বাংলাদেশ আমার কাছে বড্ড ভালোবাসার-বাপ্পী লাহড়ি

মোঃ রিদুয়ানুল হক

প্রকাশিত: ০০:০৭, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২

বাংলাদেশ আমার কাছে বড্ড ভালোবাসার-বাপ্পী লাহড়ি

সঙ্গীত জগতে আবার নক্ষত্রপতন। প্রয়াত প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী বাপ্পি লাহিড়ি। সংগীতের কিংবদন্তি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণের চব্বিশ ঘন্টা না যেতেই আরেক নক্ষত্রের পতন। বেশ কিছুদিন ধরেই হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। মঙ্গলবার সকালে ৬৯ বছর বয়সে মৃত্যু হয় তার। গত বছর তিনি কোভিড আক্রান্ত হন। যদিও সেই সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসেন তিনি। আগামিদিনে বেশ কিছু প্রজেক্ট হাতে থাকলেও শেষ করা হলনা কোনওটাই।

হাসপাতালের ডিরেক্টর ডাঃ দীপক নামজোশি জানিয়েছেন, বাপ্পি লাহিড়ি গত এক মাস ধরে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন এবং সোমবার তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু মঙ্গলবার তার স্বাস্থ্যের অবনতি হয়। তাঁর পরিবারের তরফে ডাক্তারকে তাদের বাড়িতে দেখার জন্য ডাকা হয়। এরপরেই তাঁকে হাসপাতালে আনা হয়। একাধিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যা ছিল তাঁর। মধ্যরাতের কিছু আগে ওএসএ (অবস্ট্রাকটিভ ¯িøপ অ্যাপনিয়া) এর কারণে তিনি মারা যান।”

বাপ্পি লাহিড়ির মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পরেন সঙ্গীত শিল্পী ঊষা উত্থুপ। তিনি জানিয়েছেন যে তার জীবনের অন্যতম জনপ্রিয় গানগুলি বাপ্পি লাহিড়ির সুরে। কোভিডের আগেই শেষবার কথা হয় তার সঙ্গে। ঊষা উত্থুপ জানিয়েছেন যে ভারতীয় সঙ্গীতের জগতে ডিস্কো কিং ছিলেন তিনি। তার প্রয়াণের কথা মেনে নিতেই খুব কষ্ট হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

ডিস্কোর পাশাপাশি বিভিন্ন অসাধারণ গানে সুর দিয়েছেন বাপ্পি লাহিড়ি। এর মধ্যে রয়েছে “শরাবি”, “চলতে চলতে মেরে ইয়ে গীত ইয়াদ রাখ না, কভি অলবিদা না কেহনা”। এছাড়াও বাংলা সিনেমা জগতের বিভিন্ন গান যেগুলি ইতিহাস তৈরি করেছে যেমন “অমর সঙ্গী”, “চিরদিনই তুমি যে আমার”, “গুরুদক্ষিনা” এই সব গানের সুরেও ছিল বাপ্পি লাহিড়ির ছোঁয়া। সাতের দশকের শেষ থেকে আটের দশকের পুরোটা এবং তার পরেও বলিউড এবং টালিউড দুই জায়গাতেই সমানতালে চলেছে বাপ্পি লাহিড়ির যুগ।

কোভিড পরবর্তী সময়ে তাঁর গলা আর আগের মত না থাকায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। মাত্র ৬৯ বছর বয়েসে বাপ্পি লাহিড়ির মত একজন মানুষের মৃত্যু কার্যত কেউই মেনে নিতে পারছেন না। তাঁর মৃত্যুতে গায়ক রাঘব চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন যে এই ঘটনায় কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। গত সন্ধ্যায় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণের খবর এবং আজ সকালে বাপ্পি লাহিড়ির এই খবরে তিনি শোকাহত। বাপ্পি লাহিড়ির সঙ্গে তাঁর গানের অ্যালবামে একসঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি। এছাড়াও তিনি বলেন যে ভারতের সঙ্গীত জগতে পশ্চিমী মিউজিককে অন্যরকম ভাবে কাজ লাগিয়েছিলেন বাপ্পি লাহিড়ি। তাঁর মৃত্যুতে এক অকল্পনীয় ক্ষতি বলে জানিয়েছেন তিনি।

