শনিবার   ০৪ এপ্রিল ২০২০   চৈত্র ২১ ১৪২৬   ১০ শা'বান ১৪৪১

স্ত্রীর পরিকল্পনায় স্বামীকে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়: পুড়াল পুরুষাঙ্গ

প্রকাশিত: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

স্টাফ রিপোর্টার (যুগের চিন্তা ২৪) : প্রথমে প্রেমের ফাঁদ পরে বিয়ে। এরপর টাকা আত্নসাত করতে স্ত্রী নিজেই তার স্বামীকে অপহরণ করে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছে। অপহরণের পর টাকার জন্য মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনসহ পুরুষাঙ্গে ম্যাচ লাইটের আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে স্ত্রীর প্রেমিকা অভিত, শ্যালক পাপ্পুসহ অন্য অপহরণকারীরা।

 

পরে দ্রুত টাকা আদায়ের জন্য নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে অপহৃতার স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে দেয়। যা পরে সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে। পুরো ঘটনাটি সিনেমাকেও হার মানিয়েছে। 


এদিকে ছেলের উপর নির্য়াতনের ভিডিও দেখে স্ট্রোক করেন মা। অপরদিকে, অপহরণকারীদের হাত থেকে পালিয়ে এসে নির্যাতিত ওই প্রবাসী নারায়ণগঞ্জে র‌্যাব ১১’র কাছে অভিযোগ দেয়। অভিযোগের প্রেক্ষিতে শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে অপহরণকারী চক্রের ৪ সদস্যকে নরসিংদী থেকে আটক করে র‌্যাব।

আটককৃতরা হলো- প্রবাসীর স্ত্রী মারিয়া আক্তার মন্টি (২৩), অভিত মিয়া (২৮), পাপ্পু মিয়া (২৮) ও বাদল মিয়া (৫৮)। 
ভুক্তভোগীর নাম রাসেল। তিনি ব্রাক্ষনবাড়িয়ার কসবা উপজেলার বাসিন্দা। অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির চক্রের মূল হোতা রাসেলের স্ত্রী মন্টি প্রতারণার জন্য এ পর্যন্ত অন্তত ৮/১০টি বিয়ে করেছে বলে জানা গেছে। 


শনিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জে র‌্যাব-১১’র সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এতথ্য জানান সিনিয়র সহকারি পরিচালক আলেপ উদ্দিন, পিপিএম। 


তিনি জানান, আটককৃতরা সংঘবদ্ধ অপহরণকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য। তারা বিভিন্ন এলাকার বিত্তবান ব্যক্তিদের কৌশলে অপহরণের পর শারীরিক নির্যাতন করে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ বাবদ মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে থাকে। 


রাসেলের স্ত্রী সুন্দরী নারী মন্টি ইতিপূর্বে একাধিক বিয়ে করে ওই স্বামীদেরও একইভাবে নির্যাতন ও জিম্মি করে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বলে র‌্যাবের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। 


রাসলের সাথে পারিরারিক বিরোধের জের ধরেই স্ত্রী মন্টি, শ্বশুর ও স্ত্রীর বড় ভাইয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী অর্থ আদায় করতে রাসেলকে অপহরণ করা হয়েছিল। মূলত সৌদি প্রবাসী রাসেলের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যেই মন্টি তাকে বিয়ে করে। 


সংবাদ সম্মেলনে আলেপ উদ্দিন আরো জানান, একই উদ্দেশ্যে গত ২৮ ডিসেম্বর ভুয়া ডিবি পুলিশ পরিচয়ে অপহরণকারি চক্রের সাত আটজন ব্যক্তি রাসেলকে নরসিংদি আদালতের সামনে থেকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়।

 

পরে রাসেলকে তারা অচেতন করে একটি ফ্ল্যাট বাসায় নিয়ে আটককৃতরাসহ অপহরণকারী সদস্যরা ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে শারীরিক নির্যাতন করে। টাকার জন্য ম্যাচ লাইট দিয়ে পুরুষাঙ্গে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে দ্রুত টাকা আদায়ের জন্য নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে অপহৃতার স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে দেয়।  


এক পর্যায়ে রাসেলের পরিবারের সাথে দুই লাখ টাকা দফরফা হলে বিকাশের মাধ্যমে ষাট হাজার টাকা আদায় করে অপহরণকারীরা। অবশিষ্ট টাকা আদায় করতে পরদিন ২৯ ডিসেম্বর তারা রাসেলকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে বের হয়। মাঝপথে রাসেল প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার কথা বললে তাকে গাড়ি থেকে নামানো হয়। 


