খুলনায় ৩০০৯ ছাত্রী বাল্যবিয়ের শিকার

প্রকাশিত: ২৩:৩৯, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১

আপডেট: ২৩:৫৮, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১

খুলনায় ৩০০৯ ছাত্রী বাল্যবিয়ের শিকার

করোনা মহামারির দেড় বছরে খুলনার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তিন হাজার নয় ছাত্রী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। এসব ছাত্রী সপ্তম থেকে ১০ম শ্রেণিতে পড়েছিল। জেলার মধ্যে ডুমুরিয়ায় সর্বাধিক ৭৫১ বাল্যবিয়ে হয়েছে। দ্বিতীয় ৬৮১ বাল্যবিয়ে হয়েছে কয়রায়। সবচেয়ে কম ছয় বাল্যবিয়ে হয়েছে দিঘলিয়া উপজেলায়। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রুহুল আমিন এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বাল্যবিয়ের শিকার ছাত্রীরা কমবেশি বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার মধ্যে আছে। তবে সবাই যাতে বিদ্যালয়ে সম্পৃক্ত থাকে কিংবা আসতে পারে সে বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির কাজ চলছে। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, করোনার দেড় বছরে ডুমুরিয়ায় ৭৫১, কয়রায় ৬৮১, পাইকগাছায় ৪৮৩, দাকোপে ২৯১, রূপসায় ২১৭, মহানগরীতে ১৫৮, তেরখাদায় ১৪৯, ফুলতলায় ২৪০, বটিয়াঘাটায় ৩৩ ও দিঘলিয়ায় ছয় বাল্যবিয়ে হয়েছে। এর মধ্যে রূপসার বেলফুলিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ ৭০, কয়রার কালনা মহিলা দাখিল মাদ্রাসায় ৫২, মদিনাবাদ মহিলা মাদ্রাসায় ৫০, ডুমুরিয়ার মহিলা দাখিল মাদ্রাসায় ৩৮, তেরখাদার কুশলা আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৩৭, মহানগরীর হ্যানে রেলওয়ে গার্লস স্কুলের ১৭ ছাত্রীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, বাল্যবিয়ে বন্ধে উপজেলা প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। করোনার ১০ মাসে অভিযান চালিয়ে ৫০টি বাল্যবিয়ে বন্ধ করেছি। এ সময়ে জরিমানার পাশাপাশি জেলও দিয়েছি। আবার মুচলেকা নিয়েছি। বাল্যবিয়ে ঠেকাতে উপজেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। মহানগরীর গিলাতলা হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীর (১৪) তিন মাস আগে বিয়ে হয়েছিল। স্কুলছাত্রী জানায়, লেখাপড়ার আগ্রহ আছে। পরিবারের চাপে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছে। এখন স্বামীর পরিবার চাইলে লেখাপড়া করবে। তার ভাষ্য, করোনায় স্কুল বন্ধ ছিল। পরিবারে অভাব। এ অবস্থায় বিয়ে ঠিক করে পরিবার। বিয়ে হলেও লেখাপড়া চালিয়ে যেতে চাই। এখন বাবার বাড়ি থেকে স্কুলে যাই। ডিসেম্বর মাসে শ্বশুরবাড়িতে তুলে দেবে। সেখানে গিয়েও লেখাপড়া চালিয়ে যেতে চাই। মেয়ের বাল্যবিয়ের বিষয়ে ছাত্রীর মা বলেন, বাল্যবিয়ে নিষিদ্ধ এটা জানি। কিন্তু আমরা অসহায়। অভাবের সংসারে কর্মজীবী ছেলে পেয়ে বিয়ে দিয়েছি। গরিব মানুষের অনেক সমস্যা। লকডাউনের মধ্যে স্বামীর আয় নেই, মেয়ে স্কুলে যেতে পারছে না- এলাকার পরিবেশ ভালো না। মেয়েকে নিয়ে চিন্তায় থাকতে হয়। সবকিছু ভেবেই বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছি। ফুলবাড়িগেটের ইউসেপ এম এ মজিদ স্কুলের সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীর (১৩) মা বলেন, মেয়ের স্কুল বন্ধ। গরিব পরিবার। বেঁচে থাকা কষ্টকর। তাই কর্মজীবী ছেলে পেয়ে গত সপ্তাহে মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। এখন স্বামী চাইলে লেখাপড়া করবে। আমারও ১৩ বছরে বিয়ে হয়েছিল। মেয়েকে ১৩ বছরে বিয়ে দিয়েছি। সংসার করতে পারবে। একই বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছিল স্থানীয় লবণ কারখানার এক কর্মীর মেয়ে। তিনি বলেন, মেয়েকে (১৪) শনিবারই বিয়ে দিয়েছি। মেয়ের নিরাপত্তাহীনতার কারণে বিয়ে দিয়েছি। আমি কোম্পানির পরিত্যক্ত জমিতে ঘর তুলে বসবাস করি। আর্থিক সংকটে মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। সাত বছর আগে মেয়ের বাবার মৃত্যু হওয়ার থেকে কষ্ট করে চলছি। আটরা শ্রীনাথ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মহসেন বিশ্বাস বলেন, করোনার বন্ধে বিদ্যালয়ের ১২ ছাত্রী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। বিদ্যালয় খোলার পর শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি সন্তোষজনক। আমরা অনুসন্ধান করে দেখেছি, নিম্নআয়ের পরিবারের মেয়েরাই বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশ লেখাপড়া ছেড়ে বিভিন্ন পেশায় জড়িয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গিলাতলায় ইতোপূর্বে নিম্নবিত্ত পরিবারে বাল্যবিয়ের ঘটনা বেশি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, গিলতলা ও আশপাশের প্রতিটি বিদ্যালয়ে সপ্তম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত গড়ে ২০ জন করে ছাত্রীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। এসব ছাত্রীর মধ্যে দু-একজন ক্লাসে আসে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের চিত্র একই। একাধিক অভিভাবক জানিয়েছেন, করোনাকালে বিদ্যালয় বন্ধের সময় মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। এ জন্য বাল্যবিয়ে দিয়েছেন।