খরচ অর্ধেক করে ইতিবাচক ফল পাচ্ছি: তানভীর এ মিশুক

প্রকাশিত: ০৭:২৬, ২০ এপ্রিল ২০২১

খরচ অর্ধেক করে ইতিবাচক ফল পাচ্ছি: তানভীর এ মিশুক

ডাক বিভাগের ডিজিটাল ফিন‌্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’।  সবার শেষে মার্কেটে আসা ‘নগদ’ সম্প্রতি গ্রাহকদের জন্য অন্যদের তুলনায় সর্বনিম্ন ক্যাশ আউট চার্জ ঘোষণা করে বাজারে বেশ তোলপাড় তুলেছে। এই নগদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে রয়েছেন তানভীর এ মিশুক।  তিনি দেশের সেরা তরুণ উদ্যোক্তাদের একজন।  তিনি শিক্ষা জীবন শেষ করেছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কর্মজীবনের শুরু থেকেই তিনি কাজ করছেন উদ্যোক্তা হিসেবে। নগদের গ্রাহকসেবা, ব্যাংকিং খাত, পুঁজিবাজারসহ দেশের সার্বিক অর্থনীতি নিয়ে সম্প্রতি রাইজিংবিডির সঙ্গে কথা হয়। কথোপকথনে ছিলেন রাইজিংবিডির জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেসবাহ য়াযাদ। 

রাইজিংবিডি: মোবাইল ফিন্যান্সিং সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবসায় আপনারা ছাড়াও বাজারে অনেক অপারেটর রয়েছে। তারপরও আপনারা এলেন কোন পরিকল্পনা নিয়ে?
তানভীর এ মিশুক: বাজারে অনেক এমএফএস অপারেটর থাকলেও শুরু থেকেই আমরা খেয়াল করেছি, গ্রাহকের চাহিদা তারা পূরণ করতে পারছেন না।  সব এমএফএস অপারেটর মূলত ডিজিটাল কুরিয়ার হিসেবে এক জায়গায় থেকে অন্য জায়গায় টাকা পাঠানোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। গ্রাহকসেবার ক্ষেত্রে নতুন কিছু নেই। তারপরও এমএফএস-এর ৩০টা লাইসেন্স ছিল। এখন এই সংখ্যা ১৫-তে নেমে এসেছে। লাইসেন্স থাকলেও সবাই কিন্তু ব্যবসা করতে পারছিল না।  সত্যিকার অর্থে মাত্র দুটি অপারেটরের কার্যক্রমই দেখা যাচ্ছিল। এই সব চিন্তা থেকেই আমরা বাজারে আসি। শুরু থেকেই সেবার ক্ষেত্রে অভিনবত্ব নিয়ে আসতে পেরেছি। এখন এমএফএস খাতের কথা এলে সেখানে ‘নগদ’-এর নাম আসবেই।


এছাড়া আমরা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছিলাম, যেটি আসলে কোনো ব্যাংক বা অন্য কোনো নন-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের পক্ষে  সম্ভব ছিল না। মূলত ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় এত বেশি যে, ছোট ছোট টিকিটের এই গ্রাহককে সেবা দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

রাইজিংবিডি: বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা মেনে অন্যরা যে চার্জ নিচ্ছিল, আপনারা তার অর্ধেক করে দিলেন। এরকম অসম প্রতিযোগিতায় গ্রাহকসেবার মান ধরে রাখতে পারবেন বলে মনে করেন?
তানভীর এ মিশুক: গ্রাহক সেবা-ই আমাদের মূল লক্ষ্য।  সেজন্যেই আমরা শুরু থেকে কাজ করছি।  সেন্ড মানি ফ্রি করে দেওয়া বা ক্যাশ আউট চার্জ প্রথমবারের মতো সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনাও সেই লক্ষ্য থেকেই করা। এছাড়া অন্যান্য সেবার বিল পরিশোধও ‘নগদ’-এ একেবারেই ফ্রি। যেখানে অন্যান্য এমএফএসগুলো সেবার বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে বাড়তি চার্জ করে থাকে।  সব অপারেটর যদি এক সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে ক্যাশ-আউটসহ অন্যান্য সেবার খরচ আরও কমিয়ে আনা সম্ভব। আমি প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলছি, ‘নগদ’-এর সেবার মান এখন যেমন সবার চেয়ে ভালো, সামনের দিনেও এমনটাই থাকবে। সেবার খরচ কমিয়ে দেওয়া মানে এমন নয় যে, তার জন্য সেবার মান খারাপ হয়ে যাবে।

রাইজিংবিডি: আগে মানুষ ডাক বিভাগের মানিঅর্ডারের মাধ্যমে টাকা পাঠাতো। তারপর এলো কুরিয়ার সার্ভিস। এখন তো অনেক প্রতিষ্ঠান। এতদিন পর কেন বাজারে এলেন?
তানভীর এ মিশুক: আসলে বাজার গবেষণার জন্যে আমারা একটু বেশি সময় নিয়েছি।  আমাদের লক্ষ্যই ছিল, সেরা সেবা নিয়ে আসা। এজন্য বাংলাদেশের বাজারের উপযোগী ও  সর্বাধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণেও বেশি সময় নিয়েছি।  তবে, বাজারে সেবা নিয়ে আসার পর এখন জোর গলায় বলতে পারি, আমাদের সেবাই সবচেয়ে বেশি কাজের।  আমরা ডিজরাপটিভ সেবা চালু করতে চেয়েছি।  যেন মোবাইল ফিন‌্যান্সিয়াল সেবাটা কেবল ডিজিটাল কুরিয়ারের মতো কাজ না করে। আমরা মনে করি, আমাদের পরিকল্পনায় আমরা সফলতার পথে হাঁটছি।


রাইজিংবিডি: চার্জ কমানো, অত্যধিক প্রচারণা, দেশজুড়ে পর্যাপ্ত এজেন্ট, গ্রাহকসেবার মান বাড়ানো,  এর মধ্যে সফলতা পেতে কোনটা বেশি কাজের বলে মনে করেন?
তানভীর এ মিশুক: এই সব উপাদানই আসলে সফলভাবে ব্যবসা চালিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে দরকার। কেউ কেউ মনে করতে পারেন, প্রচারণার পেছনে এত বেশি টাকা খরচ না করলেও চলে। এক্ষেত্রে দুটি উদাহরণ দিতে চাই। আমরাই বাংলাদেশের প্রথম কোম্পানি, যারা ডিটিজাল কেওয়াইসি চালু করি। একইসঙ্গে সেন্ড মানি টু এনে যে মোবাইলফোনে অ্যাকাউন্ট নেই, সেখানে টাকা পাঠানোর প্রযুক্তিও আমরা চালু করেছি।  আমাদের এই দুটি উদ্ভাবন নিয়ে শুরুতে অনেকে সমালোচনা করেছেন। এখন তারাই এই দুই সেবা নিজেরা চালু করেছেন। পাশাপাশি প্রচারের শক্তি ব্যবহার করে এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি করেছেন, যেন এগুলো তাদেরই উদ্ভাবন। এছাড়া চার্জ কমানো, দেশজুড়ে পর্যাপ্ত এজেন্ট থাকা বা গ্রাহকসেবার মান বাড়ানো এগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো নিশ্চিত না করতে পারলে কারও পক্ষেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। ‘নগদ’এগুলো নিশ্চত করেই বাজারে এসেছে।

রাইজিংবিডি: সবার শেষে বাজারে এসে, আপনারা কাশ আউটের চার্জ অন্যদের চেয়ে প্রায় ৫০ ভাগ কমিয়ে, বেশ আলোচিত হয়েছেন। এর প্রভাব অন্য কোম্পানিগুলোর ব্যবসায় পড়বে বলে মনে করেন?
তানভীর এ মিশুক: অন্যদের কী হবে, তা আমাদের পক্ষে বলা সম্ভব নয়।  তবে, আমরা খরচ কমানোর ইতিবাচক ফল পাচ্ছি।  সেবার খরচ কমানোর প্রথম ৫০ দিনেই অনেক ক্ষেত্রে আমাদের লেনদেনের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে।

রাইজিংবিডি: প্রতিযোগিতামূলক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে, শহর থেকে গ্রামে, সব জায়গায় এজেন্ট ও গ্রাহক বাড়াতে হবে। আপনাদের টার্গেট গ্রাহক কারা? চার্জ কমিয়ে দিয়ে তাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব বলে মনে করেন?
তানভীর এ মিশুক: বাংলাদেশের সব নাগরিকই আমাদের টার্গেট গ্রাহক। তাই, সব গ্রাহকের কথা বিবেচনা করে আমরা সেবার কলেবর বড় করছি।  সে কারণেই গ্রাম বা শহর সব জায়গায় আমরা সমান জনপ্রিয়। মূলত গ্রাহকবান্ধব সেবার কারণেই এখন প্রতিদিন হাজার হাজার গ্রাহক আমাদের নেটওয়ার্কে যুক্ত হচ্ছেন।


 
রাইজিংবিডি: অতীতে দেখেছি, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো (রেল, বিআরটিসি, বিমান, টেলকো, ডাকবিভাগ) প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সেবার মান নিয়ে পাল্লা দিয়ে টিকতে পারেনি। পূর্ব-অভিজ্ঞতার আলোকে নগদ নিয়ে আপনারা বাজারে টিকে থাকার সম্ভাবনা কতটা বলে মনে করেন?
তানভীর এ মিশুক: আপনি সরকারি যে সংস্থাগুলোর নাম বললেন, তারা ঠিক কী কারণে সফল হয়নি, তা আমি বলতে চাই না। বরং সরকারি সেবা হয়েও ‘নগদ’ কেন গ্রাহকদের ভালোবাসা পাচ্ছে, তা  বলতে পারি। আমাদের বিচেনায় ‘নগদ’-এর ভালো করার ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বেশি ভূমিকা পালন করছে। একইসঙ্গে যুক্ত হয়েছে অত্যাধুনিক ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তিও। এছাড়া বাজার নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণার মাধ্যমে গ্রাহকের চাহিদা মেটানোর মতো সেবা চালু করাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