এসময় রাসেল ডাকাত বলে চিৎকার দিলে আশপাশের লোকজন তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে অপহরণকারীরা তাকে রাস্তায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরে অপহরণকারিরা রাসেলকে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে ভাইরাল করে এবং মামলা না করতে নানাভাবে হুমকি দিতে থাকে।

 

কিছুদিন চিকিৎসার পর সুস্থ্য হয়ে রাসেল নারায়ণগঞ্জে র‌্যাব-১১ কার্যালয়ে এসে অপহরনের ঘটনা বর্ণনা দিয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে র‌্যাব চারজনকে আটক করে।


আটককৃতদের বিরুদ্ধে নরসিংদি থানায় মামলার প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে র‌্যাব জানায়, এই অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত অন্যান্য সদস্যদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।


এদিকে নির্যাতিত রাসেল গণমাধ্যমের কাছে তাকে নির্যাতনের ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে অপহরণকারি চক্রের সদস্যদের উপযুক্ত শাস্তির দাবি করেন। 


তিনি জানান, ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠায় ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পরিবারকে না জানিয়ে মন্টিকে বিয়ে করেন তিনি। ২০১৯ সালের ১৯ জানুয়ারি সৌদি আরবে চাকরি নিয়ে চলে যান।

 

বিদেশ গিয়ে বাবা আবদুল হককে বিয়ের কথা জানান রাসেল। পরে পুত্রবধূ মন্টিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান রাসেলের মা-বাবা। গত বছরের এপ্রিল মাসে দেশে ফেরেন রাসেল। এক মাস থাকার পর গত বছরের মে মাসে আবার সৌদিতে চলে যান তিনি।


সৌদি যাওয়ার পর রাসেলকে তার স্ত্রী মন্টি জানান, তিনি অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু রাসেলের মা-বাবা জানান, মন্টি তাদের না জানিয়ে নরসিংদীতে তার বাবার বাড়ি চলে গেছেন। যাওয়ার সময় গহনা, মোবাইল নিয়ে গেছেন। 


এ খবর পেয়ে রাসেল গত ১৩ সেপ্টেম্বর আবার দেশে আসেন। মন্টির বাড়িতে গিয়ে জানতে পারেন, তার গর্ভপাত হয়েছে। এর চারদিন পর নরসিংদী সদর থানায় রাসেলের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন মন্টি আক্তার।


এ মামলায় রাসেল কারাভোগও করেন। জেলখান থেকে জামিনে আসার পর নানাভাবে রাসেলকে হয়রানি করতে থাকেন মন্টির পরিবার। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর তাকে ডিবি পরিচয় দিয়ে অভিত, পাপ্পু মিয়াসহ কয়েক ব্যক্তি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। ওঠানোর সঙ্গে সঙ্গে সিটের নিচে নিয়ে মারধর করে। তৃষ্ণায় আমি পানি চাইলে সেভেন আপ দেয়। কিন্তু সেভেন আপ পানের পর তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।


চেতনা ফেরার পর দেখেন হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তিনি একটি কক্ষের মেঝেতে পড়ে আছেন। এর কিছুক্ষণ পরই তার উপড় শুরু হয় মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্মম নির্যাতন। এমনকি পুরুষাঙ্গও আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়। 


ওই ভিডিও দেখে দেড় লাখ টাকায় সমঝোতা হয়। রাতে বিকাশে ৬০ হাজার টাকা পাঠায় রাসেলের পরিবার। বাকি ৯০ হাজার টাকা নগদ পরিশোধের কথা হয়। এই টাকা নিতে ২৯ ডিসেম্বর রাতে রাসেলকে মাইক্রোবাসে তুলে পাপ্পু ও তার দলের লোকজন।

 

রাত সাড়ে ৩টার দিকে মাইক্রোবাসটি নরসিংদী শাপলা চত্বরে আসার পর অপহরণকারীরা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে নামেন। রাসেলকেও নামানো হয়। একটি পিকআপ ভ্যান ওইখান দিয়ে যাওয়ার সময় রাসেল চিৎকার শুরু করেন।

 

তখন অপহরণকারীরা তাকে রেখেই দ্রুত পালিয়ে যান। এরপর রাসেল পুরো রাত নরসিংদী রেলস্টেশনে কাটান। পরদিন সকালে কুমিল্লায় বড় বোনের কাছে চলে যান। সেখানে মুক্তি ক্লিনিকে চিকিৎসা করান। চিকিৎসা শেষে তিনি নারায়ণগঞ্জে র‌্যাব ১১’র কাছে এ ঘটনায় অভিযোগ দায়ের করেন।
 

এই বিভাগের আরো খবর