী সমীরণ চৌধুরী বলেন-‘চিত্রকরের জন্য পুঁথিগত শিক্ষার চেয়ে অধিবিদ্যা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। সেটি নূর উদ্দিন প্রমাণ করে দেখিয়ে দিলেন। কারণ পুরনো ঢাকার ছবি এতো হৃদয় দিয়ে, ভালোবেসে, জীবন্ত করে আগে কেউ এঁকেছে বলে মনে হয় না।’

নূর উদ্দিন লাভলুর বাড়ি জামালপুরের সরিষাবাড়ি উপজেলার চরহরিপুর গ্রামে। ছোটবেলার স্মৃতি হাতরে নূর উদ্দিন বলেন, আমার গাঁয়ের তিন পাশেই নদী। জলের স্রোতে ভেসে সাঁতার কাটা, সবুজ ধানখেত, শিশুদের উদ্দামতা, দামাল রাখালদের ছুটে চলা-সবই চোখে ভাসে। স্কুলে যাই, চারপাশ দেখি-বাড়িতে ফিরে পেন্সিল দিয়ে স্কেচ করি। কখনো আবার কালার কলমের ছোঁয়ায় আকাশের চাঁদটাকে রঙের মিশেল দেয়ার চেষ্টা করি। এভাবেই পরিচয় ছবির সাথে, আঁকার সাথে। 

বাড়ির কাছে একটি নদী আছে-নাম তার ঝাড়কাটা। আরও আছে চতলবিল। প্রকৃতি যেনো সবটুকু আমার জন্যই নিয়ে গিয়েছিল চরহরিপুরে গাঁয়ের আশপাশে। সন্ধ্যার পর গাঁয়ের সবাই ঘুমিয়ে পড়তো। ঝিঁঝিঁ ডাকত একনাগাড়ে। শেয়ালের দল হাঁকাত। কতো শত পাখির আনাগোনা পাড়ার ঝাড়ঝোপে। যমুনা, ব্রহ্মপুত্র থেকে পালক উড়িয়ে ছুটে আসতো নাম না জানা পাখির দল। দেখতাম আর ভাবতাম, নাম না জানা এ পাখিটার ছবি যদি আঁকতে পারতাম!

 

নূর উদ্দিন বলেন-‘বড় হতে থাকি আর দরিদ্র চাপতে থাকে। পড়লেখা একসময় নির্মম হয়ে ওঠে। আমার এক দুলাভাই ঢাকায় ছবির ফ্রেম করতেন। ডাক পড়লো সেখানে। এই আমার ঢাকায় আসা। ইঁট কংক্রিটের নগরে প্রথম পা ফেলা। 

১৯৯০ সালে ঢাকায় এসে তিন বছর পর হক আর্ট গ্যালারিতে চাকরি জোটে। সোলমাইদের বাসিন্দা হক সাহেব তাঁকে খুব আদর করতেন। শিল্পীদের কাছ থেকে ছবি কিনতেন আর বিক্রি করতেন। প্রতিদিন গুণীজনেরা আসেন হক গ্যালারিতে। দেখেন, শোনেন আর রং তুলির খবরাখবর নেন। 

ক্রমশ: তুলির আঁচরের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে। ফাল্গুন-চৈত্রের দুপুরগুলোতে খাবারের পর সবাই ঝিমোতেন। এই ফাঁকে নূর উদ্দিন তুলি আর ক্যানভাসের সঙ্গে গড়ে তোলেন সখ্যতা।  টেবিলে রাখা ফ্লাস্ক, টিফিন বাটি, থালাবাসন আর সন্ধ্যাবেলার প্রদীপ আঁকতেন নিমগ্ন হয়ে। অন্যদের শিল্পকর্মে তখন ফুটে উঠতো গ্রামীণ জীবন, কৃষক, আবহমান বাংলার বিপ্লব-বিদ্রোহ-সংগ্রাম আর প্রতিকূলতার প্রতিচ্ছবি। 