রাইজিংবিডি: বাজারে প্রচলিত নন ব্যাংকিং মোবাইল ফিন্যান্সিং সার্ভিসের কার্যক্রম, জেনারেল ব্যাংকিং কার্যক্রমের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন? এই বিষয়ে আপনার অভিমত জানতে চাই। 
তানভীর এ মিশুক: অবশ্যই নয়। এখানে সংঘাতের কোনো সুযোগ নেই।  আমরা বরং একেক কোম্পানি, একেক ধরনের সেবা নিয়ে আসার মাধ্যমে, সব ধরনের গ্রাহকের সেবার চাহিদা পূরণ করতে চাই। সম্ভবও। ব্যাংকগুলো মূলত বড় অঙ্কের লেনদেন নিয়ে কাজ করে।  আর আমরা কাজ করছি ছোট ছোট অঙ্ক নিয়ে।

রাইজিংবিডি: দেশের জনসংখ্যা, অর্থনীতি, নাগরিকদের জীবনযাপনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে গড়ে ওঠা এতগুলো সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক আর অর্থলগ্নীকারক প্রতিষ্ঠান থাকার পরও আপনাদের এই ‘মোবাইল ফিন্যান্সিং সার্ভিস (এমএফএস)’-এর প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে করেন?
তানভীর এ মিশুক: মোবাইল ফিন্যান্সিং সার্ভিস বিশেষ করে ‘নগদ’যে ধরনের সেবা গ্রাহকদের দিচ্ছে, তা ব্যাংকের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। মোট গ্রাহকের মাত্র ২২ শতাংশকে ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছিল। দশ বছর সেবা দিয়ে সব এমএসএস-রা ২২ থেকে ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত আনতে পেরেছে। গত বছর মার্চে নগদ বাজারে আসার পর আমরা আরও প্রায় তিন কোটি গ্রাহককে এই নেটওয়ার্কে নিয়ে আসতে সক্ষম হই।  যে কারণে এখন আর্থিকভাবে অন্তর্ভুক্ত জনগণের সংখ্যা ৫০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের শতভাগ বয়োপ্রাপ্ত জনগণকে ডিজিটালি আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে নিয়ে আসা। আর সে জন্যেই নতুন নতুন পরিকল্পনা সাজিয়ে কাজ করছে ‘নগদ’।


 
রাইজিংবিডি: করোনার কারণে ব্যাংকে না গিয়ে বেশিরভাগ মানুষ আপনাদের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন করছে।  এ কারণে আপনাদের (সবার) ব্যবসা অল্প সময়ে সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছে গেছে বলে মনে করেন অনেকে।  এ বিষয়ে আপনি কী বলেন?
তানভীর এ মিশুক: করোনার সময় আরও বেশি মানুষ ডিজিটাল সেবায় আগ্রহী হয়েছেন।  সে কারণে বিকল্প হিসেবে মানুষ ‘নগদ’ ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে উদ্যোগী হয়েছে। তবে এই সময়ে গ্রাহকদের জন্যে ‘নিউ নর্মাল’-এর সেবা বাজারে আনাও আমাদের জন্যে চ্যালেঞ্জের ছিল। আমরা ‘নগদ’ সেই চ্যালেঞ্জে জয়ী হয়েছি। গ্রাহকরা খেয়াল করেছেন, দশ-বারো বছর ধরে যারা এমএফএস সেবা নিয়ে আসেন তাদের অনেকেই কিন্তু নতুন কিছু নিয়ে আসেনি। বরং ‘নগদ’ একমাত্র অপারেটর, যারা কোভিড টেস্টের বিল পরিশোধের আয়োজন করেছে।  এই সময়ে গ্রাহক যেন দৈনন্দিন লেনদেনের পুরোটাই ‘নগদ’ দিয়ে মেটাতে পারে। এজন্য হাজার হাজার মার্চেন্টকে ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মে তুলে আনার ব্যবস্থা করেছে ‘নগদ’। এছাড় ‘নগদ’ই একমাত্র সেবা, যেখানে সব সরকারি সেবার বিল বিনা খরচায় দেওয়া যায়।

রাইজিংবিডি: ভবিষ্যতে গ্রাহকদের জন্য নতুন আর কী সেবা নিয়ে আসার প্ল্যান রয়েছে?
তানভীর এ মিশুক: আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা। কাজও শুরু করেছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন পেলে  ছয় মাসের মধ্যে  এই ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা নিয়ে আসা সম্ভব হবে। ‘নগদ’ ডিজিটাল ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠার অনুমোদন পেলে, রাত দিন ২৪ ঘণ্টার যেকোনো সময় গ্রাহকরা যেকোনো জায়গায় ব্যাংকিং সেবা পাবেন। 

মেসবাহ/সাইফ