শনিবার   ২৫ মে ২০১৯   জ্যৈষ্ঠ ১০ ১৪২৬   ২০ রমজান ১৪৪০

হত্যার পর লাশ ফেলে দেয়া হয় মেঘনা নদীতে, গ্রেফতার ৩

প্রকাশিত: ১৪ মে ২০১৯  

স্টাফ রিপোর্টার (যুগের চিন্তা ২৪) : দ্রারিদ্রতাকে জয় করতে মাজেদ আলী ও তার স্ত্রী নাজমা বেগম দুজনেই বিদেশ পাড়ি দেয়ার স্বপ্ন নিয়ে মহিউদ্দিন বুলু নামে এক দালালের মাধ্যমে আসেন নারায়ণগঞ্জে। ওই দালাল বুলু তাদেরকে ফতুল্লায় একটি ভাড়া বাড়িতে রাখেন। 


পরে পাসপোর্ট, ভিসা, মেডিক্যাল ও বিভিন্ন কাজের কথা বলে বুলু তাদের কাছে থেকে ২ লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নেয়। বুলু তাদের বিদেশ না নিয়ে নানা ছলচাতুরি করে কালক্ষেপণ করতে থাকে। 


একপর্যায়ে ওই টাকা আত্মসাত করতেই মাজেদ আলীকে ডেকে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন করে, গলা টিপে ও নাক-মুখ চেপে ধরে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যার পর লাশ মেঘনা নদীতে ফেলে দেয় দালাল বুলু। 


মঙ্গলবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে আদমজীর র‌্যাব-১১ এর প্রধান কার্যালয়ে র‌্যাব-১১ এর অধিনায়ক (সিও) লেঃ কর্ণেল কাজী শমসের উদ্দিন অপহৃত মাজেদ আলীর হত্যাকান্ডের বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের বিশদ বর্ননা দিতে গিয়ে এবিষয়টি উল্লেখ করেন। 


এ সময় উপস্থিত ছিলেন-মেজর তালুকদার নাজমুছ সাকিব, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ আলেপ উদ্দিন ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ জসীম উদ্দিন চৌধুরী।


সংবাদ সম্মেলনে লেঃ কর্ণেল কাজী শমসের উদ্দিন জানান, র‌্যাব-১১ দীর্ঘ দুই মাস তদন্ত চাালিয়ে মাজেদ আলীর হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে। 
এ ঘটনায় র‌্যাব সদস্যরা এ পর্যন্ত মূল হোতা আদম বেপারী মহিউদ্দিন বুলু (৪২)সহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে সোহেল নামে এক নৌকার মাঝি জবানবন্দীতে এই হত্যাকান্ডের এমনিই বর্ণনা দেন। 


সোমবার দিবাগত রাত দেড়টায় মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার গোয়াগাটিয়ার শিমুলিয়া এলাকা থেকে সুলতান মাহমুদ বাবু (৩৬)কে গ্রেফতার করা হয়। গত ১০ মে শুক্রবার কুমিল¬ার দাউদকান্দি বাজার ঘাট থেকে নৌকার মাঝি সোহেল (২১) গ্রেফতার করা হয়। এর আগে গত ৮ এপ্রিল মহিউদ্দিন ভুলুকে গ্রেফতার করে র‌্যাব সদস্যরা।


গ্রেফতারকৃত নৌকার মাঝি সোহেল র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে মাজেদ আলী হত্যাকান্ডের এ লোমহর্ষক বর্ণনা দেয়। 


তিনি আরো বলেন, গত ১৩ মার্চ নাজমা বেগম  নামে এক নারী পাবনা থেকে এসে র‌্যাব-১১ বরাবর অভিযোগ দাখিল করে যে, তার স্বামী মোঃ মাজেদ আলী গত ১০ মার্চ হতে নিখোঁজ হয়। এ বিষয়ে তিনি ফতুল্লা থানায় একটি জিডি করেন। 


অভিযোগে উল্লেখ করেন তারা স্বামী-স্ত্রী বিদেশ যাওয়ার উদ্দেশ্যে মহিউদ্দিন বুলু নামের এক আদম বেপারীর কথায় পাবনা থেকে নারায়ণগঞ্জে আসেন। বুলু তাদেরকে ফতুল্লায় একটি ভাড়া বাড়িতে রাখেন। পরে পাসপোর্ট, ভিসা, মেডিক্যাল ও বিভিন্ন কাজের কথা বলে বুলু তাদের কাছে থেকে ২ লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নেয়। 


