করোনায় নাকাল শিল্প খাতে স্বস্তি দিলো বাংলাদেশ ব্যাংক

প্রকাশিত: ১৪:২২, ৯ জানুয়ারি ২০২২

করোনায় নাকাল শিল্প খাতে স্বস্তি দিলো বাংলাদেশ ব্যাংক

রোনার দিনগুলোতে যে লোকসান গুনতে হয়েছিল, সেটা এখনও পুষিয়ে নিতে পারেনি দেশের অধিকাংশ শিল্প খাত। তথাপি সরকারের প্রণোদনা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সময়োচিত নীতি-সহায়তায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পেয়েছেন উদ্যোক্তারা।

বড়দের বড় ক্ষতি

মহামারির ধাক্কা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি দেশের শীর্ষপর্যায়ের জুতা প্রস্তুতকারক বাটা শু। প্রতিষ্ঠানটি তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ লোকসানে পড়েছে সম্প্রতি। ২০২০ সাল শেষে লোকসান গুনেছে ১৩২ কোটি ৬১ লাখ টাকা। আগের বছরে লাভ করেছিল ৪৯ কোটি টাকা। ওই বছর বিক্রি ৮৫৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা হলেও ২০২০ সালে হয় ৫০৮ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির মার্কেটিং ম্যানেজার ইফতেখার মল্লিক বলেন, ‘বাংলাদেশে ব্যবসা শুরুর পর থেকে বাটা কখনও এতটা খারাপ করেনি। এখন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে।’ ঢাকার পাঁচ তারকা হোটেল ওয়েস্টিন স্বাভাবিক ব্যবসায় ফিরতে পারেনি এখনও। ২০১৯-২০ অর্থবছরে রুম ভাড়া থেকে হোটেলটির আয় হয়েছিল ৬২ কোটি টাকার বেশি। যা গত অর্থবছরে সাড়ে ১৬ কোটি টাকায় নেমে আসে। হোটেলটির কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের স্বাভাবিক সময়ে শুধু রুম ভাড়া বাবদ আয় করেছিল ৯১ কোটি টাকা। ওই বছর খাবারও বিক্রি হয়েছিল ১০৬ কোটি টাকার। সেই হিসেবে সর্বশেষ অর্থবছরে মাত্র ২৯ শতাংশ আয় হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ঢাকার আরেক পাঁচ তারকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল আয় করেছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা। খাবার বিক্রির পাশাপাশি রুম ও হল ভাড়া দিয়ে এ আয় করেছে হোটেলটি। আগের ২০১৯-২০ অর্থবছরে হোটেলটি আয় করেছিল ৯৮ কোটি টাকা। দেশের বড় সব শিল্পের অবস্থা কমবেশি এমনই। ২০২০ সালের মার্চ থেকে শুরু হওয়া মহামারিতে অর্থনীতির প্রতিটি খাতই ক্ষতির মুখে পড়েছে। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবা খাত। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, অর্থনীতিতে সেবা খাতের অবদান প্রায় ৫০ শতাংশ। শিল্প খাত ৩৫ শতাংশ এবং কৃষির অবদান প্রায় ১৪ শতাংশ। মহামারিতে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বড় খাতগুলোর সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখা। দেশি-বিদেশি নানা পদক্ষেপে মহামারির শুরুর দিকে এ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছিল। বিদেশ থেকে কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য সংগ্রহে লেগেছে দীর্ঘ সময়। ভাড়া বাবদ গুনতে হয়েছে বাড়তি অর্থ। আমদানি মূল্য বেড়েছে হু হু করে। বছর শেষে ডলারের দামও গেলো বেড়ে। এতেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে শিল্প খাত। তবে শত হোঁচটেও থেমে থাকেননি উদ্যোক্তারা। এত এত বিপত্তির মাঝেও তাদের বেশ খানিকটা স্বস্তি দিতে পেরেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

‘কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সাধুবাদ, তবে...’

