এত পাম অয়েল যায় কোথায়?

প্রকাশিত: ১৯:৩০, ১৯ ডিসেম্বর ২০২১

এত পাম অয়েল যায় কোথায়?

মানহীন সয়াবিন তেলে সয়লাব বাজার। আগে এ অভিযোগ পাওয়া যেতো খোলা তেলে। এখন বিভিন্ন কোম্পানির বোতলজাত তেল নিয়েও অভিযোগ আসছে—সয়াবিনের নামে বিক্রি হচ্ছে পাম অয়েল। বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্য, খাদ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের একাধিক সংস্থার দায়িত্ব থাকলেও কেউই তা পালন করছে না।

হিসাব মেলে না

রান্নায় ভোজ্যতেলের মধ্যে দেশের মানুষের প্রথম পছন্দ সয়াবিন তেল। শুধু দেশের বাজারে নয়, বিশ্বের ভোজ্যতেলের বাজারের ৫৯ শতাংশও পাম তেলের দখলে। কিন্তু তথ্য বলছে, দেশে সয়াবিন তেলের দ্বিগুণ আমদানি হচ্ছে পাম তেল। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে—এত পাম অয়েল যায় কোথায়? আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত অপরিশোধিত প্রতি টন পাম অয়েলের দাম ৯৬০ ডলার। অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম এক হাজার ১০ ডলার। অক্টোবরে সয়াবিন তেলের দাম ছিল ৮২০ ডলার ও পাম তেলের ৭৭০ ডলার। মালয়েশিয়ান পাম অয়েল কাউন্সিলের (এমপিওসি) তথ্যমতে, ২০১৯ সালে দেশে মোট ভোজ্যতেলের আমদানি ছিল ২৪ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে পাম অয়েল ছিল ১৫ লাখ ৬০ হাজার টন ও সয়াবিন তেল ৮ লাখ ৪০ হাজার টন। অর্থাৎ পাম অয়েল আমদানি হচ্ছে সয়াবিনের দ্বিগুণ। আবার সাত বছরে পাম তেল আমদানি বেড়েছে ২৫ শতাংশ। ২০১৩ সালে দেশে আমদানি করা ভোজ্যতেলের মধ্যে পাম অয়েল ছিল ১২ লাখ ৫০ হাজার টন, সয়াবিন তিন লাখ ৭০ হাজার টন। অর্থাৎ সাত বছর আগে পাম তেলের আমদানি ছিল সয়াবিনের তিনগুণেরও বেশি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনে সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে ৫ লাখ ৬০ হাজার টন, পাম অয়েল ৭ লাখ ৬০ হাজার টন। সয়াবিনের চেয়ে ২ লাখ টন বেশি আমদানি হলেও দেশের বাজারগুলোয় পাম অয়েলের দেখা মেলে না। অধিকাংশ পাম অয়েলই মূলত বিক্রি হচ্ছে সয়াবিনের নামে। তবে এ তথ্য মানতে নারাজ দেশের অপরিশোধিত সয়াবিন তেল পরিশোধনকারী মিল মালিকরা। তাদের কথা হলো, পাম তেলের আমদানি কখনোই সয়াবিনের চেয়ে বেশি নয়। তাদের মতে, পাম তেল জমাট বাঁধে, সয়াবিন তেল বাঁধে না। তাই পাম তেলকে সয়াবিনের নামে বিক্রি করা সম্ভব নয়। রাজধানীতে একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত কর্মকর্তা আবদুর রউফ বললেন, ‘বিভিন্ন কোম্পানির বোতলজাত সয়াবিন তেলে জমাট বাঁধতে দেখছি। শীত পড়ছে বলেই এমনটা হচ্ছে। ইদানিং সয়াবিন তেলের বোতলের নিচে দেখলেই জমাট অংশ দেখা যায়।’ বিষয়টির প্রতি কারোর নজর নেই বলে অভিযোগ ওই কর্মকর্তার। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তীর ব্রান্ডের সয়াবিন তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক বিশ্বজিৎ সাহা জানিয়েছেন, ‘সয়াবিন তেলের নামে পাম তেল বিক্রির প্রশ্নই ওঠে না। সিটি গ্রুপ তীর ব্রান্ডের বোতলজাত সয়াবিন তেল বাজারজাত করে। যা শতভাগ বিশুদ্ধ।’ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ‘দেশের বাজারগুলোয় পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ বুঝে এটাকে সয়াবিনের নামে বিক্রি করছেন। কিন্তু বোতলজাত সয়াবিন তেলে এটি সম্ভব নয়। এটি নিয়ন্ত্রণে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর কাজ করছে।’ তবে ওই সংস্থায় জনবল সংকট রয়েছে বলে জানান তিনি।