সুরকার শান্তনু মৈত্র বাপ্পি লাহিড়ির ব্যক্তিগত জীবনের কথা তুলে ধরে বলেন যে তিনি একজন খুবই আন্তরিক মানুষ ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে গান সম্পর্কে আলাপ আলোচনা তাদের যুগের বহু গায়ক এবং সুরকারকে সমৃদ্ধ করেছে বলে জানান তিনি। শুধু ডিস্কো নয়, তাঁর গানে মেলোডিরও ছোঁয়া ছিল বলে জানিয়েছেন শান্তনু।

তাঁর মৃত্যুতে শোক জ্ঞাপন করে টুইট করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি লিখেছেন, “কিংবদন্তি গায়ক এবং সুরকার বাপ্পি লাহিড়ি জি-র মৃত্যু সম্পর্কে জানতে পেরে আমি বেদনাহত। তাঁর মৃত্যু ভারতীয় সঙ্গীত জগতে এক বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। বাপ্পিদা তাঁর বহুমুখী গান এবং প্রাণবন্ত প্রকৃতির জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর পরিবার ও ভক্তদের  প্রতি আমার সমবেদনা।

সুরকার জিৎ গাঙ্গুলি জানিয়েছেন, “সঙ্গীত জগতে পর পর নক্ষত্র পতন। কালকে সন্ধ্যাদি আজ বাপ্পিদা। বলার মতন কোনও ভাষা নেই। পরিবারের সদস্যকে হারালে যেরকম অনুভুতি হয় সেরকমই মনে হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন যে বাপ্পি লাহিড়ির গানের ভাষায় বলতে গেলে তাঁকে কখনও ‘অলবিদা’ বলতে পারবেন না তিনি।

১৯৫২ সালের ২৭ নভেম্বর জলপাইগুড়িতে জন্ম বাপি লাহিড়ির। বাবা অপরেশ লাহিড়ি ও মা বাঁশরী লাহিড়ি দু জনেই ছিলেন সঙ্গীত শিল্পী। কিশোর কুমারের আত্মীয় বাপ্পি ছোট থেকে বড় হয়েছেন সাঙ্গীতিক পরিবেশে। ৩ বছর বয়সে তবলা বাজানো দিয়ে শুরু। ১৯৭০ থেকে ৮০-এর দশকে হিন্দি ছায়াছবির জগতে অন্যতম জনপ্রিয় নাম বাপি লাহিড়ি। ‘ডিস্কো ডান্সার’, ‘চলতে চলতে’, ‘শরাবি’-তে সুর দিয়েছেন। গেয়েছেন একাধিক গান। ২০২০ সালে তাঁর শেষ গান ‘বাগি থ্রি’-র জন্য। গত বছর এপ্রিলে করোনা আক্রান্ত হয়ে মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন বাপি লাহিড়ি। পরে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন।

একের পর এক সুপারহিট গান উপহার দিয়েছেন ভারতীয় সঙ্গীতের ডিস্কো কিং। ‘ডিস্কো ডান্সার’, ‘ডান্স ডান্স’, ‘হিম্মতওয়ালা’, ‘চলতে চলতে’, ‘শরাবি’, ‘সত্যমেব জয়তে’, ‘কম্যান্ডো’, ‘শোলা অউর শবনম’-এর মতো ছবিতে সুর দিয়েছেন। গেয়েছেন একাধিক গান। ২০২০ সালে তাঁর শেষ গান ‘বাগি থ্রি’-র জন্য। বাংলায় ‘অমর সঙ্গী’, ‘আশা ও ভালবাসা’, ‘আমার তুমি’, ‘অমর প্রেম’-সহ একাধিক ছবিতে সুর দিয়েছেন।

সোনার গয়না পরার ঝোঁক ছিল বাপি লাহিড়ির। গানের পাশাপাশি রাজনীতিতেও উৎসাহী ছিলেন। ২০১৪-য় শ্রীরামপুর লোকসভায় বিজেপির হয়ে ভোটে দাঁড়িয়ে তৃণমূলের কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে হেরে যান।