ব্যবসায়ীরা বলছেন, কেউ কেউ ক্ষতি কাটিয়ে উঠলেও অনেকেই পারেননি। তাদের পক্ষে ঋণের টাকা ফেরত দেওয়া এখনই সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকও ঋণের কিস্তি ১৫ শতাংশ জমা দিলে তাকে খেলাপি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে অনেকেই খেলাপি হওয়ার হাত থেকে বেঁচেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন সিদ্ধান্তে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন তারা। বলছেন, জুন পর্যন্ত এই সহায়তা অব্যাহত থাকলে অনেকেই ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন। তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত উদ্যোগই শিল্প খাতকে কোভিড ১৯–এর ভয়াবহ প্রভাব থেকে ঘুরে দাঁড়াতে  সাহায্য করেছে। মহামারির মধ্যে সরকারের সময়োপযোগী নীতি, প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা—এসবই অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে। তবে ব্যবসায়ীরা ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা পুরোপুরি ফিরে পাননি। বিশ্ববাজারে শিল্পের কাঁচামালের মূল্য ও জাহাজভাড়া বেড়ে যাওয়ায় রফতানি শিল্পে প্রভাব পড়ছে। এর মধ্যে জুড়ে বসেছে ওমিক্রন। নতুন করে আবার রফতানিতে দেখা দিয়েছে উৎকণ্ঠা।’ ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, ‘কম সুদে সরকার যে প্রণোদনার ঋণ দিয়েছে, সেটাকে সাধুবাদ জানাই। তবে করোনা পুরোপুরি চলে যাওয়ার পরও দুই বছর সময় দিতে হবে। এক বছরের ঋণে খুব একটা উপকার হবে না, বরং খেলাপি বাড়বে। এ ছাড়া ছোট উদ্যোক্তাদের সত্যিকার অর্থে সহায়তা করতে চাইলে বিনা জামানতে ঋণ দিতে হবে।’ মোটকথা, এখনই নীতি সহায়তা তুলে না নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ করেছেন ব্যবসায়ী নেতারা। বিশেষ করে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে যেন তাদের খেলাপি করা না হয়, এমন দাবি জানিয়েছেন তারা। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সভাপতি জসিম উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল গত সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের সঙ্গে সাক্ষাতে এ দাবি জানায়। নীতি–সহায়তা জুন পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে একাধিক চিঠি দেন এফবিসিসিআই সভাপতিও। এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি ও দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দীন বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিক অবস্থার দিকে ফিরছেন। ২০১৯ সালে অবস্থা যেমন ছিল, সেটার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পুনরুদ্ধার হয়েছে। ছোট উদ্যোক্তারা যাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সহায়তা পান, সেই উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।’ বিজিএমইএ পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘সরকারের প্রণোদনা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সহায়তা ব্যবসা-বাণিজ্যকে ইতোমধ্যে ঘুরে দাঁড়াতে বেশ সহায়তা করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৫ শতাংশ জমা দেওয়ার বিনিময়ে খেলাপি না হওয়ার সিদ্ধান্তে উদ্যম ফিরে পেয়েছেন ব্যবসায়ীরা।’ তিনি বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের আরও সহায়তা লাগবে। অর্ডার বাড়ছে। তবে আশানুরূপ ব্যবসা হচ্ছে না। অনেকে হয়তো ক্ষতি কাটিয়ে উঠেছেন, কিন্তু আমার মত শত শত কারখানা মালিক এখনও ক্ষতি কাটাতে পারেননি। ব্যবসা না হলে ব্যবসায়ীরা কোথা থেকে টাকা দেবে? ফেরত দেওয়ার শর্তগুলো শিথিল করা দরকার। কিস্তির মেয়াদও বাড়ানো দরকার।’ বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, ‘করোনার ধাক্কা কাটাতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বড় ভূমিকা রেখেছে। এজন্য দুপক্ষকেই সাধুবাদ। ব্যাংকের সিদ্ধান্তে অর্থনীতি গতিশীল হয়েছে, ব্যবসায়ীরা স্বস্তি পেয়েছেন।’ তার মতে, গত দুই বছরে উদ্যোক্তাদের পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক যত সার্কুলার জারি করেছে, এর আগে কখনও এত সার্কুলার জারি হয়নি। অর্থনীতির উন্নয়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নীতি সহায়তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানান তিনি।

গবেষণা

২০২০ সালের শুরুতে করোনায় ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি নিয়ে গবেষণা করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ১৫০টি কোম্পানি নিয়ে জরিপ করা ওই গবেষণায় দেখা গেছে, অন্তত ৫ শতাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধই হয়ে গেছে। ৭৬টি কোম্পানি পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত। আংশিক ক্ষতির শিকার ৫৯টি। ১৫টি কোম্পানির বিশেষ কোনও ক্ষতি হয়নি। জরিপে অংশ নেওয়া ১৪০ জন ব্যবসায়ীর মধ্যে ৩৭ দশমিক ১৪ শতাংশ বলেছেন, করোনায় তাদের মুনাফা কমেছে ৫০ শতাংশ। ৩৫ শতাংশ বলেছেন, তাদের মুনাফা কমেছে ৭৫ শতাংশ। ৯২.৬৭ শতাংশ উদ্যোক্তা বলেছেন, করোনার কারণে তাদের লাভ হয়নি। মাত্র ০.৬৭ শতাংশ বলেছেন, তাদের লাভ হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন

২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতির প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। টাকার অঙ্কে যা প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, প্রথম ধাক্কায় ব্যবসা খাতে বিপর্যয় নেমে এসেছিল। বড় শিল্প খাতের ব্যবসায়ীরা চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটিয়েছেন। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত উৎপাদন খাত সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় ছিল। সাবান, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও ওষুধসহ হাতেগোনা কয়েকটি খাত ভালো করলেও বাকিগুলোতে ব্যাপক ধস নামে। বেশিরভাগ কারখানা বন্ধ ছিল। অনেকের উৎপাদন নেমে এসেছিল শূন্যের কোঠায়। বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্য এবং অর্থনীতির চালিকাশক্তি বিবেচিত তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন নেমে আসে অর্ধেকে। অস্তিত্ব সংকটে পড়েছিল কুটির, ক্ষুদ্র, মাঝারি বা সিএসএমই শিল্প খাত। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে এসএমই খাতে সামগ্রিক আয় কমেছে প্রায় ৬৬ শতাংশ। প্রায় ৭৬ শতাংশ উৎপাদিত পণ্য অবিক্রিত ছিল। বড়, মাঝারি ও ছোট খাতগুলোর বিপর্যয়ের সরাসরি প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানে। করোনার প্রথম ঢেউয়ে চাকরি হারিয়েছেন কয়েক কোটি মানুষ। বিশ্বব্যাংকের ‘লুজিং লাইভলিহুড: দ্য লেবার মার্কেট ইমপ্যাক্টস অব কোভিড-১৯ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনায় যারা চাকরি হারিয়েছেন, তাদের মধ্যে ঢাকায় থাকতেন ৭৬ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৫৯ শতাংশ। তবে সবচেয়ে বেশি চাকরি হারিয়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ (৭১ শতাংশ)। অন্যান্য এলাকায় হারিয়েছেন ৬১ শতাংশ।