নূর উদ্দিনের জানা ছিল সাধক শিল্পী সুলতান সম্পর্কে। অভাবের তাড়নায় ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রাবস্থায় যিনি পাঁচ বছরের মাথায় পড়ালেখা ছেড়ে বাবার সঙ্গে রাজমিস্ত্রির কাজ ধরেছিলেন। দালানে দালানে ছবি আঁকার ভেতর দিয়েই বহি:প্রকাশ মহান এই কিংবদন্তির। মনের ভেতরে ভেতরে শিল্পী সুলতানকে প্রণতি জানান নূর উদ্দিন।

এভাবে ফ্রেম করতে করতেই ছবির ভুবনে হাতেখড়ি। একের পর এক পরিচয় ঘটতে থাকে বহু নামি-দামি শিল্পীদের সাথে। গুলশান ডিসিসি মার্কটের দোতলা তখন অনবদ্য-অনন্য শিল্পীদের আনাগোনা। এই সময়ে টানা আট বছর তিনি কাজ করেন হক আর্ট গ্যালারিতে। 

প্রফেশনালি ছবি আঁকা শুরু করেন ১৯৯৯ সালে। দিনভর গ্যালারিতে ছবি আাঁকার পর রাতভর বাসায় ফিরে তুলিতে রং বোলাতেন। ভোরে এক পশলা ঘুম দিয়ে আবার গুলশান গ্যালারিতে। এভাবেই চলতে থাকে বেশ ক’বছর। ২০০১ সালে ইয়ার্টের মালিক মারা যান। অতপর তাঁর স্ত্রী সালমা ইয়াকুব একটা বড় ধরণের সুযোগ করেন দেন নূর উদ্দিনকে। বহু দিনের বিশ্বস্ত নূরকে জায়গা করে দেন নিজের গ্যালারিতে। একপাশে ছবি আঁকতেন অপরপাশে ডিসপ্লে। 

এই সময়ের আগে-পরে শিল্পী নূর উদ্দিন আহম্মেদ লাভলু নিজের ছবি নিজের গ্যালারিতে রাখতে পারতেন না। শিল্পীদের মধ্যে কেউ কেউ তাকে হিংসা করতেন। বলতেন, ফ্রেম মিস্ত্রি থেকে এ্যামেচার। সে আবার চিত্রশিল্পী। তার ছবিও আবার গ্যালারিতে! জাত গেলো, জাত গেলো!! সময়ে অসময়ে ফোঁড়ন কাটতেন কেউ কেউ। তবে তা সংখ্যায় একেবারেই নগন্য।

২০০১ সালের শেষের দিকে একসাথে ৭টি ছবি গ্যালারি ইয়ার্টে জমা দেয়ার পর এক সপ্তাহের মধ্যে তা বিক্রি হয়ে যায়। এই ইয়ার্টের ইয়াকুব-সালমা দম্পতি তাঁর জীবন পাল্টে দিয়েছে বলে দাবি করেন নূর উদ্দিন। এভাবে ক্রমশ কদর বাড়লো স্বশিক্ষায় শিক্ষিত নূরউদ্দিনের। 

নূরউদ্দিন এখন বেশ ব্যস্ত শিল্পী। জামালপুরের সরিয়াবাড়ির নিভৃতগ্রাম চরহরিপুর থেকে ঢাকায় এসে তিনি এখন ডেকোরিয়াম গ্যালারির মালিক। গ্রাম থেকে ঢাকায়  এলেও তাঁর তুলি আঁচরে সবচেয়ে বেশি প্রতিভাত পুরোণ ঢাকার নানামাত্রিকতা। ঘিঞ্জি রাস্তা, তারের জট, সরু বিল্ডিং, মানুষের ভিঁড়ে এক অন্যরকম ঐতিহ্য। যেনো ৪০০ বছরের ঢাকা নতুন করে উদ্ভাসিত নূর উদ্দিনের রঙে। বিদেশিদের কাছে এই ছবির মর্যাদাও তাই অনেক। 

নূর উদ্দিন বলেন, ‘বাংলাদেশ নেভি, সেনাবাহিনী, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর এসব ছবির ক্রেতা। ’

নূরের স্ত্রী নাসরিন আক্তার কিরণ। তিনি শিল্পী নন। কিন্তু অসাধারণ ক্যানভাস করেন। মাঝেমধ্যে তুলির ছোঁয়াও দেন। ১৯৯৭ সালে বিয়ের পর কিরণ গ্রামেই ছিলেন। এখন অভাব ঘুচেছে। তাই তিন মেয়ে দুই ছেলেকে নিয়ে থাকেন ঢাকার বাড্ডা এলাকায়। বাচ্চারা সবাই পড়ালেখা করছে। বড় মেয়েরাও মায়ের সঙ্গে ক্যানভাস রেডি করতে পারে। 

কথাপ্রসঙ্গে নূর উদ্দিন বলেন, তার তুলিতে সবচেয়ে ভালো খেলে অয়েল পেইন্টিং, ফিগারেটিভ, ওয়াটার কালার। এ্যাবস্ট্রাক্ট হয়, তবে অনেক সময় মনের মতো হয়ে ওঠে না। এ্যাক্রেলিক তার ভালোবাসার পরম আধার।  এ যাবৎ ৩৫০০ মতো ছবি বিক্রি করেছেন। এর বেশিই পুরোণ ঢাকা। কেনো যেনো নূর উদ্দিনের আঁকা ওল্ড ঢাকা সবার নজর কাড়ে। সাম্পতিক কিছু রিয়েলিস্টিক আঁকছেন। এদেশের মানুষ ফিগারেটিভ খুব বেশি পছন্দ করেনা বলেই মনে হয় তাঁর। তবে সবমিলে শীঘ্রই একটি প্রদর্শনী দেয়ার ইচ্ছে রয়েছে।

 নূর উদ্দিনের ছবির ক্রেতাদের অন্যতম গুলশানের বাসিন্দা আদনান হোসেন। কথাপ্রসঙ্গে বলেন, ‘আমার মা এন্টিক পছন্দ করেন। আমাদের বাড়ি ঢোকা থেকে হেঁসেল ঘর অব্দি বিভিন্ন ধরণের এন্টিক আর নূর উদ্দিনের ছবি দিয়ে ভরা। আমার পুরো পরিবার নূর উদ্দিনের ছবির ভক্ত। ওর নতুন কোন ছবি ভালো লাগলেই আমরা কিনি। অনেক ছবি পরিচিতজনদের  উপহার দিই। 

ব্যতিক্রমী এই শিল্পী সম্পর্কে বলতে গিয়ে অধ্যক্ষ সমীরণ চৌধুরী বলেন, ‘নূর উদ্দিন রঙের মিশেলটা বোঝে। ওর পড়ালেখার দৌড় নেই, তাই অহঙ্কারের লেশমাত্রও নেই। আমাদের মতো কিছু শিক্ষিত শিল্পী দেখি ওকে খুব হিংসে করে। আমি হাসি তাদের কপটতা দেখে। এবং কষ্ট পাই। আমার বিশ্বাস স্বশিক্ষায় শিক্ষিত শিল্পী নূর উদ্দিন একদিন সব মানুষের হৃদয় জয় করবে। সেদিন বোদ্ধা শিল্পীরাও ওকে বুকে টেনে নিবে।’

শিল্পী নূর উদ্দিন বলেন, ‘আমি মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিকে গুরুত্ব দেই, শ্রদ্ধা করি, ভালোবাসি।’

লেখক- অখিল পোদ্দার, হেড অব ইনপুট, একুশে টেলিভিশন লিমিটেড (ইটিভি)