শুক্রবার   ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ২৯ ১৪২৬   ১৫ রবিউস সানি ১৪৪১

বাংলাদেশ ও পেঁয়াজের রসালো ঝাঁজ

প্রকাশিত: ১৮ নভেম্বর ২০১৯  

সদ্য স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের খাদ্য মন্ত্রী ফণিভূষণ মজুমদার। যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের একদিকে খাদ্য উৎপাদনে স্বল্পতা, অন্যদিকে যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পরিবহণ ব্যবস্থায় ধ্বস। কারণে-অকারণেই খাদ্য সমস্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। দুই টাকা কেজির চাল ৪ টাকা থেকে ৮/১০টাকা। যখন ৮০ টাকা মণ চাল, তখন খাদ্যমন্ত্রী তার এক বক্তব্যে বলেন, ১২০ টাকার উর্দ্ধে চাউলের দাম উঠবে না। 


ওমা! ৮০ টাকা মণ চাল সাথে সাথে ১২০ টাকা মণ দরে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। খাদ্য নিয়ন্ত্রণ বা বাজার নিয়ন্ত্রণে কোন ভূমিকাই দেখা গেল না। মুনাফাখোর সুযোগ সন্ধানী ব্যবসায়ীরা লুফে নিলেন, গরীব দুঃখী সাধারণ মানুষের ঘামে ভেজা রোজগারের অর্থ। আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে রূপ নিয়েছে একশ্রেণির ব্যবসায়ী মহল। জেলায় জেলায় সরকার কর্তৃক ন্যায্যমূল্যের আটা, চাউল, চিনি, তেল, কাপড়সহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের নিয়োগ দান করার পর দিনের বিক্রি আর রাতের বিক্রির দৌড়াত্ব অনেকেই দেখেছেন।


খাদ্য মন্ত্রীর একটি কথার মূল্য যে কত তা সেদিন প্রত্যক্ষ করেছে এদেশের মানুষ। খাদ্য ঘাটতির অজুহাতে দেশে রাজনৈতিক বাতাস ঘোলা হতে লাগলো। রাজপথে ভুখা মিছিল; আর গরম গরম স্লোগান, পত্র-পত্রিকায় বড় বড় সংবাদের ছড়াছড়ি। বড় বড় সংবাদ বলছি এ কারণেই! ব্যাড নিউজ ইজ এ গুড নিউজ। বরেন্দ্র মোংলা এলাকার বাসন্তীকে নিয়ে পত্রিকার শিরোনাম। প্রতিবন্ধী দরিদ্র একটি যুবতীকে পাটের ছালা পড়িয়ে কী এক কষ্টের ছবি। বুক ফেঁটে যায় সরকার বিরোধী দলের তুখোর নেতাদের।

 

সুদূর আমেরিকা থেকে আমদানীকৃত চালের জাহাজ উধাও হয়ে যায়। আমেরিকা সরকার তার সাহায্যের হাত সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যে সব দেশ বিরোধীতা করেছে। এমন-কী পাকিস্তানকে সমর্থন করে বাঙালি নিধনে অস্ত্র বিক্রি করেছে, তারা অদৃশ্যভাবে বগল বাজাতে থাকে।


সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের ব্যাংক কৃষিখাত, যোগাযোগ ব্যবস্থার নাজুক পরিবেশে সে দিনের সেই অভাবকে দেশ প্রেমিক নেতা সহ্য করলেও অন্যেরা মানতে পারেনি। তৎকালীন সরকারের ব্যর্থতার ফিরিস্তি গাইতে লাগলেন। তৎকালীন সরকারের খাদ্যমন্ত্রী ফনীভূষণ মজুমদারের বক্তব্যের খেসারত দিতে গিয়ে অনেক মুনাফাখোর, দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোরদের বিরুদ্ধে লড়ছে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। খাদ্যের বাজার যখন অনেকটা সহনশীল হয়ে উঠছে, ঠিক সেই সময় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক শ্রেণির মসনদ লোভী সৈনিকরা বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করে। শুধু তাই নয় সাড়ে তিন মাস পর ৩ নভেম্বর জেলখানায় বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট ৪ নেতাকে হত্যা করা হয়। কালের পাতায় পাতায় ইতিহাস কথা কয়। 