১০ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি

জানা গেছে, দেশের বিদ্যমান ‘অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বিপণন ও পরিবেশক নিয়োগ আদেশ ২০১১’ অনুসারে কোনোভাবেই খোলা সয়াবিন বা পাম অয়েল বিক্রি করা যাবে না। আইনটি বাস্তবায়নে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও উদাসীন। আইন প্রণয়নের ১০ বছর পরও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এদিকে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোও এ নিয়ে কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছে না। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনিস্টিটিউশন (বিএসটিআই), খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ‘জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর’—এসব সংস্থার কর্মকর্তাদের মতে জনবল কম হওয়ায় দেশজুড়ে মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

৯৫ শতাংশই নিম্নমানের

বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খোলা ও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সয়াবিন ও সরিষার তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই নিম্নমানের। বাজারে বিক্রি হওয়া প্রায় শতভাগ ঘি’ও নিম্নমানের। ২০১৭ সালের ‘মনিটরিং অ্যান্ড কমোডিটিজ ফর কেমিক্যাল কন্টামিনেশন অ্যান্ড মাইক্রো-বায়োলজিক্যাল অ্যাট এনএফএসএল: এন অ্যাপ্রাইজাল অব ফুড সেফটি সার্ভে ইন বাংলাদেশ-সেকেন্ড রাউন্ড’ শীর্ষক এক জরিপে ৪৬৫টি নমুনার মান পরীক্ষা করে এ তথ্য পাওয়া যায়। সঙ্গত কারণেই ‘আমরা কী খাচ্ছি,’ এ প্রশ্নের মুখোমুখি এখন দেশের সবাই।

বাড়াচ্ছে মৃত্যু

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবদেহের জন্য ট্রান্সফ্যাট বেশ ক্ষতিকর। পাম ও সয়াবিন তেল যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আংশিক হাইড্রোজেনেশন করা হলে সেখান থেকে অর্ধকঠিন মারজারিন বা কঠিন ডালডা উৎপন্ন হয়। এই প্রক্রিয়ায় ট্রান্সফ্যাটও তৈরি হয়। শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাট উচ্চমাত্রায় গ্রহণ হৃদরোগজনিত মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বছরে ১ কোটি ৭৯ লাখ মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বাংলাদেশে মারা যান ২ লাখ ৭৭ হাজার জন। এর মধ্যে ৪ দশমিক ৪১ শতাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী ট্রান্সফ্যাট। হৃদরোগে মৃত্যুতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশও আছে। সয়াবিনের নামে পাম তেল বিক্রি প্রসঙ্গে বিএসটিআইর মহাপরিচালক ড. মো. নজরুল আনোয়ার জানিয়েছেন, ‘বিভিন্ন কোম্পানি তাদের পণ্যের মান বিএসটিআই থেকে যাচাই করে অনুমোদন নিয়ে বাজারজাত করছে। বিএসটিআইয়ের অনুমোদনহীন পণ্য বাজারজাত করা আইনত দণ্ডনীয়। সারা বছরই অভিযান চলে। তবে জনবল সংকটে তা প্রত্যাশা অনুযায়ী হয় না। সংস্থায় এখন মাত্র তিনজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রয়েছেন।’