বুধবার   ২৭ মে ২০২০   জ্যৈষ্ঠ ১৩ ১৪২৭   ০৪ শাওয়াল ১৪৪১

সেবার নামে মৃত্যুফাঁদ, চিকিৎসকরাও পরিণত হচ্ছে কঁসাইয়ে

প্রকাশিত: ১৪ মার্চ ২০১৮   আপডেট: ১৪ মার্চ ২০১৮

স্টাফ রির্পোটার (যুগের চিন্তা ২৪ ডটকম) : চিকিৎসা একটি সেবামূলক পেশা। সেবাই হল একজন চিকিৎসকের মূল উদ্দেশ্যে। তবে তা অতীত। চিকিৎসা সেবা এখন ব্যবসা-বানিজ্যের অনুরূপ। এখন সেবা আর খ্যাতি নয় যেন অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হল চিকিৎসা পেশা। আর অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে কিছু চিকিৎসকরা বেছে নিচ্ছে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক ব্যবসা।

আর ব্যবসা নামক ক্লিনিকগুলো পরিণত হয়েছে মৃত্যুর ফাঁদে। সেবা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পরিবর্তে রোগীরা বাড়ি ফিরছেন লাশ হয়ে। ফলে শহরে অলিতে গলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা ক্লিনিকগুলো বর্তমানে কসাই খানায় রুপান্তরিত হয়েছে। আর চিকিৎসকরা পরিণত হয়েছে কঁসাইয়ে। অদক্ষ ডাক্তারদের অবহেলায় অহরহই প্রাণ দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

ভূল চিকিৎসায় মৃত্যু বা অঙ্গহানির মত ঘটনা ঘটছে নৈমত্তিকভাবে। রোগীদের সেবা নয় বরং ব্যবসার লক্ষ্যেই গড়ে উঠেছে এ সকল ক্লিনিক, প্যাথোলোজিক্যাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো। অধিকাংশ ক্লিনিক, প্যাথোলোজিক্যাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে নেই দক্ষ ও পর্যাপ্ত পরিমাণ চিকিৎসকের ব্যবস্থা। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত কতিপয় চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ান। আবার কিছু কিছু ক্লিনিকে শুধুমাত্র বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের নাম সাইনবোর্ড দেখা গেলেও কিন্তু বাস্তবতা উল্টো।

প্রতিনিয়ত এসব ক্লিনিক গুলো জনগণের সাথে প্রতারণা ও সরকারের আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে সেবার নামে ক্লিনিক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি কোনো রোগীর মৃত্যুতে অভিযুক্ত চিকিৎসক বা ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজিরও এখনও দেখা যায়নি। যদি কোনো ঘটনা ঘটে। তখন শুধুমাত্র গ্রেফতারের মাধ্যমেই মূল ঘটনার ইতি ঘটে যায়। অভিযুক্ত ডাক্তার ও কর্তৃপক্ষ রোগীর স্বজনদের সঙ্গে টাকা লেনদেন করে রফাদফা করে নেয়। আর এর সাথে যুক্ত থাকে প্রভাবশালী বিএমএ নেতৃবৃন্দও।

এমনি একটি ঘটনা গত ৮ মার্চের। বৃহস্পতিবার (৮ মার্চ) ডন চেম্বার এলাকায় শহরের মেডিস্টার হাসপাতালে ভূল চিকিৎসায় সাবিহা তাসলিমা ঝুমা (২৫) নামে এক প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া যায়। ভূল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হাসপাতালে বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনায় ৫ জনকে আটক করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে সদর মডেল থানা সূত্রে জানা যায়,রোগীর স্বজনদের সাথে নানা দেনদরবারের পর আপোষ মিমাংসা হওয়ায় ভুল চিকিৎসার অভিযোগে আটক ডা. অমল কুমার পোদ্দারসহ ৫জনকে ছেড়ে দেয়া হয়।

এখানেই শেষ নয় এর আগেও এমন অনেক ঘটনা নজির রয়েছে নারায়ণগঞ্জের ক্লিনিক, প্যাথলজিল্যাব ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে। জানা যায়, গত বছরের ২৭ জুন রাতে চাষাঢ়া বালুর মাঠ এলাকাস্থ ইসলাম হার্ট সেন্টারে ভূল চিকিৎসায় নারায়ণগঞ্জ কলেজের মেধাবী শিক্ষক অধ্যাপক স্বপন চক্রবর্তী মারা যান। তার স্ত্রী মঞ্জু চক্রবর্তী অভিযোগসূত্রে জানা গিয়েছি, সেখানে দায়িত্বপালনরত চিকিৎসক ডা. নুরুল ইসলাম কোনো প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই স্বপন চক্রবর্তীকে হার্ট অ্যাটাকের কথা বলে আইসিইউতে ভর্তি করিয়ে ৫ হাজার টাকা মূল্যের একটি ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখেন।

কিন্তু রাত সাড়ে ১১টার দিকে রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটলে একজন জুনিয়র চিকিৎসক রোগীর বুকে পাঞ্চ করতে থাকেন। কিছুক্ষণ পরেই অধ্যাপক স্বপন চক্রবর্তী মারা যান। একইরকমই ঘটনা ঘটে নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি বিভাগের মেধাবী শিক্ষক অভয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও। তিনিও এই ক্লিনিকে চিৎিসকদের ভুল চিকিৎসায় মারা যান বলে অভিযোগ করে তাঁর স্বজনরা।

অন্যদিকে গত বছরের ২২ মে বন্দরে মা হাসপাতালে ভূল চিকিৎসায় নাজমুন নাহার(২৩) নামে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়। ১৭ অক্টোবরে সোনারগাঁ পৌরসভার হাতকোপা এলাকার আয়েশা আমজাদ ক্লিনিক মাত্র ২৪ দিনের ব্যবধানে ভুল চিকিৎসায় এক নারী ও পুরুষের মৃত্যু হয়। ১ নভেম্বর কালিরবাজার এলাকায় অবস্থিত মেডিপ্ল¬াস হাসপাতালে ভূল চিকিৎসায় পারভীন আক্তার (৪৭) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়। কিন্তু কোনো প্রকার আইনী তৎপরতা না থাকায় ছাড় পেয়ে যাচ্ছে দোষীরা।

আর এর ফলেই আবারো একই ঘটনা সম্মুখীন হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষের। কিন্তু এ সকল সমস্যার মূল কারণ হিসেবে সংশিষ্টরা দায়ী করছে সরকারী চিকিৎসা সেবাকে। তারা মনে করছে, মূলত সরকারী সেবায় বিভিন্ন ধরনের অব্যবস্থাপনা, চিকিৎসকদের গুরুত্বহীনতা আর চরম দুর্ভোগের সুযোগ নিয়ে শহরের গড়ে উঠেছে অসংখ্য প্রাইভেট হাসপাতাল ও ব্যাঙের ছাতার মতো ক্লিনিক।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব ক্লিনিক বা হাসপাতালের মালিক ও পরিচালক বেশির ভাগই কোনো না কোনো সরকারী হাসপাতালের ডাক্তার নার্সরাই এসকল সেবা নামের ক্লিনিক ব্যবসায়ের সাথে যুক্ত। আর রোগীদের সেবার নামে দিয়ে যাচ্ছে মরণকামড়।

এই বিভাগের আরো খবর