 


তলাবিহীন ঝুড়ির তলাটি ভরতে ১৯৭৫ থেকে কম সময় লাগেনি।আঁধারের একমাত্র বাতিঘর শেখ হাসিনা তাঁর প্রজ্ঞা ও দেশ প্রেমের মন্ত্র বুকে ধারণ করে বিশ্বের রোল মডেল হিসেবে বাংলাদেশকে দাঁড় করিয়েছেন। ঝড় জলোচ্ছাসের দেশ বাংলাদেশ। প্রাকৃতিক শত দুর্যোগকে জয় করে বাংলাদেশ যখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ৬৮ হাজারে গ্রাম বাংলায় যখন প্রতি ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। ওষুধ শিল্পে যখন সুনাম বহন করছে। বিশ্বের ১৯টি দেশে আমাদের তৈরি ওষধ রফতানী হচ্ছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে মৎস্য বিরাটভাবে অর্থের এবং খাদ্যের যোগান দিচ্ছে। মাঠে-ময়দানে, খালে-বিলে এমন কি ছাদ কৃষিতেও বাংলাদেশের মানুষ বিরাট ভূমিকা রাখছে।একই জমিতে ৩/৪ ধরনের ফসল চাষ হচ্ছে। 

 

রাজশাহী, রংপুর, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ফসল ও সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল পণ্য একরাতে রাজধানী শহরে পৌঁছে যাচ্ছে। সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থা উন্নয়নের বদৌলতে। বাংলাদেশের উন্নয়ন এখন বিশ্বের কাছে রোল মডেল হিসেবে রূপ নিয়েছে। কৃষিখাত উন্নয়নে বাংলাদেশের মাটির অবদান কম নয়। যে দেশের মাটিতে আমের আটি ফেলে দিলে গাছ জন্মে। সে দেশের মানুষ না খেয়ে মারা যাবে এ কথা মানা যায় না। এইতো সেদিন ধানের মূল্য কম বিধায় কৃষক উৎপাদনের অর্থ না পাওয়ায়, এমনকি ধানকাটার যোগান অর্থ না থাকায় সাংবাদিক ডেকে নিয়ে পাকা ফলন ধান ক্ষেতে আগুন দেয়ার দৃশ্য দেখলাম। খাদ্য পোড়ানোর মত বেহায়া লক্ষ্মী ছাড়া কৃষক জীবনে কেউ কেউ দেখছে কিনা আমার জানা নেই।

 

শান্তিপদক প্রাপ্ত মিয়ানমারের ওয়াং সান সুচি তার দেশের সৈন্য দিয়ে অসহায় মানুষের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে তাদের ঘরে আগুন দিয়ে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। শত শত মানুষ হত্যা করেছে, যুবতীদেরকে ধর্ষণ করেছে। সেই সব ৮/১০ লাখ রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিন যাবত আশ্রয় দিয়েছেন বর্তমান সরকার। শুধু তাই নয় তাদের খাদ্য-চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। “মরার উপর খড়ার ঘা”। বিশ্ব বিবেকের দরবারে এ সমস্যা সমাধানের দাবি জানানো হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও সে দাবি পূরণ হচ্ছে না। কবে হবে তাও কেউ জানে না। “কোথা রাখি তোতা পাখি” এ অবস্থা আজ বাংলাদেশের। 

 

