বুধবার   ২৯ জানুয়ারি ২০২০   মাঘ ১৫ ১৪২৬   ০৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

হাজীগঞ্জ দুর্গের উচ্ছেদঅংশে ১১ প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞপ্তি’র সাইনবোর্ড

প্রকাশিত: ৭ ডিসেম্বর ২০১৯  

ইমতিয়াজ আহমেদ (যুগের চিন্তা ২৪) : নারায়ণগঞ্জ জেলাজুড়ে চলছে সরকারী জায়গা দখল ও উচ্ছেদের মচ্ছব। সরকারী জায়গা যে যার মত দখল করছে। ক’দিন বাদেই আবার উচ্ছেদ করা হচ্ছে।  সেই উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার পর উদ্ধারকৃত সরকারী জায়গা সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষন করা হয়না। উদ্ধারকৃত জায়গা আবারো দখল হয়ে যায়। 

 

এবার সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় শহরের হাজীগঞ্জ দুর্গের আশপাশের বিশাল জায়গা উদ্ধার করেছে অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে। ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়েছে দুর্গের আশপাশের স্থাপনা। এখন  মেইন সড়ক থেকেই  চোখে পড়ে দুর্গটি। প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে গাছগুলো কেটে নিয়ে রাস্তার পাশে নির্মাণ করা হচ্ছে সীমানা প্রাচীর। 

 

তবুও অবৈধ দখলদাররা বসে নেই। খরিদা সম্পত্তি দাবি করে মহামান্য হাইকোর্ট থেকে স্ট্যাটাসকো অর্ডার (স্থিতিবস্থা) এনে সাইনবোর্ড টানিয়ে দিয়েছে ১১টি প্রতিষ্টান। 

 

বিজ্ঞপ্তি শিরোনাম দিয়ে মহামান্য হাইকোর্টের স্ট্যাটাসকো অর্ডার (স্থিতিবস্থা) উল্লেখিত ব্যানারে যে কয়টি প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা আছে সেগুলো হল;  মেসার্স রকি টেক্সটাইল মিলস লিঃ,  মেসার্স ব্রাইট প্যাকেজিং ইন্ডাষ্ট্রিজ,  মেসার্স  সোনালী ডাইং এন্ড প্যাকেজিং মিলস,  মেসার্স রাসেল নিটিং,  মেসার্স আনোয়ারা এন্ড ব্রাদার্স,  মেসার্স আশরাফ টেক্সটাইল প্রসেসিং ইন্ডাষ্ট্রিজ,  মেসার্স বিসমিল্লাহ ডায়িং এন্ড প্রিন্টিং মিলস,  মেসার্স নিলিমা কটন প্রসেসিং ইন্ডাষ্ট্রিজ, মেসার্স রাসেল ওয়াশিং প্ল্যান্ট,  মেসার্স এম আর নিটিং মিলস (প্রাঃ) লিঃ ও মেসার্স আজমিরী  ট্রেডার্স।

 

এই সাইনবোর্ড থেকে সাধারণ মানুষ প্রমাদ গুণছেন বলে মনে করেন বোদ্ধামহল। তাদের মতে, অবৈধ দখলদাররা সব সময় মনে করেন সরকারী জায়গা দখলের মজাই আলাদা। যত পারো দখল করে নাও। কোন ডিপার্টমেন্ট থেকে কিছু ডকুমেন্টস তৈরী কর। কখনো উচ্ছেদ হলে হাইকোর্টে যাও। স্টে অর্ডার বা স্ট্যাটাসকো নিয়ে আসলেই ঝামেলা শেষ! কিল্লারপুল এলাকায় এবার উচ্ছেদ অভিযানের মধ্যে দিয়ে শহরবাসী ও সুধীসমাজের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হয়েছে। 


বিভিন্ন কলকারখানা ও গোডাউনের আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল ঐতিহাসিক নিদর্শন হাজীগঞ্জ দুর্গটি। উচ্ছেদ অভিযানে দুর্গটি রাস্তা থেকেই দৃশ্যমান হয়েছে। ঐতিহাসিক দুর্গটি রাস্তা থেকেই মানুষের চোখে পড়ছে। সব বয়সের লোকজন দুর্গ দেখে আনন্দে উচ্ছসিত। 

 

বিশেষ করে স্কুল-কলেজ পড়–য়ারা খুব রহস্য ভরা মন নিয়ে দুর্গের দিকে তাকিয়ে থাকে। গত ২৪ অক্টোবর দুর্গটির আশপাশে অবৈধভাবে গড়ে উঠা প্রায় অর্ধশত অবৈধ স্থাপনায় সম্বন্বিতভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন ও প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর। এরই মধ্যে কয়েকদিন ধরে উদ্ধারকৃত জায়গায় আবারো হাইকোর্টের স্ট্যাটাস কো অর্ডার উল্লেখ করে সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছে কে বা কারা। 


সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাগেছে, হাজীগঞ্জ এলাকায় মোঘল আমলের ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন হাজীগঞ্জ দুর্গকে সৌন্দর্য্য বর্ধনের মাধ্যমে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী কে এম খালিদ। গত ৩ নভেম্বর (রোববার) দুর্গ পরিদর্শনে এসে সাংবাদিকদের একথা জানিয়ে ছিলেন তিনি। 


এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা.সেলিনা হায়াৎ আইভী, জেলা প্রশাসক মো: জসীম উদ্দিন, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদা বারিক ও সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এএফএম এহতেশামূল হকসহ প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।


সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী জানান, আদালতের নির্দেশে গেলো সপ্তাহে উচ্ছেদের মাধ্যমে দুর্গের আশপাশের অবৈধ দখল থেকে অবমুক্ত হওয়া কয়েক একর জমিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সহযোগিতায় বাগান নির্মাণ ও আলোকসজ্জাসহ নানাভাবে সৌন্দর্য বর্ধন করা হবে। পরে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর এটিকে সংস্কারের মাধ্যমে দর্শণীয় স্থানের উপযোগী করে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলে সর্বসাধারণের বিনোদনের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে। 


নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা.সেলিনা হায়াৎ আইভী জানান, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশে বন্যা কবলিত এলাকায় উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ রপ্তানিযোগ্য পাট সংরক্ষণের জন্য দুর্গের আশফাশেল জমিটি তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা থেকে পাট মন্ত্রণালয় লীজ নিয়ে বেশ কয়েকটি গুদাম নির্মাণ করেছিল। 


পরবর্তীতে গুদামগুলোসহ পুরো জমিটি স্থানীয় প্রভাবশালীদের  অবৈধ দখলে চলে যায়। প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের এই জায়গা অবৈধভাবে দখল করে সেখানে গড়ে উঠে ছোট-বড় বিভন্নি আকারের মিল কারখানা ও গুদামঘর।


মেয়র আইভী আরো জানান, বর্তমানে পাট মন্ত্রণালয়ের এই জায়গার প্রয়োজন না থাকায় সিটি করপোরেশন এই ভূমি ফেরত নেয়ার জন্য উচ্চ আদালতে মামলা করলে সিটি করপোরেশনের অনুকুলে রায় আসে। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেধ করে জমিটি উদ্ধার করতে সিটি করপোরেশনকে নির্দেশ দেন উচ্চ আদালত। সেই আলোকে জমিটি উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান মেয়র আইভী।


একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ১১নং ওয়ার্ডের হাজীগঞ্জ এলাকায় গত ২৪ অক্টোবর প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাধীন হাজীগঞ্জ দুর্গের চতুর্দিকে সমন্বিত উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। এদিন সকাল থেকেই হাজীগঞ্জ দুর্গের চতুর্দিকে অবৈধভাবে দখল করে গড়ে তোলা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গোডাউনে এই অভিযান চালানো হয়। অভিযানে বড় বড় প্রায় ১২টি গোডাউন ৩টি ভেকু দিয়ে গুড়িয়ে দেয়া হয়। 


উচ্ছেদ করা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো রকি প্রিন্ট-১ ও ২, রাসেল ওয়াশিং-১ ও ২, আনোয়ার এন্ড ব্রাদার্স, নিলিমা কটন, ব্রাইট প্যাকেজিং, সোনালি, বিসমিল্লাহ ও আশরাফ প্যাকেজিংসহ আরো বেশ কয়েকটি অবৈধ স্থাপনা। 


অভিযানে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর আগারগাঁও আঞ্চলিক কার্যালয়ে পরিচালক রাখী রায়, উপ-পরিচালক লাভলী ইয়াসমিন, জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হাসান বিন মুহাম্মাদ আলী, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা আবুল হোসেন, বাজার কর্মকর্তা জহিরুল ইসলামসহ বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য ও হাজীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্য ও নাসিকের  উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরিচ্ছনকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।  

 

জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হাসান বিন মুহাম্মাদ আলী বলেন, মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী এই অভিযানটি প্রতœতত্ব বিভাগ, জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশনসহ আরো বেশ কয়েকটি দপ্তরের সমন্বয়ে চালানো হয়েছে। আমাদের দায়িত্ব ছিলো শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে স্বাভাবিক থাকে সেটি দেখভাল করার। অভিযানে কতখানি উচ্ছেদ করা হবে তা আমরা বলতে পারবোনা।


