শনিবার   ২৫ জানুয়ারি ২০২০   মাঘ ১১ ১৪২৬   ২৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১

‘বন কাগজ’এর গল্প : কাগজ থেকেই জন্ম নেবে ১১ রকমের গাছ

প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারি ২০২০  

শামীমা রীতা (যুগের চিন্তা ২৪) : ‘গাছ থেকে কাগজ আবার কাগজ থেকেই জন্ম নেবে ১১ রকমের গাছ।’ কি অবাক হচ্ছেন! এই অসাধারণ বিষয়টিকে বাস্তবরুপে সামনে এনেছেন তড়িৎ প্রকৌশলী মাহবুব সুমন ও তার শালবৃক্ষের দল। কাগজটির নাম দেয়া হয়েছে ‘বন কাগজ’।


চারদিকে  যখন নির্বিচারে গাছ কেটে বন উজাড়ের মহাৎসব ঠিক তখনই ‘বন কাগজ’ এ  সবুজ বনায়নের বার্তা নিয়ে ছুটছেন মাহবুব সুমন ও তার শালবৃক্ষ টিম। ইতিমধ্যে এ‘বনকাগজ’ জনপ্রিয় উঠেছে বিভিন্ন মহলে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও এ নিয়ে বেশ আলোচনা শুরু হয়েছে।  


আর এ বনকাগজের রহস্য উদঘাটনে ছুটে যাওয়া মাহবুব সুমনের বাসায়। পরিবেশ ও জলবায়ু রক্ষায় দীর্ঘদিন যাবৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানী বিষয়ক গবেষক ও এক্টিভিস্ট হিসেবে কাজ করছেন তিনি। এ পেশায় প্রকৌশলী হলেও ছোটবেলা থেকেই পরিবেশের সাথে তার নিবিড় সম্পর্ক। পরিবেশ রক্ষায় এ বন কাগজের উদ্ভাবনের আদ্যেপ্রান্ত নিয়ে নিয়ে কথা হয় তার সাথে।


যেভাবে শুরু হয় বনকাগজের যাত্রা:

নিজের প্রতিষ্ঠান ‘শালবৃক্ষ’র জন্য ভিজিটিং কার্ড তৈরী করতে গিয়ে বনকাগজের  তৈরীর বিষয়টি মাথায় আসে মাহবুব সুমনের। তখন থেকেই  এই বনকাগজ তৈরির চিন্তা। গবেষণা, পরীক্ষা, ব্যর্থতা, প্রতিন্ধকতাসহ নানা অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে টানা এক বছরের প্রচেষ্টায় বন কাগজ তৈরীতে সফল হয় মাহবুব সুমন। তবে বন কাগজের যাত্রাটা খুব সহজ ছিলো না।


মাহবুব সুমন বলেন, ভিজিটিং কার্ড তৈরী করতে গিয়ে একটি বিষয় লক্ষ্য করলাম মানুষ ভিজিটিং কার্ডটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর ফেলে দিচ্ছে। বিয়ের কার্ড আমন্ত্রণ কার্ডগুলোর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। প্রয়োজন শেষে ফেলে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রতিনিয়ত হাজার হাজার গাছ কেটে কাগজ তৈরী হচ্ছে।


কিন্তু সেই কাগজগুলোই আমরা ব্যবহার করছি ঠিকই কিন্তু এক পর্যায় গিয়ে কোনো কাজে লাগছে না।  মাহবুব সুমন বলেন, ‘বিশ্বের কয়েকটি দেশে এই ধরনের কাগজ তৈরি নিয়ে কাজ হচ্ছে। তবে ১১টি বীজ দিয়ে কাগজ তৈরী বিষয়টি এখন পর্যন্ত সামনে আসেনি। আমরাই প্রথম যারা একসাথে এতোগুলো ফসলের বীজ দিয়ে কাগজ তৈরির পর সেই কাগজ থেকে গাছ জন্মাতে সক্ষম হয়েছি।


 তিনি আরো বলেন, এ কাগজ তৈরী করতে গিয়ে অনেক সময় দিতে হত। এর জন্য  আমাকে অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়েছে।  শেষ পর্যন্ত চাকরীও ছাড়তে হয়। কিন্তু বনকাগজটা আমার কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছিলো। কিন্তু যখন বার বার ব্যর্থ হচ্ছিলাম আশা হারিয়ে ফেলেছিলাম। প্রায় ৪-৫ বারের পর কাগজ থেকে গাছ জন্মাতে সক্ষম হই।


কাগজ থেকে যেভাবে জন্ম নেয় গাছ :

বনকাগজের মধ্যে ৮ রকমের সবজি, সবজি ফল আর তিন রকমের ফুলের বীজ আছে। এ কাগজ মাটিতে লাগানোর জন্য বিশেষ কোনো নিয়ম নেই। কাগজটি আস্ত অথবা ছিঁড়ে টুকরো  করে ফেলে দিলেই  ৮/১০ দিনের মধ্যে বীজ অঙ্কেুারোদগম হবে।


তবে অবশ্যই মাটি পর্যাপ্ত আদ্রতা থাকতে হবে। যদি মাটি আদ্র না হলে কাগজটাকে মাটির উপর রেখে একটু ভিজিয়ে দিলেই হবে। বিষয়টি অনেকটা মাটিতে বীজ ছিটিয়ে দেয়ার মত। বীজ ছিঁটিয়ে দেয়ার পর উপরে থেকেই আলো, বাতাস আর পানির সাহায্যে এটাতে অঙ্কুরোদগম হয়। আর সেখান থেকে গাছ।  