বিশাল পার্বত্য এলাকা ধ্বংসের মুখে। আগত রোহিঙ্গাদের কারণে বিশাল বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে। পাশাপাশি বৃদ্ধি পাচ্ছে নানান সমস্যা। জুড়ে বসেছে মাদক ব্যবসায়ী। হাজার হাজার রোহিঙ্গা দালালদের মাধ্যমে নামে-বেনামে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। এমন-কি দেশের দেশের ভেতর ছড়িয়ে পড়ছে। দেশে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট পুলিশ প্রশাসন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ‘বুলবুলির’ আঘাত সহ্য না করতেই এক সপ্তাহের মধ্যে পরপর দুটি রেলদুর্ঘটনা। প্রাণহানির সংখ্যা কম হলেও আহতের সংখ্যা অনেক। এদের অনেকের পঙ্গুত্ব জীবন কত না দুর্বিসহ বেদনার তা একবার ভাবলে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। 

 

রেলমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে সমবেদনা জানাবেন। না হয় লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে দান করবেন। তদন্ত কমিটির নথিপত্র ফাইল বন্ধ থাকবে। ২/৪জন রেল কর্মচারী চাকরিচ্যূত হবে। এখানেই সমাধান নয়। দেশের সবাই আমরা প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকি। যার যার দায়িত্ব আমরা সে সে পালন করছি না। সবাই রয়েছে চাঁদ ধরার স্বপ্নে বিভোর। অবৈধ অর্থে সিড়ি গড়া দালান একদিন খান খান হয়ে ভেঙ্গে পড়বে। এদেখেও ক্ষান্ত হচ্ছে না স্বপ্ন বিলাসী মহল।

 

বিশ্ব অর্থনীতির বাজারে একদিন দু’দিন সীমান্ত বন্ধ থাকলে আমাদের ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত। সবজি থেকে শুরু করে সবকিছুর মূল্য বৃদ্ধির হা-হুতাশ ছড়িয়ে ফায়দা লুটছে তারা। কোরবানি ঈদের গরুর কথা বাদ দিলাম। দেশি গরুতে সুন্দর ঈদ উদযাপিত হলো। দেশে খামারিরা লাভবান হয়েছেন। গরু আসছেনা সংবাদ ছড়িয়েও কোন লাভ হয়নি। 

এবার পেঁয়াজ নিয়ে কথা। সাগর জলে প্রচুর লবন থাকা সত্ত্বেও ১৯৭৩/৭৪ সালে লবন কেজি প্রতি ৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ভারত তার দেশের চাহিদা রক্ষায় পেঁয়াজ রফতানীতে বাংলাদেশের বর্ডারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। আমাদের দেশে পেঁয়াজ ব্যবসায়ীমহল বগল বাজিয়ে আগুন ছড়াচ্ছে। একশত টাকা কেজির উর্দ্ধে পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি হতে দেবে না খাদ্যমন্ত্রী।

 

খাদ্যমন্ত্রীর গান শুনে ৮০ টাকা কেজির পেঁয়াজ লাফ দিয়ে ১২০ টাকায় বিক্রি। বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানী করা হচ্ছে এ সংবাদের ভিত্তিতে বর্তমানে ২২০/২৫০টাকা কোন কোন স্থলে ৩০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। এই যদি হয় পেঁয়াজ কথন তবে এ দোষের ভাগী কে? খাদ্যমন্ত্রী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় না ব্যবসায়ী মহল। না আমাদের পেঁয়াজ চাষ ও তার রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যা? 

 

পেঁয়াজ নিয়ে যা রসালো তিক্ত আলোচনা হলো তা বিশ্বরেকর্ড রচিত হলো আর কী। দেশের মানুষ পেঁয়াজ খেতে পাচ্ছে না। পেঁয়াজের ঝাঁজে মরছে অনেকেই, আর বগল বাজাচ্ছে কেউ কেউ। পেঁয়াজের বাজার সহনশীল হয়ে আসবে। নতুন পেঁয়াজ বাজার জাত হবে। কিন্তু আজকের ঝাঁজটা ইতিহাস হয়ে থাকবে।

 

রণজিৎ মোদক
লেখক : শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবং সভাপতি-ফতুল্লা রিপোর্টার্স ক্লাব, নারায়ণগঞ্জ
মোবাইল : ০১৭১১ ৯৭ ৪৩ ৭২