‘আমার বাবা বাংলাদেশি। আমি খাঁটি বাঙালি পরিবারের ছেলে। তাই বাংলাদেশ আমার অত্যন্ত প্রিয় জায়গা।’ এভাবেই নিজের পরিচয় দিলেন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় গায়ক এবং সংগীত পরিচালক বাপ্পী লাহিড়ী, যিনি ‘কোই ইয়াহাঁ নাচে নাচে’, ‘হরি ওম হরি’, ‘রাম্বা হো’, ‘উরি উরি বাবা’র মতো জনপ্রিয় সব গানের ¯্রষ্টা। এ ছাড়া তাঁর ঝুলিতে রয়েছে জনপ্রিয় নানা গান, সেসব গানের সুরে আট থেকে আশির প্রত্যেকের মন নেচে ওঠে সুরের জাদুতে। বাপ্পী লাহিড়ী কর্মসূত্রে হিন্দিবলয়ে বাস করেও নিজেকে বাঙালি পরিচয় দিতেই সব সময় ভালোবাসেন।

জনপ্রিয় এই শিল্পী বলেন, ‘আমি যেখানেই যা-ই না কেন, যে কাজই করি না কেন, সব সময়ই বলি, আমি একজন বাঙালি। আর বাঙালি হওয়ার জন্য আমি নিজেকে গর্বিত বলে মনে করি।’ দেশে হোক কিংবা বিদেশে, যেকোনো জায়গাতেই নিজের বাঙালিয়ানাকে গর্বের সঙ্গে সবার কাছে বলতে ভালোবাসেন জনপ্রিয় গায়ক এবং সংগীত পরিচালক বাপ্পী লাহিড়ী। কথায় কথায় বললেন, ‘আমার বাবা ছিলেন বাংলাদেশের পাবনার মানুষ। একেবারে খাঁটি বাঙালি। আমি সেই পরিবারের ছেলে। তাই বাংলাদেশ আমার কাছে  বড্ড ভালোবাসার জায়গা। বাংলাদেশে গেলে এখনো প্রচুর মানুষের ভালোবাসা পাই।’ বললেন, ‘সোনার বাংলা আর সোনা দুটোই আমার কাছে খুব প্রিয়।’

সংগীত জগতে নতুন প্রজন্মের  উঠে আসা প্রসঙ্গে বাপ্পী লাহিড়ী বলেন, ‘আমি সব সময় নতুন ট্যালেন্টদের উৎসাহ দিতে ভীষণ পছন্দ করি। বিশেষ করে বিভিন্ন মিউজিক রিয়েলিটি শো থেকে নতুন নতুন প্রতিভা উঠে আসে বলেই আমার বিশ্বাস। মিউজিক রিয়েলিটি শো থেকেই তো আমাদের ভারতে সুনিধি চৌহান, শ্রেয়া ঘোষাল, কুনাল গাঞ্জাওয়ালা, শেখর রাভজিয়ানি ও অরিজিত সিংরা উঠে এসেছেন।  আমি যেমন লতাজি, মুকেশজি, কিশোরমামা, রফিজির সঙ্গে কাজ করেছি, তেমনি এখনকার নতুন শিল্পীদের সঙ্গেও কাজ করেছি। দেখেছি, সবারই নিজস্ব নিজস্ব প্রতিভা রয়েছে। আমার ভীষণ ভালো লাগে নতুনদের সঙ্গে কাজ করতে।’

একদিন কলকাতা থেকে কিছু না নিয়ে খালি হাতেই জার্নি শুরু করেছিলেন। আজ রাজপ্রাসাদে রয়েছেন। উত্তরণের সিঁড়ি ভেঙে সাফল্যের শিখরে ওঠা বাপ্পী লাহিড়ী তাই মনে করেন, ‘মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ আছে বলে আমি কিছু বিশ্বাস করি না। আমার কাছে আত্মাই হলো একমাত্র ঈশ্বর। তাই যে যে সম্প্রদায়ের, যে সমাজের মানুষই হোন না কেন, চেষ্টা আর ইচ্ছা থাকলে সাফল্য অনিবার্য বলেই আমার বিশ্বাস।’