করোনাকালে ৮০ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক ছিল অপ্রয়োজনীয়: আইইডিসিআরের গবেষণা

প্রকাশিত: ১৬:৪৭, ২৪ নভেম্বর ২০২১

করোনাকালে ৮০ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক ছিল অপ্রয়োজনীয়: আইইডিসিআরের গবেষণা

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ অপ্রয়োজনে দেওয়া হয়েছে বলে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) এক গবেষণায় উঠে এসেছে। মঙ্গলবার (২৩ নভেম্বর) বাংলাদেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সার্ভিল্যান্স আপডেট শীর্ষক আইইডিসিআরের এক সেমিনারে গবেষণার এ তথ্য তুলে ধরা হয়। গবেষণায় পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. রুবিনা ইয়াসমিন বলেন, কোভিড-১৯ চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের তেমন কোনও ভূমিকা নেই। কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার হয়েছে সারা বিশ্বে। তিনি বলেন, করোনাভাইরাস আক্রান্তদের মধ্যে ৮৭ শতাংশের বেশি মানুষকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন ছিল সর্বোচ্চ সাত শতাংশের। অর্থাৎ, এখানে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহার হয়েছে। সেই সঙ্গে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে কোভিড রোগীদের অধিকাংশকেই চিকিৎসকরা অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েছেন, যা রোগীরাও সেবন করেছেন। আর হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ওষুধের ৭০ শতাংশই ছিল অ্যান্টিবায়োটিক। আবার আইসিইউতে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের হার ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ। এর মধ্যে অ্যাজিথ্রোমাইসিন ও সেফ্টরিয়াক্সনের ব্যবহার হয়েছে ৬৮ দশমিক ৯ শতাংশ। কেবল তাই নয়, হাসপাতালে ভর্তির আগে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই নিজেরাও অ্যান্টিবায়োটিক নিয়েছেন এমন প্রমাণও পাওয়া গেছে গবেষণাতে। অধ্যাপক রুবিনা ইয়াসমীন বলেন, হাসপাতালে ভর্তির আগে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই এমন অ্যান্টিবায়োটিক ৩৩ শতাংশ রোগী সেবন করেছেন বলে গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন। আর এই সকলই জীবানুগুলোর ভেতরে অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং ফলশ্রুতিতে অ্যান্টিবায়োটিক তার কার্যকারিতা হারাচ্ছে। অনুষ্ঠানে আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক ও বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, জীবাণুগুলো অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠতে থাকলে এক সময় ব্যবহার করার মতো কোনও অ্যান্টিবায়োটিক থাকবে না। “অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সবাইকে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি আইনের জায়গাটা শক্ত হওয়ার ব্যাপার রয়েছে”। অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা বলেন, সাধারণ মানুষের কিছু দায়িত্ব আছে তারা যেন অ্যান্টিবায়োটিক না খায়। সাধারণ মানুষ সচেতন হলেই অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাবে, এমন না। আমরা অনেক প্রেসক্রিপশন দেখেছি যারা কোভিড সিচুয়েশনে অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করেছেন। এজন্য সব লেভেলেই সচেতনতার প্রয়োজন আছে। সবচেয়ে বেশি সচেতনতা তৈরি করতে হবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে। আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান ডা. জাকির হোসেন হাবিব বলেন, বাংলাদেশে সাধারণভাবে যেসব অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয় তার সবগুলোর বিরুদ্ধেই ‘রেজিস্ট্যান্স’ তৈরি হয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারির সময়ও অ্যান্টিবায়োটিক ‘রেজিস্ট্যান্সের’ উপর বড় প্রভাব ফেলেছে। তিনি বলেন, এগুলোর ধর্মই হচ্ছে, আপনি যত বেশি ব্যবহার করবেন, তত বেশি রেজিস্ট্যান্স তৈরি হবে। আমাদের কাছে যে ভালো অ্যান্টিবায়োটিক ছিল কারবাপেনাম গ্রুপের, সেই অ্যান্টিবায়োটিক কিন্তু নষ্ট হয়েছে। আইসিইউতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় এই ড্রাগ। যদি আমাদের হাত থেকে এই ড্রাগ চলে যায়, এরপর যেগুলো আছে সেগুলো দামও বেশি, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও বেশি সব জায়গায় দেওয়া যায় না। আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিনের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. এহসানুল হক, বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ডা. মো. ইসমাইল রামজি, ফ্লেমিং ফান্ড কান্ট্রি গ্রান্টের টিম লিড অধ্যাপক ডা. নীতিশ দেবনাথ বক্তব্য রাখেন।