বুলু তাদের বিদেশ না নিয়ে নানা ছলচাতুরি করে কালক্ষেপণ করতে থাকে। গত ১০ মার্চ মহিউদ্দিন বুলু বিকেলে ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে কৌশলে মাজেদ আলীকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায়। রাতে বুলু ফিরে আসলেও মাজেদ আলী আর ফিরে আসেনি। 


তখন থেকে তার মোবাইল বন্ধটি পাওয়া যায়। অভিযোগ পাওয়ার পর র‌্যাব-১১ এর একটি বিশেষ গোয়েন্দা দল নিখোঁজ মাজেদ আলীর সন্ধান ও সন্দেহভাজন মহিউদ্দিন বুলুকে গ্রেফতারের জন্য গোয়েন্দা কার্যক্রম শুরু করে। গত ৮ এপ্রিল ফতুল্লার শিবু মার্কেট এলাকা হতে মহিউদ্দিন বুলুকে গ্রেফতার করা হয়।


র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত মহিউদ্দিন বুলুকে নিখোঁজ মাজেদ আলীর পরিণতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে সে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করে। কিন্তু অভিযুক্ত মহিউদ্দিন বুলু ও নিখোঁজ মাজেদ আলীর মোবাইল কল লিষ্ট ও ঘটনার দিনে তাদের গতিবিধি পর্যালোচনা করে দেখা যায় ওই দিন তারা নারায়ণগঞ্জ থেকে বিকেলে দাউদকান্দি ব্রিজ এলাকায় ও সন্ধ্যায় মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়া থানাধীন মেঘনা নদীর তীর এলাকায় অবস্থান করে। 


পরবর্তীতে অভিযুক্ত মহিউদ্দিন বুলু নারায়ণগঞ্জে ফিরে আসলেও নিখোঁজ মাজেদ আলীর ব্যবহৃত মোবাইলটি ঐ এলাকা থেকে বন্ধ পাওয়া যায়। 
এই ঘটনায় র‌্যাবের সহযোগিতায় নিখোঁজ মাজেদ আলীর স্ত্রী নাজমা বেগম বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় গত ৯ এপ্রিল একটি মামলা দায়ের করেন। র‌্যাব-১১ এর একটি বিশেষ গোয়েন্দা দল এ ঘটনার রহস্য উদঘাটনের জন্য ছায়া তদন্ত অব্যাহত রাখে। 


ধারাবাহিক অনুসন্ধানে জানা যায়, কুমিল্লার দাউদকান্দি এলাকার সোহেল নামে এক নৌকার মাঝি ঘটনার দিন গত ১০ মার্চ আদম বেপারী মহিউদ্দিন বুলু নিখোঁজ মাজেদ আলী ও অজ্ঞাত এক লোক'কে নিয়ে মেঘনা নদীতে নৌকা চালিয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় শুক্রবার ১০ মে কুমিল্লার দাউদকান্দি বাজার ঘাট হতে নৌকার মাঝি সোহেলকে আটক এবং তার নৌকাটি জব্দ করা হয়। 


গ্রেফতারের পর র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নৌকার মাঝি সোহেল ঘটনার লোমহষর্ক বর্ণনা দিয়ে জবানবন্দী প্রদান করে। 

সোহেল র‌্যাবের কাছে জবানবন্দীতে জানায়, আদম-বেপারী মহিউদ্দিন বুলু ও বাবু একত্রে সোহেলের নৌকায় মাজেদ আলীকে পাশবিক নির্যাতন করে, গলা টিপে ও নাক-মুখ চেপে ধরে শ্বাাসরুদ্ধ করে হত্যা করে মেঘনা নদীতে লাশ ফেলে দেয়। 


পরে বুলু ও বাবু সোহেলকে ১ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে দাউদকান্দি ব্রিজের পশ্চিম পাশে নেমে যায়। গ্রেফতারকৃত নৌকার মাঝি সোহেল গত সোমবার নারায়ণগঞ্জ জেলার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দী প্রদান করে। 


পরে র‌্যাব সদস্যরা সোমবার দিবাগত রাত দেড়টায় গজারিয়ার গোয়াগাটিয়ার শিমুলিয়া এলাকায় তার নিজ বাড়ি হতে সুলতান মাহমুদ বাবুকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃত বাবুর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে তিনি জানান। 
 

এই বিভাগের আরো খবর