চট্টগ্রামে দিনে ১৫ ডিভোর্সের আবেদন, নেপথ্যে করোনা-ফেসবুক

প্রকাশিত: ০০:৩৭, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

চট্টগ্রামে দিনে ১৫ ডিভোর্সের আবেদন, নেপথ্যে করোনা-ফেসবুক

প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সমাজে একান্নবর্তী পরিবার ব্যবস্থা ভেঙে গেছে অনেক আগেই। নানা কারণে প্রতিনিয়ত ভাঙছে সংসার। সারাদেশে বাড়ছে বিয়ে-বিচ্ছেদের ঘটনা। যার প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামে। গড়ে প্রতিদিন ১৫টি বিয়ে-বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়ছে সিটি করপোরেশনের সালিশি আদালতে। এর মধ্যে দু’একটি ছাড়া সবই বিচ্ছেদে নিষ্পত্তি হয়। এসব বিয়ে-বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে মূলত করোনায় ঘরবন্দি ও ফেসবুক আসক্তিকে দায়ী করছেন সমাজবিজ্ঞানী ও সংশ্লিষ্টরা। চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট মাসে তিন হাজার ৫৭২টি বিয়ে-বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়েছে। হিসাবে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৫টি আবেদন জমা পড়ছে। এর বাইরে জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে গড়ে প্রতি মাসে ৫০-৬০টি বিয়ে-বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়ছে। দু’একটি ছাড়া সব আবেদন বিচ্ছেদে নিষ্পত্তি হচ্ছে। দুই জায়গায় নারীদের দিক থেকে বিয়ে-বিচ্ছেদের নোটিশ বেশি আসছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। যৌতুকের জন্য নির্যাতন, স্বামীর মাদকাসক্তি, অন্য নারীর সঙ্গে সম্পর্ক, দ্বিতীয় বিয়ে, বনিবনা না হওয়াসহ নানা কারণে নারীরা বেশি বিয়ে-বিচ্ছেদের আবেদন করছেন। পুরুষরাও পিছিয়ে নেই। তাদের কাছ থেকেও বিবাহ-বিচ্ছেদের নোটিশ আসছে। তবে নারীদের তুলনায় কম। অন্য পুরুষের সঙ্গে স্ত্রীর সম্পর্ক, সন্তান না হওয়া, স্বামীর কথা না শোনা, যৌথ পরিবারে থাকতে না চাওয়াসহ নানা কারণে বিয়ে-বিচ্ছেদের পথ বেছে নিচ্ছেন পুরুষরা। সম্প্রতি করোনার কারণে বিচ্ছেদের হার বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে ঘরবন্দি হয়ে পড়ায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য বাড়ছে। একে-অন্যের দোষ-ত্রুটি খুঁজতে গিয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছেন। একপর্যায়ে স্বামী-স্ত্রীর কেউ একজন বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের অপব্যবহারের কারণে এখন সমাজে বিয়ে-বিচ্ছেদের ঘটনা বাড়ছে। সম্প্রতি করোনার কারণে ঘরবন্দি থাকতে গিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব বাড়ছে। যে কারণে এখন বিচ্ছেদের ঘটনাও বাড়ছে। পাশাপাশি করোনায় সংসারে অভাব-অনটনের কারণে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ফেসবুকের কারণে নারীরা অনেক বেশি ফ্যাশনেবল হচ্ছে। এতে তাদের চাহিদা ও ভোগ বাড়ছে। স্বামীরা তাদের চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হচ্ছে। একজনের মধ্যে না পাওয়ার হতাশা অন্যজনের মধ্যে মানসিক যাতনা কাজ করছে। ফলে ছেলেমেয়ে দুই পক্ষ থেকে বিচ্ছেদের পথে হাঁটছে।’চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দাদের বিয়ে-বিচ্ছেদের জন্য স্বামী কিংবা স্ত্রীকে নিজের সিদ্ধান্তের কথা লিখিতভাবে (তালাক নোটিশ) প্রথমে সিটি করপোরেশনের মেয়রকে জানাতে হয়। যাকে তালাক দিতে ইচ্ছুক তাকেও ওই নোটিশ পাঠাতে হয়। কারও কাছ থেকে আবেদন পাওয়ার পর মেয়র নোটিশটি সালিসি আদালতে পাঠিয়ে দেন। আদালতে মেয়রের পক্ষে নিযুক্ত থাকেন স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট (যুগ্ম জেলা জজ)। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট জাহানারা ফেরদৌস বলেন, ‘আমাদের কাছে তালাকের নোটিশ দেওয়ার পর বিচ্ছেদ কার্যকরের আগে স্বামী-স্ত্রী দুই পক্ষকে আমরা তিন মাসে তিনবার নোটিশ দিই। দুই পক্ষের কোনও পক্ষ কিংবা দুই পক্ষই হাজির হলে সমঝোতার চেষ্টা করি। কিন্তু সমঝোতা না হলে আইন অনুযায়ী ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হয়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিচ্ছেদের আবেদনকারীদের বেশিরভাগ নারী। আবার তাদের মধ্যে পোশাকশ্রমিকের সংখ্যা বেশি। তারা যে টাকা আয় করেন, সেটি পাওয়ার জন্য স্বামীরা অত্যাচার করেন। না হয় স্বামী আরেক বিয়ে করেছেন, যে কারণে এসব নারী বিচ্ছেদে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে, উচ্চবিত্তদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের কারণে বেশিরভাগ সংসার ভাঙছে। এর বাইরে স্বামীর মাদকাসক্তির কারণেও উচ্চবিত্ত পরিবারের নারীরা বিচ্ছেদে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।’ সিটি করপোরেশন থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৪ সালে যেখানে তিন হাজার ২৬৮টি বিয়ে-বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়েছিল। সেখানে চলতি বছর আট মাসেই সেই পরিমাণ বিয়ে-বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়েছে। চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিয়ে-বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়েছে তিন হাজার ৫৭২টি। ২০২০ সালে চার হাজার ৮৫৪, ২০১৯ সালে চার হাজার ৫৫০, ২০১৮ সালে চার হাজার ৩৩১, ২০১৭ সালে তিন হাজার ৯২৮ জন বিয়ে-বিচ্ছেদের আবেদন করেছিলেন।  সিটি করপোরেশন সালিশি আদালতে জমা পড়া আবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিয়ে-বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নিম্নবিত্ত পরিবারে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে নির্যাতন ও যৌতুক দাবির কারণে বিচ্ছেদ চান বলে উল্লেখ করেন। নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারে পরকীয়া, মাদকাসক্ত ও নেশার কারণে বিয়ে-বিচ্ছেদের কথা উল্লেখ করেন। উচ্চবিত্ত পরিবারে ব্যক্তিত্ববোধ ও মতপার্থক্য বিয়ে-বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।  একই অবস্থা চট্টগ্রাম লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে। সেখানে প্রতি বছর গড়ে ৫০০-৬০০ বিয়ে-বিচ্ছেদের জন্য আবেদন করেন। উচ্চবিত্ত হোক আর নিম্নবিত্ত হোক, বিয়ে বিচ্ছেদের সব আবেদনের ভাষা প্রায় এক। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা লিগ্যাল এইডের সহকারী এরশাদুল ইসলাম বলেন, ‘পুরুষের তুলনায় নারীরা বিয়ে-বিচ্ছেদের আবেদন বেশি করছেন। বেশিরভাগ পারিবারিক অশান্তির কারণে বিচ্ছেদের আবেদনে উল্লেখ করেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিয়ে-বিচ্ছেদের আবেদন পাওয়ার পর আমরা বিকল্পভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে সংসার ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করি। এক্ষেত্রে হয়তো দু’একজনের সংসার টিকে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদই হয়।’