তবে একটি বনকাগজ ১ বছর পর্যন্ত ভালো থাকে। অর্থ্যাৎ একটি বনকাগজের ভেতরে থাকা বীজ একবছর পর্যন্ত সতেজ থাকবে। ১ বছরের ভেতর এটি মাটিতে ফেললে সেখান থেকে ফসল হবে।


যেভাবে তৈরী হয় বনকাগজ:  

বনকাগজ মূলত তৈরী হয় পরিত্যক্ত কাগজ থেকে। তা পত্রিকার কাগজ বা ব্যবহৃত যেকোনো কাগজ হতে পারে। মেশিনের মাধ্যমে প্রথমে কাগজগুলো টুকরো করে তারপর ৪২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। যাতে কাগজগুলো একেবারে গলে যায়। তারপর ওই কাগজগুলোর মুন্ড তৈরী করে ফ্রেমে আকার অনুযায়ী বসিয়ে দিতে হয়। পরে বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে বীজগুলো কাগজে দিয়ে দিতে হয়। দুই ঘণ্টায় একজন এ ফোর সাইজের ৫টি বনকাগজ তৈরি করতে পারবে। এভাবে একদিনে প্রায় ২৫-৩০ টি কাগজ তৈরী করা যায়। আর কাজটি খুবই সর্তকতার সাথে তৈরি করতে হয় যাতে এর বীজগুলো নষ্ট হয়ে না যায়।


বনকাগজ তৈরীর ব্যয় প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সুমন জানান, বনকাগজের প্রকল্পটি নিয়ে এখনো কার্যক্রম চলমান। এই মুহূর্তে ব্যয়টা তুলনামূলকভাবে একটু বেশি লাগছে। একটি সাধারন কাগজের চেয়ে প্রায় চারগুণ বেশি ব্যয় হচ্ছে। প্রতি পিস কাগজ তৈরী করতে ব্যয় হচ্ছে ১২০-১৪০ টাকা। তবে এই খরচ অর্ধেকেরও কম করা সম্ভব। তবে শিঘ্রই এ খরচ কমিয়ে সাধারন মানুষের সাধ্যের মধ্যে নিয়ে আসতে পারবেন বলে তাদের বিশ্বাস।


তবে শুধুমাত্র বনকাগজেই থমকে থাকেনি মাহবুব সুমন। পরিবেশকে প্ল্যাস্টিক দূষণমুক্ত রাখতে তৈরী করেছে বাঁশের তৈরী জগ ও মগ। তৈরী করেছেন পরিবেশ উপযোগী সার তৈরী জন্য যন্ত্রও। যার নাম দেয়া হয়েছে মাতাল। যেখানে দৈনন্দিনপচনশীল বর্জ্য থেকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরী হবে সার। আর এ সার ছাদ কৃষিতে ব্যবহার করা যাবে। ইতিমধ্যে বাসার ছাদে এর কার্যক্রম চলছে।


বনকাগজের সাথে সাথে শালবৃক্ষের গল্পও সামনে এসেছে। বনকাগজ শালবৃক্ষের কার্যক্রমের একটি অংশ। শালবৃক্ষের উদ্যোক্তা ও বনকাগজ তৈরির কারিগর মাহবুব সুমন জানান, শালবৃক্ষ মূলত কাজ করে দূষণমুক্ত সবুজ পৃথিবী বাস্তবায়নে। ‘দূষণমুক্ত রিসাইক্লেনিং’ প্রকল্প নিয়ে তাদের কাজ। এই প্রকল্পেরই একটি অংশ হচ্ছে ‘বনকাগজ’ প্রকল্প।  


মাহবুব সুমন  বলেন, ‘আমার একার পক্ষে এই কাজটি শেষ করা সম্ভব হতো না। পুরো কাজটিতে আমাকে নানাভাবে সহায়তা করেছে সায়দিয়া গুলরুখ, কামরুল হাসান, ইকরামুনেসা চম্পা। আর তাদের নিয়েই তৈরি ‘শালবৃক্ষ’। এই দলের সকলের প্রচেষ্টার ফসল আমাদের এই বনকাগজ।’


শালবৃক্ষ প্রতিষ্ঠানের এই উদ্যোগ সম্পর্কে জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বনকাগজ তৈরীর অনুপ্রেরণা আরো প্রগাঢ় হয় সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন থেকে। এই যে প্রতিনিয়ত আমরা যে বন ধ্বংস করছি, নির্বিচারে গাছ কাটছি আমরা কি ওই পরিমাণে গাছ  রোপণ করছি? না। তাই এই বনকাগজের মধ্যে দিয়েই সবুজ বনায়ন ও দূষণমুক্ত পৃথিবীর গড়ার বার্তাই মানুষে কাছে পৌঁছে দিতে চাই।


তিনি আরো জানান, বনকাগজ মূলত খাদ্য উৎপাদনকে লক্ষ্য করে বানানো। বনকাগজ দিয়ে ‘পারমাকালচার’ কৃষি চর্চা করা যাবে। আর পারমাকালচার মাটির উপকার করে। মাটিতে প্রাণ সঞ্চারে সাহায্যে করে। এর ফলে আমরা পাই নিরাপদ ফসল।


এছাড়া এ বনকাগজ সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে পারলে প্রচুর কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
শালবৃক্ষের সদস্য ইকরামুনেসা চম্পা জানান, বন কাগজ নিয়ে আমাদের কার্যক্রম বর্তমানে ক্ষুদ্র পরিসরে চলছে। আমরা চাই বনকাগজ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ুক।

 

এই বিভাগের আরো খবর