বুধবার   ১৩ নভেম্বর ২০১৯   কার্তিক ২৮ ১৪২৬   ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

সমসাময়িক মানবিক অধঃপতন এবং উত্তরণের উপায়

প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর ২০১৯  

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া তুহিন হত্যাকাণ্ড ভীষণভাবে আহত করেছে আমাকে। এই ঘটনাটিসহ গত কয়েক মাসে বিভিন্ন হত্যার ঘটনার ধরন, বিভিন্নভাবে নারী এবং শিশু ধর্ষণের প্রকৃতি বা অভিনব অপরাধ প্রবণতা দেখে মনে হচ্ছে মানব সভ্যতার বিকাশ সম্মূখ যাত্রা থেকে বিপরীতমুখী হচ্ছে! জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে মানব হত্যা, নারী ও শিশু ধর্ষণ, সাম্প্রাদিক সংঘাত ইত্যাদি অপরাধসমূহ। 


মানবতার জন্য দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য শুধু বাংলাদেশ নয়, বিভিন্ন উন্নত দেশসহ প্রায় সারা বিশ্বেই বৃদ্ধি পেয়েছে নৈতিক ও মানবিক অধ্বঃপতন। এর কারন কী ? এর প্রতিকার কী ? এসব নিয়ে ভাবতে হবে আমাদের সবাইকে কারণ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ মিলেই এই সমাজ, এই দেশ, এই বিশ্ব। মানবিক অধঃপতন ঠেকাতে সমাজের সবারই নিজ নিজ চিন্তা-ভাবনা অনুসারে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে। অন্যথায়, সমাজ কাঙ্খিত বাসযোগ্যতা হরালে ভুক্তভোগী হতে হবে সবারই- নগর পুড়িলে দেবালয় এড়ায় না!


মানবিক অধঃপতন রোধের প্রক্রিয়া আলোচনার আগে, মানবিক অধঃপতনের কারণ খুঁজতে একটু ফিরে দেখা যাক-সভ্যতা বিকাশের শুরুর দিকে।যখন মানুষ গুহায় বাস করতো অথবা বনে জঙ্গলে-তখনকার সমাজে আনুপাতিক বিশ্লেষণে এতো খুন, হত্যা, ধর্ষণ, দুর্নীতি বোধহয় ছিলো না। 

 

কেউ কেউ বলতে পারেন তখন জনসংখ্যা কম ছিলো তাই অপরাধের ঘটনা কম ছিলো বা তখনও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব সংঘাত ছিলো। হ্যাঁ, আদিম যুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত সভ্যতার অভিাযাত্রার সাথে সাথে মানবিক উন্নয়নও হয়েছে। কিন্তু আধুনিক সভ্যতা দাবি করার পর আদিম বা মধ্যযুগের মত সংঘাতের ঘটনা অহরহ ঘটা অধঃপতন বৈকি এবং সংখ্যাতাত্ত্বিক নয় বরং মনস্তাত্ত্বিক তুলনামূলক বিচারে আমরাই তাদের চেয়ে পিছিয়ে থাকবো! যাহোক, আমার মতে, আদিম থেকে আধুনিক যুগের শুরু পর্যন্ত মানবজাতির দৈনন্দিন জীবন পরিচালনার সাথে ভিতর একটি প্রবণতাটি খুব জোড়ালো ছিলো- তা হলো "মানুষ হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার অবিরত চেষ্টা।" 

 

আর এই প্রবণতাটি ধীরে ধীরে তাদের সভ্য হতে সাহায্য করেছে। কিন্তু এখন! এখন আমরা নিজেদেরকে নিজেরাই স্বঘোষিত সভ্য মনে করি! যদিও দৈনন্দিন জীবন সে "সভ্য" অহংকার নিয়েই পরিচালনা করি, তবে বাদ দিয়ে দিয়েছি- প্রকৃত মানুষ হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার প্রক্রিয়া। এটিই হয়তো "কাল" হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমানে আমাদের দেশসহ পুরো বিশ্বের মানুষের জন্য। 

 

ফলশ্রুতিতে বেড়েছে যতসব অমানবিক কর্মকাণ্ড আমাদের সমাজে, আমাদের দেশে, আমাদের বিশ্বে। এই অধঃপতন চলতে থাকলে আগামী দিনে আমাদের উত্তর প্রজন্ম বসবাস করার জন্য যে পরিবেশ পাবে তা কতো খারাপ হতে পারে কল্পনা করা যায়! আমরা কি কখনো ভাবি- আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের সভ্য হিসেবে মেনে নিবে কিনা? বোধহয়, ভাবি না!


এক কথায় বলা যায়, বর্তমান সমাজে বিচ্ছিরিভাবে যে বহুমাত্রিক মানবিক অধঃপতন ঘটছে তার মূল কারণ আমাদের "মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা" থেকে নানাবিদ কারণে দূরে সরে আসা। আর এই দূরে সরা আসার কারণে আমরা অমানবিক হয়েছি, আত্মকেন্দ্রিক হয়েছি, আমাদের ভিতর ব্যক্তিগত স্বার্থচিন্তা বিষবাষ্পের মত বেড়ে উঠেছে, অপরাধ প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।


এই মানবিক অধঃপতন থেকে উত্তরণ করতে আমাদের কী করতে হবে? উত্তর হলো-খুব বেশি কিছু করতে হবে না! শুধু মানবিক অধঃপতনের কারণটি মুছে ফেলতে হবে। এটি হলো-আমাদের পুনরায় নিজেদেরকে "মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা" অবিরতভাবে চালু রাখতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে এই চেষ্টা শুরু করতে হবে। পরে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং শেষ অবধি বিশ্ব পর্যন্ত এই বোধটির পুনরুত্থান ঘটাতে হবে। 


যেহেতু এক ধরনের সামাজিক এবং মানবিক অপরাধ অন্য ধরনের সামাজিক অপরাধ এবং মানবিক সংঘটনের প্রভাবক-ফলে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার মত করে বেড়ে চলে মানবিক অধঃপতন প্রক্রিয়া। এর ঠিক উল্টোটি করতে হবে আমাদের-মানবিক বোধকে আবেশিত করতে হবে অন্যের মধ্যে। বুঝতে হবে, বুঝাতে হবে-নিজেদেরকে "মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা" যতদিন পৃথিবী আছে ততদিনই মানবজাতিকে অব্যহত রাখতে হবে।


সুতরাং, দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার সাথে সাথে নিজেদেরকে সচেতনে-অবচেতনে, সময়ে-অসময়ে মনে প্রাণে মানুষ হবার চর্চা অব্যহত রাখলে মানব সভ্যতা বিশ্বের বুকে নিকট ভবিষ্যতে একটি “মানবিক যুগ” রচনা করতে সক্ষম হবে। যে সমাজ ব্যবস্থায় সকল মানুষ তার মানবিকবোধ জাগ্রত রেখে একে অন্যের অধিকারসমূহ নিশ্চিত করবে, পারস্পরিক ভালোবাসা গড়ে উঠবে মানবিক সমাজ।  

 

সাকিব জামাল