প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর আগারগাঁও আঞ্চলিক কার্যালয়ে পরিচালক রাখী রায় বলেন, হাজীগঞ্জ দুর্গটি প্রতœতত্ব অধিদপ্তরের আওতাধীন। মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী এখানে অভিযান পরিচালিত হবে জেনে এখানে পরিদর্শন করতে আমরা এসেছি। অভিযানে যাতে প্রতœতত্ত্ব সম্পদের কোন ক্ষতি না হয় এব্যাপারে আমরা দেখভাল করছি।


এদিকে, উচ্ছেদ হওয়া একটি গোডাউন আনোয়ার এন্ড ব্রাদার্সের সত্ত্বাধিকারী নুরুল ইসলাম চৌধুরীর দাবি এই উচ্ছেদ সম্পর্কে তারা ওয়াকিবহাল নন। তিনি বলেন, এখানে মোট ৭৮২ শতাংশ জমি নিয়ে হাইকোর্টে রীট আবেদন করা রয়েছে। 


আমরা গোডাউন মালিকরা এই সম্পত্তি বাংলাদেশ জুট করপোরেশন (বিজেসি) থেকে ক্রয় করে নিয়েছি, টাকা-পয়সা দেওয়াও ক্লিয়ার। মালিকানা সংক্রান্ত মামলাটি হাইকোর্টে রয়েছে। আজ হঠাৎ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা এসে ১২টি গোডাউনে উচ্ছেদ চালিয়েছেন।


অপরদিকে, হাজীগঞ্জ দুর্গের চতুর্দিকে সমন্বিত অভিযানে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। তারা জানান, রাত নামলেই এই এলাকাটিতে অপরাধী আর নেশাখোরদের অভয়ারণ্যে হয়ে ওঠে। নানা সময় অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। হাজীগঞ্জ দুর্গের মতো ঐতিহাসিক জায়গাটি এতোদিন অবহেলায় পড়ে ছিলো। মানুষজন ঘুরতে যেতেও সাহস পেতনা। 


জায়গাটি যদি পরিচ্ছন্ন করে সুন্দর করে গড়ে তোলা যায় তবে দূর-দুরান্ত থেকে লোকজন এই ঐতিহাসিক জায়গাটি দেখতে আসবেন। এলাকার পরিবেশটিও অনেক সুন্দর হবে।  সাধারণ মানুষ উচ্ছেদ অভিযানকে সাধুবাদ জানিয়েছেন তারা।

নারায়ণগঞ্জের গর্ব ঐতিহাসিক হাজীগঞ্জ দূর্গকে অবৈধ দখল থেকে ২৪ অক্টোবর অবমুক্ত করায় আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী সংগঠনের পক্ষ থেকে সন্তোষ প্রকাশ করে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন এর মেয়র ডাঃ সেলিনা হায়াত আইভি ও প্রতœতত¦ অধিদপ্তরকে অভিনন্দন ও সাধুবাদ জানানো হয়। 

সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, দীর্ঘদিন যাবৎ আমাদের নারায়ণগঞ্জ বাসীর অহংকার ও চার শতাধিক বৎসরের ঐতিহ্যবাহী প্রতœতাত্বিক নিদর্শণ এই হাজীগঞ্জ দূর্গের চারপাশ অবৈধ দখলদারদের কবলে পড়ে লোক চক্ষুর অন্তরালে ছিল। যে কারণে পুরাকীর্তি বিবেচনায় অমূল্য এই ঐতিহাসিক দূর্গটি সাধারণ মানুষের তথা দেশী ও বিদেশী পর্যটকদের কাছে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে তা রক্ষা পেল। 

 

উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, হাজীগঞ্জ দুর্গ মুঘল আমলে নির্মিত একটি জল দুর্গ। নারায়ণগঞ্জের সিটি করপোরেশন ১১নং ওয়ার্ডের হাজীগঞ্জ এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত। এটি খিজিরপুর দুর্গ নামেও পরিচিত। 

 

ঢাকা শহরকে রক্ষা করতে সপ্তদশ শতকের আগে পরে যে তিনটি জল দুর্গকে নিয়ে ত্রিভূজ জল দুর্গ বা ট্রায়াঙ্গাল অব ওয়াটার ফোর্ট গড়ে তোলা হয়েছিল তারই একটি হলো এই হাজীগঞ্জ দুর্গ। সম্ভবত মুঘল সুবাদার ইসলাম খান কর্তৃক ঢাকায় মুঘল রাজধানী স্থাপনের অব্যবহিত পরে নদীপথে মগ ও পর্তুগীজ জলদস্যুদের আক্রমণ প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে দুর্গটি নির্মিত হয়।
 

এই বিভাগের আরো খবর