দুই বছরেও মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি

প্রকাশিত: ১১:৪৬, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২১

দুই বছরেও মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি

বরখাস্ত হওয়া একজন শিক্ষকের জাল-জালিয়াতি ও নিজেকে উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দাবি করে এমপিও আবেদনের ঘটনার সুরাহা হয়নি পাঁচ বছরেরও বেশি সময়ে। আর এই ঘটনায় মন্ত্রণালয়ের নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি দুই বছরেও। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে এক বছরের বেশি সময় ধরে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার হাজি অছি আমরুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ওই ঘটনার সুরাহার জন্য সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক উম্মে কুলসুম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সভায় আমি (প্রধান শিক্ষক) উম্মে কুলসুম এবং জালিয়াতির দায়ে বরখাস্ত জাহাঙ্গীর সেলিমের সশরীরে শুনানিতে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ১৮ মার্চ শেরপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে শুনানির তারিখ ও সময় পরে জানানো হবে বলে অবহিত করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর। এরপর গত এক বছরের বেশি সময় শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পর প্রায় এক বছরের বেশি সময় কোনও পদক্ষেপ নেয়নি অধিদফতর। ২০২০ সালের ১৮ মার্চ শুনানির সময় ও তারিখ পরে জানানো হবে বলে শেরপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে পত্র দেয় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোনও সমস্যা সৃষ্টি হলে মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ বা অনুমতি চাইতে পারে অধিদফতর। যথাযথ কারণ ছাড়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই।  জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি দুই বছর ধরে পেন্ডিং (ঝুলিয়ে) রাখা ঠিক হয়নি। তবে করোনার কারণে গত প্রায় দেড় বছর জরুরি বিষয়ে গুরুত্ব বেশি দেওয়া হয়েছে। সে কারণে গত এক বছর পেন্ডিং ছিলো কিনা তা দেখতে হবে। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।' সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শেরপুরের ঝিনাইগাতি উপজেলার হাজি অছি আমরুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জাহাঙ্গীর সেলিম ২০১৩ সালের ২৭ জানুয়ারি থেকে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার কারণে ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিদ্যালয় পরিচালনা (ম্যানেজিং) কমিটি। ২০১৫ সালের ২৬ অক্টোবর চূড়ান্ত বরখাস্ত অনুমোদন করে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল অ্যান্ড আরবিট্রেশন  কমিটি। কিন্তু ততদিন বসে থাকেননি বরখাস্ত হওয়া সহকারী শিক্ষক জাহাঙ্গীর সেলিম।  পরিচালনা কমিটির সভাপতির স্বাক্ষর জালিয়াতি করে ২০১৩ সালের ১৩ জুন প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগপত্র তৈরি করেন। গোপনে জাল কাগজপত্র জমা দিয়ে এমপিও আবেদন করে ২০১৩ সালের নভেম্বরে প্রধান শিক্ষক হিসেবে এমপিওভুক্ত হন। বিষয়টি জানতে পেরে ওই সময়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক উম্মে কুলসুম পরিচালনা কমিটির সভাপতিসহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্তরে অভিযোগ করেন। জালিয়াতির ঘটনা প্রমাণ হলে ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর জাহাঙ্গীর সেলিমের এমপিও স্থগিত করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর। জালিয়াতির দায়ে জাহাঙ্গীর সেলিমের বিরুদ্ধে মামলা করতেও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়ের করা মামলায় আদালত অভিযোগ গঠন করেন।  অভিযোগ গঠনের দিনই জাহাঙ্গীর সেলিমকে জেল হাজতে পাঠান আদালত। আদালতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর জানায়, এসব ঘটনার মধ্যেই বিভিন্ন সময় জালিয়াতির দায়ে অভিযুক্ত শিক্ষক জাহাঙ্গীর সেলিম একটার পর একটা মামলা করেন। আদালতে মামলার আংশিক কাগজপত্র দাখিল করে মিথ্যা তথ্য দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রধান শিক্ষক পদে এমপিও ছাড়ের সুপারিশও আদায় করেন ২০১৬ সালের ২১ এপ্রিল। অথচ সহকারী শিক্ষক থাকাকালে ২০১৩ সালের ২৭ জানুয়ারি থেকে বিদ্যালয়ের অনুপস্থিত ওই শিক্ষক। অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রণালয় এমপিও ছাড়ের সুপারিশ করলেও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরে জালিয়াতির প্রমাণ থাকায় এমপিও চালু হয়নি। তবে সেলিম জাহাঙ্গীরের প্রধান শিক্ষক পদ দাবি করার বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা চায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর। অভিযুক্ত শিক্ষক এমপিও আবার চালু করার আবেদন করেছেন। অন্যদিকে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জালিয়াতির অভিযোগে ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর এমপিও স্থগিত হওয়া শিক্ষকের নাম এমপিও তালিকা থেকে স্থায়ীভাবে কর্তন করার আবেদন জানিয়েছেন কয়েক দফা। কিন্তু সাড়ে সাত বছরেও এমপিও তালিকা থেকে নাম কর্তন করা হয়নি। এদিকে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এমপিও সংক্রান্ত কমিটির সভায় ২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সিদ্ধান্ত নেয় বিষয়টি উভয় পক্ষের শুনানি করে নিষ্পত্তি করতে হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ২০২০ সালের ১৮ মার্চ শেরপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে পত্র দিয়ে জানায়, শুনানির তারিখ ও সময় পরে জানানো হবে। এরপর প্রায় এক বছর পার হয়ে গেলেও কোনও পদক্ষেপ নেয়নি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর।